ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্লে ব্যাক সঙ্গীতের সূচনা হয়েছিল রাইচাঁদ বড়ালের হাত ধরে

ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্লে ব্যাক সঙ্গীতের সূচনা হয়েছিল রাইচাঁদ বড়ালের হাত ধরে

সেটা ছিল নির্বাক সিনেমার যুগ ৷ সেই সিনেমায় ছবি দেখা গেলেও কথা শোনা যায় না ৷ বোধহয় সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতাটা তখনকার দর্শকের কাছে খুব সুমধুর ছিল না ! বিরক্তিকর ছিল প্রোজেক্টরের একটানা ঘর্ঘর শব্দ ৷ সেই শব্দ চাপা দেওয়া ছিল বিড়ম্বনার আর এক পর্ব ৷পরবর্তীতে পর্দার আড়ালে কখনও বাজানো হত রেকর্ড, কখনও শিল্পীরাই পরিবেশন করতেন যন্ত্রসঙ্গীত বা কণ্ঠসঙ্গীত। এই সময়কে সিনেমার প্লে ব্যাক বা নেপথ্য সঙ্গীতের সূচনা লগ্ন বলা যেতে পারে !

আর এই প্লে ব্যাক সঙ্গীতের সূচনার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল রাইচাঁদ বড়ালের । রাইচাঁদ বড়ালের পিতা ছিলেন স্বনামধন্য সঙ্গীতশিল্পী লালচাঁদ বড়াল । মাত্র ৩৭ বছরে প্রয়াত হয়েছিলেন তিনি । ১৯০৩ সালের ১৯ অক্টোবর রাইচাঁদ বড়াল কলকাতা শহরে পৃথিবীর প্রথম আলো দেখেন । লালচাঁদ বড়ালের ছেলেদের ডাক নাম ছিল জলু, গঙ্গু ও রাই। জলু শিখেছিলেন বড়ে গোলাম আলির কাছে খেয়াল। হাফিজ় আলি খানের কাছে সরোদ শিখেছিলেন গঙ্গু। রাইয়ের জন্য তাঁর বাবা হাফিজ় আলিকে অনুরোধ করায় তিনি উস্তাদ মসিদ খানকে রায়পুর থেকে নিয়ে এসেছিলেন। রাইচাঁদ পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতীম সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক। তিনি যথার্থ অর্থেই ভারতীয় সঙ্গীত জগতের এক প্রবাদপুরুষ,সিনেমার গানে প্লেব্যাক বিপ্লব কার্যত তাঁর হাত দিয়ে ঘটেছিল৷ভারতীয় সিনেমায় সঙ্গীতের “ভীষ্ম পিতামহ”বলে রাইচাঁদ বড়ালকে অভিহিত করেছেন সঙ্গীত পরিচালক অনিল বিশ্বাস ।

তিন ভাই অর্থাৎ কিষণচাঁদ,বিষণচাঁদ এবং রাইচাঁদ এর উদ্যোগে ১/১ প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটের বাড়িটি হয়ে উঠেছিল শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চার আখড়া৷এই বাড়ির শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসরে নিয়মিত আসতেন ওস্তাদ এনায়েত খান, ওস্তাদ হাফিজ খান, ওস্তাদ আলী খান, গহরজান, জ্ঞান গোস্বামীরা৷৷কলকাতায় ১ গারষ্টিন প্লেসের বাড়িতে ১৯২৭-এর ২৬আগস্ট ভারতের দ্বিতীয় বেতার কেন্দ্রের উদ্বোধন হয়৷সেই বছরেই কলকাতা বেতারে যোগ দিলেন রাইচাঁদ বড়াল৷তিনি ছিলেন সঙ্গীত বিভাগের প্রযোজক৷

আরো পড়ুন:  ব্রিটিশদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে লিখেছিলেন "আনন্দমঠ"

বঙ্গসন্তান বীরেন্দ্রনাথ সরকারের গড়া নিউ থিয়েটার্স তখন অবিভক্ত ভারতে ছবি তৈরির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। পরিচালক দেবকী বসু থেকে নীতিন বসু, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্রের মতো লেখক, সুরকাররা সবাই এখানেই এসেছেন৷ ১৯৩১ সালে রাইচাঁদ বড়াল যোগ দিলেন নিউ থিয়েটার্সে৷বাংলা সিনেমা তখন সবাক হওয়ার সরণিতে হাঁটছে৷ প্লেব্যাক তখনও হয়নি৷ নিউ থিয়েটার্সের প্রথম সবাক ছবি ‘দেনাপাওনা’ (১৯৩১)৷সিনেমায় সমবেত কণ্ঠের গান “বাবা আপনভোলা, মোদের পাগলা ছেলে” গাইলেন উমাশশী, আভাবতী এবং পঙ্কজকুমার মল্লিক। গানটা গাইতে হবে বলেই সিনেমায় অভিনয় করতে হয়েছিল পঙ্কজকুমার মল্লিককে৷তারপর কেটে গেলো আরো চার বছর,১৯৩৫,বাংলা ছবির ক্ষেত্রে বিপ্লবের বছর৷সিনেমা সবাক হওয়ার পরেই ঘটল সেই ঐতিহাসিক ঘটনা৷ভারতীয় সিনেমায় প্রথম প্লে ব্যাক পদ্ধতির প্রয়োগ নিউ থিয়েটার্সের ছবিতেই।সিনেমার নাম “ভাগ্যচক্র”৷এই ছবিতেই নেপথ্য সঙ্গীতের প্রয়োগ করে বিপ্লব ঘটিয়ে দিলেন রাইচাঁদ বড়াল৷নীতিন বসু পরিচালিত ছায়াছবি “ভাগ্যচক্র” ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে মাইলস্টোন স্পর্শ করল৷রাইচাঁদ বড়াল বাংলা সিনেমার সঙ্গীতে প্লেব্যাকের প্রয়োগ ঘটালেন সাফল্যের সঙ্গে৷গানটি হলো ‘মোরা পুলক যাচি তবু সুখ না মানি’। গানটি ছিল সমবেত, নেপথ্যে গেয়েছিলেন সুপ্রভা ঘোষ (সরকার), পারুল ঘোষ এবং উমাশশী দেবী।ছবিটি “ধুপ ছাঁও” নামে হিন্দি ভাষায়ও নির্মিত হয় এবং এটি নেপথ্য গান সহ ভারতের প্রথম হিন্দি ছায়াছবি। প্লে ব্যাক পদ্ধতিতে শুটিং এর আগেই প্রাথমিকভাবে গান রেকর্ড করে নেওয়া হত । শুটিং-এর সময় শুধুমাত্র অভিনতা-অভিনেত্রীরা গানের কথার সঙ্গে মুখ মেলাতেন। প্লেব্যাক আসার পরে সিনেমা ও সঙ্গীতের জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল লাফিয়ে-লাফিয়ে৷পরিচিতি পেলেন গায়ক গায়িকারা ।

আরো পড়ুন:  হারিয়েছেন একমাত্র মেয়েকে, আজ কয়েকশো মেয়ের মা শান্তিপুরের রিঙ্কু মুখোপাধ্যায়

রাইচাঁদ বড়াল বাংলা চলচ্চিত্রে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানের প্রয়োগেও অন্যতম পথপ্রদর্শক৷ নিউ থিয়েটার্সের সঙ্গীতপ্রধান ছবি “চন্ডীদাস” ও “বিদ্যাপতির” সাফল্য তাঁকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেয় ৷ দুটি ছবিরই হিন্দি সংস্করণ হওয়ায় সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে স্বীকৃতি পেতে বিলম্ব হয়নি রাইচাঁদ বড়ালের৷তাঁর দেওয়া সুরে সঙ্গীতবহুল ছবি “বিদ্যাপতি”(১৯৩৭) সিনেমা সঙ্গীতের ক্ষেত্রে এক মাইলফলক হয়ে আছে । কানন দেবীর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় যে নজরুল ইসলামও যুক্ত ছিলেন “বিদ্যাপতির” সঙ্গীত রচনায় । রাইচাঁদের বাবা লালচাঁদ বড়াল সর্বপ্রথম গ্রামফোন রেকর্ডে গান করার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন আর রাইবাবু বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমায় নেপথ্য সঙ্গীতের প্রথম প্রয়োগ করেন । এহেন রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমারের মত সুরস্রষ্টার সংস্পর্শে এসে পরিণত হয়েছিলেন কানন । তিনি স্বীকারও করেছেন যে গায়িকা রূপে তাঁর বৈপ্লবিক প্রতিষ্ঠার মূলে যাদের অবদানের কথা মনে আসে তাঁদের মধ্যে প্রথমেই মনে আসে রাইচাঁদ বড়ালের নাম ।

আরো পড়ুন:  আমেরিকায় লোভনীয় চাকরি ছেড়ে ব্রিটিশদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুরেন্দ্রমোহন বসু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ডাকব্যাক

রাইচাঁদ বড়াল কানন দেবীকে গড়লেন “বিদ্যাপতি”তে, কাননের গান সারা ভারতে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছিল ।কানন দেবীর আত্মকথা “সবারে আমি অমি” বইতে রাইচাঁদ বড়ালের প্রতি শ্রদ্ধা ঝরে পড়েছে ৷ সিনেমার গতির সঙ্গে তাল রেখে গান আরম্ভ না হলে ছবিতে গান দেওয়ার কোনই মানে হয় না,মনে করতেন রাইচাঁদ বড়াল৷হিট ছবি “বিদ্যাপতি” ছবির গানের রেকর্ডিং হবে। গান গাইবেন কানন দেবী৷ রাইবাবু কাননদেবীকে বলেছিলেন তিনি মাত্র চারটে চান্স দেবেন, তার আর দরকার হয়নি, দুটো চান্সেই পাশ করে গিয়েছিলেন কানন। ‘সাথী’(১৯৩৮) ছবিতে রাইচাঁদ বড়ালের সুরে কানন দেবী ও কুন্দনলাল সায়গলের দ্বৈত কন্ঠে রাগাশ্রয়ী গান “বাবুল মোরা নৈহর ছুটল যায়” আজও সিনেমা ও সঙ্গীতপ্রেমী মানুষদের আবিষ্ট করে রাখে৷ ১৯৫৩ সালে মুম্বাই ফিল্মজগতে পা রাখলেন রাইচাঁদ বড়াল৷সেখানেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন৷ ১৯৭৮ সালে রাইচাঁদ বড়াল ভারতীয় সিনেমার সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত হন৷ ঐ বছরেই পেয়েছিলেন সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার ৷ ১৯৮১সালের ২৫ নভেম্বর সঙ্গীতের জগত থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়ে আকাশের তারা হয়ে না ফেরার দেশে রওনা দিলেন ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে প্লেব্যাকের প্রথম প্রয়োগকর্তা বঙ্গসন্তান রাইচাঁদ বড়াল৷ ভারতীয় সঙ্গীতের প্রবাদপ্রতীম ব্যক্তিত্ব রাইচাঁদ বড়ালের প্রয়াণ ভারতীয় সিনেমায় সঙ্গীতের একটি সোনালী যুগের অবসান,সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে বড় ক্ষত,সেই ক্ষত অত সহজে ভোলা যাবে না৷

-অরুনাভ সেন
তথ্যঋণ -আনন্দবাজার পত্রিকা এবং ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায়

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।