বিস্মৃতির আড়ালে অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রথম মহিলা শহীদ ঊর্মিলাবালা পড়িয়া

বিস্মৃতির আড়ালে অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রথম মহিলা শহীদ ঊর্মিলাবালা পড়িয়া

কত কত নারী পুরুষের রক্তের বিনিময়ে এসেছে আমাদের স্বাধীনতা। কত জনকেই বা চিনি আমরা! পুরুষ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা যাও বা জানি, মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামী কিংবা শহীদরা তো চিরকালই পাদপ্রদীপের আলোয় নিচে রয়ে গেছে। রাণী লক্ষ্মীবাই থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দার কিংবা মাতঙ্গিনী হাজরা….. এমনই কিছু হাতে গোনা মহিলা যোদ্ধাদের নাম জানি। বাকি বেশিরভাগই স্মৃতির অতলে।

তেমনই এক নাম হল ঊর্মিলাবালা পড়িয়া। অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রথম মহিলা শহীদ তিনি, অথচ তাঁর নামে সেভাবে কোনও তথ্যই মেলে না। পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরে মোহবনি গ্রামে ক্ষুদিরামের পৈতৃক ভিটা। সেই গ্রামের কাছেই একটি গ্রাম হল খেতুয়া। এই গ্রামেই জন্ম ঊর্মিলাবালার।

১৯৩০ সালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন ঊর্মিলাবালা। এছাড়া গ্রামের মহিলাদের নিয়ে লবণ সত্যাগ্রহেও যোগ দেন তিনি। সেই সময় অর্থাৎ ১৯৩০ সালেই ১১ জুন পিংলার ক্ষিরাই নামে এক গ্রামে আন্দোলনকারীদের উপরে পুলিশ এলোপাথাড়ি গুলি চালালে ২২ জন শহিদ হন। সেই ঘটনার প্রতিবাদে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন ঊর্মিলাবালা। মেদিনীপুর জ্বলে ওঠে। এই আন্দোলনের পরে ঊর্মিলাবালা আবার সক্রিয় ভাবে ট্যাক্স বন্ধ আন্দোলন শুরু করেন। সেই সময় একদিন বহু মহিলাকে একত্রিত করে কেশপুর থানায় অভিযান চালান। পুলিশ ঊর্মিলাবালার গতিবিধি সম্পর্কে আগেই জানত। তাই থানায় অভিযানের দিন প্রবল লাঠিচার্জ করে পুলিশ। নেত্রী হিসেবে ঊর্মিলাবালাকেই প্রবল ভাবে মারা হয়। এত আঘাত সহ্য করতে না পেরে সেইদিনই মারা যান ঊর্মিলাবালা ।

আরো পড়ুন:  ক্ষুদিরাম হেমবাবুকে বলল,স্যার আমি যে মায়ের কথা বলছি সে আমার,আপনার,সারা দেশবাসীর মা

প্রথম মহিলা শহীদ হলেও ঊর্মিলাবালার মৃত্যুর সঠিক দিন কিন্তু এখনও অবধি জানা যায়নি। শোনা যায়, ১৯৩০ সালের জুনের শেষ সপ্তাহে তিনি মারা যান। পাশাপাশি জানা গেছে, তাঁর স্বামীর নাম মৃগেন্দ্রনাথ পড়িয়া। খেতুয়ায় পাঁজা পদবিধারী এক পরিবারের বাস ছিল। তাঁদের নামে এখনও রয়েছে পাঁজা পুকুর। এই পরিবারের এক মেয়েকে দাসপুরের কোনও এক পড়িয়া যুবক বিয়ে করেন। দরিদ্র সেই যুবক পাঁজাদের ঘরজামাই হিসাবে থাকতেন। পরে পাঁজাদের বংশ লোপ পায়। টিকে থাকে পড়িয়াদের বংশধরেরাই। ঊর্মিলাবালা সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি পরিচয় কিছু পাওয়া যায়নি।

স্বাধীনতা সংগ্রামে অবিভক্ত মেদিনীপুরের ছ’জন মহিলা শহিদের নাম পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে দু’জনই কেশপুরের। একজন ঊর্মিলাবালা। অন্যজন শশিবালা দাসী । শশিবালা ১৯৪২ সালের ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগ দিয়ে শহীদ হয়েছিলেন । তাঁর মৃত্যুর কথা রাসবিহারী পাল ও হরিপদ মাইতির লেখা ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে মেদিনীপুর’ (তৃতীয় খণ্ড) বইয়ে শশিবালার শহিদ হওয়ার প্রসঙ্গ বিস্তারিত ভাবে জানা যায় ।

আরো পড়ুন:  নখে পিন ফোটানো হল,বরফের চাঁইয়ের উপর শুইয়ে চেন দিয়ে চলল প্রহার-তবুও মুখ খুললেন না প্রদ্যোতকুমার ভট্টাচার্য

স্বাধীনতা সংগ্রামে এই কেশপুরের কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা আছে। উর্মিলাবালা, শশীবালা ছাড়া কেশপুরের বাসিন্দা চারজন পুরুষেরও প্রাণ গিয়েছিল । আগস্ট আন্দোলনের সময় বন্দুক ছিনতাই হয়েছিল ব্রিটিশ সেনার। সেই বন্দুক উদ্ধারে মরিয়া ছিল ব্রিটিশ পুলিশ। সেদিন ১৯৪২ সালের ১১ নভেম্বর ভোর রাতে গোরা সেনাদের ছিনতাই হওয়া বন্দুক উদ্ধার করতে কেশপুরের তোড়িয়া গ্রামটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে পুলিশ। তারপর পরিকল্পনামাফিক শূন্যে গুলি ছোঁড়ে পুলিশ। গ্রামবাসীরা স্বভাবতই এতে ভয় পেয়ে যায়। প্রাণভয়ে তারা বাইরে এসে ছুটতে থাকলে পুলিশ তখন গ্রামবাসীদের লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি করতে থাকে। পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়েন শশিবালা দাসী-সহ গ্রামের তিনজন বাসিন্দা। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় ১৪ বছরের কিশোর রামপদ ঘোষ এবং ৩৭ বছরের যুবক পঞ্চানন ঘোষের। গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর জখম হন গৌর বাগদি, গেঁড়া ঘোষ, কালোসোনা ঘোষ-সহ তোড়িয়া গ্রামের আরও কয়েকজন বাসিন্দা। তাঁদের চিকিৎসার জন্য এলাকার চিকিৎসক সুধাকৃষ্ণ বাগ সচেষ্ট হলে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকেও বাধা দেন। কার্যত বিনা চিকিৎসাতেই সেদিন থাকেন গুলিবিদ্ধ গ্রামের বাসিন্দা।

শুধু তোড়িয়া গ্রামই নয়। বিয়াল্লিশের আন্দোলনে কেশপুর থানার আরও কয়েকটি গ্রামেও বিদ্রোহ শুরু হয়। এইরকমই একটি গ্রাম হল রানিয়াড়। অভাব-অনটনে জর্জরিত এই গ্রামের বাসিন্দারা স্থানীয় এক জমিদারকে খাদ্যাভাবের কথা জানালেও জমিদার তাতে কান দেননি। শেষে বাসিন্দারা জমিদারের ধানের গোলা দখল করে। জমিদার কেশপুর থানায় অভিযোগ জানালে দারোগার নেতৃত্বে কয়েকজন সিপাহি এসে গ্রামবাসীদের নেতৃত্ব দেওয়া সাধন চৌধুরী-সহ চারজনকে গ্রেফতার করে। এতে এলাকার মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। পুলিশের উপর চড়াও হয়ে ধৃত চারজনকে ছিনিয়ে নেন তাঁরা। সেইসঙ্গে চারটি বন্দুক-সহ পুলিশের পোশাক খুলে তা আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এই ঘটনার রেশ গিয়ে পড়ে আনন্দপুরেও। এখানকার সাব রেজেস্ট্রি অফিসে আগুন ধরিয়ে দেন জনতা। আশেপাশের গ্রামের বাসিন্দারাও ব্রিটিশ পুলিশের বিরুদ্ধে জোট বাঁধতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে মেদিনীপুর থেকে বিশাল পুলিশবাহিনী সশস্ত্র অবস্থায় কেশপুরের দিকে রওনা হয়। উদ্দেশ্য জনতার আন্দোলন দমন করে ব্রিটিশ মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা। রাস্তায় কোটা নামে এক জায়গায় সশস্ত্র পুলিশকে বাধা দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশ জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান কোটা গ্রামের সতীশচন্দ্র মাইতি, কুঁয়াপুর গ্রামের বাসিন্দা সতীশচন্দ্র ভুঁইয়া।

আরো পড়ুন:  চট্টগ্রাম অস্ত্রগার দখলের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন গণেশ ঘোষ

তথ্য : অরিন্দম ভৌমিক, আঞ্চলিক ইতিহাসের গবেষক

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।