রেডিওতে খেলার বাংলা ধারাবিবরণীর উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ছিলেন তিনি, তবুও জন্মশতবর্ষে বিস্মৃত অজয় বসু

রেডিওতে খেলার বাংলা ধারাবিবরণীর উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ছিলেন তিনি, তবুও জন্মশতবর্ষে বিস্মৃত অজয় বসু

বাঙালি মজেছিল তাঁর কণ্ঠের সম্মোহনী জাদু আর মাদকতায়। “নমস্কার, ক্রিকেটের নন্দনকানন ইডেন উদ্যান থেকে বলছি আমি অজয় বসু,আমার সহযোগী ভাষ্যকার কমল ভট্টাচার্য ও পুষ্পেন সরকার”৷ রেডিওয় এই কথাটুকু শুনলেই শ্রোতাদের হৃদয় উদ্বেল হয়ে উঠত৷অজয় বসুকে বাংলা ধারাভাষ্যের স্বর্ণযুগের অধীশ্বর বললে এতটুকু বেশি বলা হয় না৷ক্রিকেটের নন্দনকানন ইডেন কেন,যে কোনও খেলার মাঠ থেকে অজয় বসুর সুললিত কণ্ঠে শিল্পময় ধারাভাষ্যের অর্থই ছিল লাখো লাখো মানুষকে রেডিওর পাশে বসিয়ে রাখা।ঈশ্বর প্রদত্ত কণ্ঠস্বর তাঁকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে দিয়েছিল।তিনি বাংলা ধারাভাষ্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র৷রেডিওর সোনাঝরা দিনগুলিতে যাদের সৌভাগ্য হয়েছে সেই ধারাভাষ্য শোনার,তাঁরা সত্যিই ভাগ্যবান যাদের সৌভাগ্য হয়নি তাদের ভাগ্য নেহাত খারাপ বলেই মেনে নিতে হবে৷

৩ অক্টোবর ১৯২০ অজয় বসুর জন্ম কলকাতায় । বাংলায় খেলার ধারাবিবরণী দিয়েই বাঙালির হৃদয়ে চিরকালের মত অমর হয়ে আছেন অজয় বসু৷ রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুরমর্দিনীর মতই জনপ্রিয় অজয় বসুর সুললিত কণ্ঠস্বরের খেলার বাংলা ধারাভাষ্য৷ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, রাজেন সেনদের হাত ধরেই রেডিওতে প্রথম খেলার বাংলা ধারাবিবরণীর চেষ্টা শুরু হয়েছিল । পরবর্তীতে অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্য ও পুষ্পেন সরকার এই ত্রয়ীর দাপটে ক্রিকেট এবং ফুটবলের বাংলা ধারাভাষ্য বাঙালির অন্দরমহলে প্রবল জনপ্রিয়তা অর্জন করল৷ ভাষার চয়ন, বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর আর যে খেলার ধারাবিবরণী দিচ্ছেন সেই খেলাটা সম্পর্কে অগাধ পান্ডিত্য অজয় বসুকে ধারাবিবণীর জগতে কার্যত অজেয় করে তুলেছিল৷সেইসময় টেলিভিশনের দাপট শুরু হয়নি৷ রেডিও ছিল বাঙালির হৃদমাঝারে৷এখনকার মত সারাবছর ক্রিকেটের আসর তখন বসত না৷সাধারণত শীতকালেই হত বেশিরভাগ ক্রিকেট ম্যাচ । শীতের পরশে সকালের মিঠে রোদ মেখে,গায়ে শীতবস্ত্র চাপিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীরা টেস্ট ক্রিকেট দেখতে ভিড় জমাতেন ইডেনে৷অনেকের কাছে থাকত রেডিও,শুধুমাত্র বাংলা ধারাবিবরণী শুনবেন বলে৷আর মাঠে যেতে না পারা ক্রিকেট প্রেমী মানুষদের কাছে মাঠের ক্রিকেট ম্যাচ প্রাণবন্ত করে পৌঁছে দিতেন অজয় বসুরা৷রেডিওয় ধারাভাষ্য শুনেই সম্ভবত বাঙালি ঘরের মা-বোনেরা হয়ে উঠেছিলেন ক্রিকেটের ভক্ত ! ধারাভাষ্যকার অজয় বসু কাছে কার্যত ম্লান হয়ে গিয়েছেন প্রখ্যাত ক্রীড়াসাংবাদিক ও সম্পাদক অজয় বসু।পরিধানে যাই থাকুক ধুতি পাঞ্জাবি বা স্যুট,টাই,নিখাদ বাঙালিয়ানার প্রতীক বলতে যা বোঝায় তিনি ঠিক তেমন মানুষ ছিলেন৷পাঞ্জাবির পকেটে রাখতেন চিরুনি৷ সময় পেলেই ব্যাকব্রাশ করে নিতেন৷

আরো পড়ুন:  হার মানিয়েছেন ক্যান্সারকে,বাংলার ক্রিকেটেও সেই লড়াকু মানসিকতার সঞ্চার করেছেন "স্যার" অরুণ লাল

বাংলা ভাষার ওপর অসম্ভব দখল ছিল অজয় বসুর । ধারাবিবরণীতে ইংরেজি শব্দ না বলে অনর্গল নির্ভুল বাংলা বলা ছিল অজয় বসুর ইউএসপি৷মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল অথবা ক্রিকেট ম্যাচের ধারাবিবরণী দিতে গিয়ে অনেক ধারাভাষ্যকার প্রিয় দল বা খেলোয়াড়ের ভাল পারফরমেন্সে আবেগের নিয়ন্ত্রন হারিয়েছেন,কিন্তু অজয় বসুর ধারাভাষ্যে কখনও সংযমের অভাব দেখা যায়নি । তেমনই মোহনবাগান সমর্থক হয়েও কখনও ধারাভাষ্যে নিরপেক্ষতা হারাননি অজয় বসু৷ দূরদর্শনেও খেলার বাংলা ধারাবিবরণীর প্রথম ধারাভাষ্যকার অজয় বসু।যদিও রেডিওতেই ধারাভাষ্য দেওয়া তাঁর প্রথম পছন্দ, সে কথা নিজেই বলেছেন৷

আরো পড়ুন:  নতুন পালক কলকাতার মুকুটে,দেশের প্রথম ট্রাম লাইব্রেরি যাত্রা শুরু করল কলকাতায়

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুরাগী অজয়বাবু বড়ে গুলাম আলি আর মান্না দে’র গান শুনতে খুবই ভালবাসতেন৷ কাজের অবসরে সঙ্গী ছিল রবিশঙ্করের সেতার, বিসমিল্লার সানাই আর বই । যার কণ্ঠ কয়েক দশক ধরে মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছে বাঙালি,সেই অজয় বসুর মৃত্যুর আগে শেষের কয়েকটা দিন কেটেছে অসম্ভব শারীরিক যন্ত্রনায়৷কৃত্রিম শ্বাস–প্রশ্বাসের জন্যে চিকিৎসকরা তাঁর গলায় ছিদ্র তৈরি করেছিলেন৷কথা বন্ধ হয়ে যায়, লিখে মনের কথা প্রকাশ করতেন অজয় বসু ৷ ২০০৪ সালে ৮৪ বছর বয়সে চলে যান অজয়বাবু। ক্রমে ক্রমে রেডিওতে বাংলা ধারাবিবরণী তার জৌলুস হারিয়েছে। এখন পুরোপুরি বন্ধ।

আরো পড়ুন:  ডাইভ দিয়ে পেলের ফ্রিকিক আটকালেন মোহনবাগানের গোলকিপার শিবাজি ব্যানার্জি

২০২০ সাল অজয় বসুর জন্মশতবর্ষ । কিছু মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় কলম ধরেছেন,স্মৃতিচারণা করেছেন অনুজ ধারাভাষ্যকারেরা । কিন্তু এর বেশী কিছুই হয়নি । বাঙালি মনে রাখেনি অজয় বসুকে……

-অরুনাভ সেন
তথ্যঋণ-আনন্দবাজার পত্রিকা (জয়ন্ত চক্রবর্তী ও গৌতম ভট্টাচার্য)

Avik mondal

Avik mondal

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।