মাত্র ১২ বছর বয়সে ব্রিটিশদের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বকনিষ্ঠ শহীদ বাজি রাউত

মাত্র ১২ বছর বয়সে ব্রিটিশদের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বকনিষ্ঠ শহীদ বাজি রাউত

কিছুদিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি ভাইরাল হয় । সেই ছবিতে লেখা ছিল “ফাঁসির পরে ভারতের সর্বকনিষ্ঠ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর ছবি’’! সেই ছবিটি প্রচুর শেয়ার হয় । কিছু লোক প্রতিবাদ করলেও খুব বেশি লোক কর্ণপাত করেনি । আসলে ওই ছবিটি ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বকনিষ্ঠ শহীদ বাজি রাউতের । মাত্র ১২ বছর ৬ দিন বয়সে ব্রিটিশদের গুলিতে শহীদ হন বাজি রাউত । এমনকি আপনি যদি গুগুলে ক্ষুদিরাম বসুর ছবি সার্চ করেন, তাহলেও একাধিক ছবির মধ্যে বাজি রাউতের ছবিও উঠে আসবে ।

কে এই বাজি রাউত ? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় ৮০ বছর । ব্রিটিশ শাসন তখন মধ্যগগনে । এর পাশাপাশি ব্রিটিশদের অনুগত কিছু রাজাদের অত্যাচারে দেশের মানুষের প্রাণ তখন ওষ্ঠাগত । এমনই এক রাজা ছিলেন উড়িষ্যার ঢেঙ্কানলের শঙ্করপ্রতাপ সিংহদেও । অত্যাচারী এই রাজাকে গ্রামের মানুষদের থেকে খাজনা যোগান দিতে হত । সেই খাজনা জমা হত ব্রিটিশ কোষাগারে । খাজনার যোগান দিতে মানুষের তখন নাভিশ্বাস উঠছে । ধীরে ধীরে শঙ্করপ্রতাপ সিংহদেও এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল । সাধারণ মানুষ আর খাজনা দিতে চাইছিল না । সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেন ঢেঙ্কানলের বৈষ্ণবচরণ পট্টনায়ক ও হরমোহন পট্টনায়ক । তারা দুজনেই ছিলেন মার্ক্সবাদী । বৈষ্ণবচরণ পট্টনায়ক ও হরমোহন পট্টনায়ককে সাধারণ মানুষ সমর্থন করতে থাকে । সকলে মিলে তৈরী করলেন ‘প্রজামণ্ডল আন্দোলন’ । স্থানীয় বালক ও কিশোরদের নিয়ে তৈরি ‘বানরসেনা’ । তাদের কাজ ছিল এই শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা । কিশোর বাজি রাউত নিজে যোগ দিয়েছিলেন এই আন্দোলনে । কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হল । শঙ্করপ্রতাপ সিংহদেও এর অত্যাচার আরও বেড়ে গেল । জারি হয়েছিল অতিরিক্ত ‘রাজভক্ত কর’। যারা এই অতিরিক্ত কর দিতে পারত না তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হল । কিন্তু তাতেও সাধারণ মানুষের আন্দোলন থামল না । এবার সেই আন্দোলনকে দমন করতে ২৫০ জন সশস্ত্র ব্রিটিশ সেনাকে কলকাতা থেকে পাঠানো হল ঢেঙ্কানলে ।

আরো পড়ুন:  "ক্ষুদিরামের ভূত এসে আমায় জেলের ভিতর রিভলবার দিয়ে গেছে" বিচারককে বলেছিলেন কানাইলাল

ব্রিটিশ সেনারা ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে গ্রামে । ব্রিটিশদের কাছে খবর ছিল, গ্রামেই লুকিয়ে আছেন হরমোহন । কিন্তু অনেক তল্লাশিতেও তাকে খুঁজে পায়নি ব্রিটিশরা । বৈষ্ণবচরণ ছিলেন রেলকর্মী, তাকেও ধরতে পারল না ব্রিটিশরা । ব্যর্থ হয়ে ব্রিটিশরা ভুবন গ্রামের কয়েকজন সাধারণ গ্রামবাসীকে গ্রেফতার করে । এর ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে যায় সাধারণ মানুষ । তারা থানা ঘেরাও করে । ক্রমেই গ্রামবাসীদের ভিড় বাড়তে থাকে । ভয় পেয়ে ব্রিটিশরা গ্রামবাসীদের উপর গুলি চালায় । মৃত্যু হয় দু’জনের। গ্রামবাসীদের ক্ষোভ আরও বাড়ে । আশেপাশের কয়েকটা গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ সেখানে আসতে থাকে । এবার ভয় পায় ব্রিটিশরা । তারা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে ।

আরো পড়ুন:  স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র বিপ্লবীদের সঙ্গেও নিবিড় সম্পর্ক ছিল বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর

১১ই অক্টোবর, ১৯৩৮ । নীলকন্ঠপুর ঘাটের দিকে রওনা দেয় ব্রিটিশরা । লক্ষ্য ব্রাহ্মনি নদী পার হয়ে পালিয়ে যেতে হবে । সেইদিন সেখানে একটি নৌকায় গার্ড ছিলেন কিশোর বাজি রাউত । ব্রিটিশরা যখন সেখানে পৌঁছায় তখন সে নৌকায় ঘুমাচ্ছিল । ব্রিটিশদের চিৎকারে ঘুম ভাঙে বাজি রাউতের । ব্রিটিশদের দাবি ব্রাহ্মণী নদী পার করে দিতে হবে বাজি রাউতকে । বাজি রাউতের কাছে খবর ছিল মানুষ ক্ষুব্ধ এবং ব্রিটিশরা প্রাণ ভয়ে পালাতে চাইছে । বাজি রাউত ব্রিটিশদের নদী পার করে দেবে না, একথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় । ব্রিটিশ সাহেবরা তাকে হুমকি দেয় এবং বলে রাজি না হলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয় । কিন্তু ১২ বছরের বাজি রাউত কিছুতেই রাজি হয়নি । বন্দুকের বাট দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে এক পুলিশ । মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বাজি রাউত । তখনও সে বলতে থাকে সে নদী পার করে দিতে পারবে না,অন্তত তিনি বেঁচে থাকতে সেটা সম্ভব নয় । ক্ষুব্ধ ব্রিটিশ পুলিশ বেপরোয়াভাবে গুলি চালাতে শুরু করে । ঘটনাস্থলেই মারা যান বাজি রাউত সহ তাঁর সঙ্গী ‘লক্ষণ মালিক’, ‘ফাগু সাহু’, ‘রুশি প্রধান’ ও ‘নাটা মালিক’ । মৃত্যুর সময় বাজি রাউতের বয়স ছিল ১২ বৎসর ছয় দিন ।

আরো পড়ুন:  দিনেদুপুরে ব্রিটিশদের নাকের ডগা থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল রডা কোম্পানির অস্ত্র,আমরা কি মনে রেখেছি সেই ইতিহাস?

বাজি রাউতের জন্ম হয়েছিল ১৯২৬ সালের ৫ই অক্টোবর উড়িষ্যার ঢেঙ্কানল জেলার নীলকান্তপুর গ্রামে । হতদরিদ্র পরিবার । পেশায় মাঝি পরিবারের ছেলে ছিল বাজি রাউত । বাবা ছিলেন ব্রাহ্মণী নদীতে নীলকণ্ঠপুর ঘাটের মাঝি । নৌকাতে যাত্রী পারাপার করত বাবা, তাই বাবার সাথে প্রায়ই যেতেন বাজি রাউত । বাজির মা দিনভর পড়শিদের বাড়িতে ঢেঁকি পাড়তেন । একদিন হঠাৎ প্রয়াত হন বাজি রাউতের বাবা । অপটু হাতে বৈঠা ধরা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না বাজির কাছে । ওই বয়সেই বাজি হয়ে উঠল বাড়ির প্রধান রোজগেরে । আর তার কিছুদিনের মধ্যেই ঘটে এই ঘটনা। ১৯৩৮ সালের ১১ অক্টোবর শহীদ হন বাজি রাউত ।

ওই ঘটনায় মৃত সবার দেহ পাঠানো হয়েছিল কটকে। ময়নাতদন্তের পরে কটকের রাস্তায় বেরিয়েছিল শোভাযাত্রা । হাজার হাজার মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন বাজি রাউতকে । মানুষ এই আত্মবলিদানের কথা ভুলে গেছে । মনে রাখেনি স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বকনিষ্ঠ শহীদ বাজি রাউতের কথা ।

-অভীক মণ্ডল

তথ্য : দা বেটার ইন্ডিয়া

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।