গলার আওয়াজ শুনে প্রথমে সবাই বলল মেয়েলি আওয়াজ,বরফ গিলে গিলে গলা ঠিক করেছিলেন অশোক কুমার

গলার আওয়াজ শুনে প্রথমে সবাই বলল মেয়েলি আওয়াজ,বরফ গিলে গিলে গলা ঠিক করেছিলেন অশোক কুমার

মানুষটা ভারতীয় সিনেমার কিংবদন্তী অভিনেতা,ভারতীয় সিনেমার প্রথম সুপারস্টার৷১৯৩৬ সালে তাঁর প্রথম অভিনীত ছবির নাম ‘জীবন নাইয়া’। আবার তাঁর জীবনে শেষ অভিনীত ছবি ‘আঁখো মে তুম হো’। তিনি কি কেবলই অভিনেতা ! না, তিনি যেমন একধারে ছিলেন চিত্রশিল্পী তেমন ছিলেন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার ৷ তাঁর আর একটি পরিচয় আছে তিনি ভারতীয় সঙ্গীতের কিংবদন্তী শিল্পী কিশোরকুমার গাঙ্গুলির বড় দাদা ৷ তিনি অশোককুমার |

১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর অশোককুমার গঙ্গোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন৷ অশোককুমার নামে পরিচিত হওয়ার আগে তাঁর আসল নাম ছিল কুমুদলাল গঙ্গোপাধ্যায় | যদিও নিজের বাড়িতে তাকে আদর করে দাদামণি নামে ডাকা হত৷মায়ের দিকের দাদু ছিলেন শিবচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,যিনি আবার সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সহপাঠী,আইনের পরীক্ষায় উভয়ের অসাধারন রেজাল্ট৷ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি বঙ্কিমচন্দ্র করলেও, শিবচন্দ্র প্রাকটিস করতেন লোকাল বারে, আইনজীবী হিসেবে পসার ভালো জমিয়েছিলেন, ভাগলপুরের বিখ্যাত মানুষদের কথা উচ্চারিত হলে তাঁর নাম বলতেই হবে ৷ ভাইবোনদের মধ্যে কুমুদলালের ঠিক পরেই বোন সতী | তাঁর বিয়ে হয়েছিল শশধর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে৷তাঁর আবার অন্য পরিচয়,তিনি ছিলেন মেঘনাদ সাহার ছাত্র৷হিমাংশু রায়ের বম্বে টকিজে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি পেয়েছেন৷ভগ্নিপতির চাকরিতে বেশ আনন্দিত শ্যালক৷সতীর দাদামণি তখন আইনের ছাত্র,যদিও মনের কোনে আছে নাটক,সিনেমার প্রতি অদম্য প্রেম৷ ভগ্নীপতি চাকরি পেয়েছেন শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন,তবে নিজের মনের কোনে তখন ইচ্ছা ভগ্নীপতির মত কাজ করবেন৷আইনের পরীক্ষার ফি-র টাকায় বম্বের ট্রেনের টিকিট কেটে সোজা উঠে এলেন বোনের বাড়ি,সেখানে অবশ্য শশধর মুখোপাধ্যায় তাঁর জন্য বম্বে টকিজ়ে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের চাকরি ঠিক করে রেখেছিলেন৷বম্বে টকিজের ছবি ‘জীবন নইয়া’র শুটিং-এর শুরুতেই ঘটে গেল মহাবিপত্তি৷ছবির নায়ক-নায়িকা উধাও,কলকাতায় পালিয়ে গিয়েছে৷নায়িকা আবার ফিরলেন বটে বম্বেতে,তবে নায়কের জন্য বন্ধ হল বম্বে টকিজের দরজা৷ সারল্য ভরা মুখের কুমুদকে কার্যত নিজের জন্য নিরাপদ মনে হয়েছিল নিজের হাতে গড়া বম্বে টকিজের কর্ণধর হিমাংশু রায়ের৷ছবির নায়ক হলেন বঙ্গসন্তান কুমুদলাল গঙ্গোপাধ্যায় ৷ তাঁর অভিনয়ের স্বপ্নের উড়ানের সেই শুরু আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সারাজীবনে৷সাফল্য তাঁর কাছে এসে ধরা দিয়েছে,ক্রমেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় সিনেমার প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা,তিনি অশোককুমার,তিনিই দাদামণি৷বাবা প্রাথমিক ভাবে ছেলে আইনজীবী না হয়ে অভিনেতা হয়ে যাওয়ায় খুশি ছিলেন না,অবশ্য পরে বম্বেতে গিয়ে নিজেই বলেছিলেন মন দিয়ে অভিনয় কর এবং তাঁর অনুরোধেই কুমুদলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম বদলে অশোককুমার করে দেওয়া হয়৷অচ্ছুৎ কন্যা’ ছবিতে অনবদ্য অভিনয়ের সাক্ষর রাখলেন৷ ‘বচন’-এ রাজপুত শৌর্য, ‘ইজ্জত’-এ দেশি রোমিওর ভূমিকায় তাঁর অভিনয়ে দর্শকরা মুগ্ধ৷

আরো পড়ুন:  ভারত চীন যুদ্ধ,নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছিল মৃণাল সেন পরিচালিত "নীল আকাশের নীচে"

একঘেঁয়ে প্রেম আর হিন্দি সিনেমা তখন যেন সমার্থক ! অথচ চেনা চিত্রনাট্যে দর্শকদের অরূচি৷ প্রয়াত হয়েছেন হিমাংশু রায়৷নতুন ধরনের চিত্রনাট্য সময়ের দাবি৷শালাবাবু,ভগ্নীপতি থেকে শশধর মুখার্জির বন্ধু জ্ঞান মুখোপাধ্যায় অনুধাবন করলেন বিষয়টা৷ ‘কিসমত’ ছবির নায়ক ঐ পানসে প্রেমের মুখ্য চরিত্র নয়,বরং ১৯৪৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছকভাঙা ছবিটি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল ভারতের সফলতম ছবি,ভারতীয় সিনেমার একটা মাইলস্টোন৷ছবির মুখ্য চরিত্র প্রতারণা করে,দাঁতে সিগার চেপে ধোঁয়া ছাড়ে।সিনেমা দেখে সেদিনের তরুনরা তখন দাদামণিকে নকল করে,আঙুলের ফাঁকে থাকে সিগারেট,মুখে ধোঁয়া | ‘হাওড়া ব্রিজ’, ‘ভাই ভাই’ থেকে ‘জুয়েল থিফ’ সর্বত্র খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে অশোককুমার জিতে নিয়েছেন দর্শক,চিত্র সমালোচকদের হৃদয় |

আরো পড়ুন:  পাহাড়েই হারিয়ে গিয়েছেন পর্বতকন্যা ছন্দা গায়েন

ভারতীয় চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম সুপারস্টার অভিনেতা৷জীবনের প্রথম ছবি ‘জীবন নইয়া’তে অশোককুমারের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল | নায়ক,খলনায়ক,চরিত্রাভিনয় সবমিলিয়ে তিনি একজন কালজয়ী অভিনেতা,যিনি শুধুমাত্র অভিনয় দক্ষতায় উতরে দিতে পারতেন যেকোনও চরিত্র এমন কি ছবি৷পর্দায় চিরকালের রোমান্টিক নায়ক দেবানন্দ কেরিয়ারে প্রথম ব্রেক পেয়েছিলেন অশোককুমারের হাত ধরে ৷ ‘জ়িদ্দি’ছবিতে পেয়েছিলেন নায়কের চরিত্র ৷ স্বয়ং শাম্মি কাপুর দাদামণির সঙ্গে শুধুমাত্র স্ক্রিন শেয়ার করবেন বলে পান মশলার বিজ্ঞাপন করেছিলেন বলে অকপটে স্বীকার করেছেন |

আরো পড়ুন:  মৃত সন্তানের দেহের সামনে দাঁড়িয়েও কবিগুরুর গানের শুদ্ধতাকে নষ্ট হতে দেননি সুবিনয় রায়

‘বন কি চিড়িয়া’, ‘খেত কি মুলি’ শুনে সবাই বলেছিল মেয়েলি আওয়াজ। সেই থেকে বরফ গিলে গিলে গলা ঠিক করেছেন,শিল্পের প্রতি নিখাদ ভালবাসা আর আন্তরিকতা না থাকলে বোধহয় কেউ এমন করেন না৷ মুখ্য চরিত্রের পরে যখন অশোককুমার চরিত্রাভিনয়ের দিকে সরে এসেছেন,সেইসময় বোঝা যেত কি অসমান্য অভিনয় দক্ষতা নিয়ে মানুষটা জন্মগ্রহন করেছিলেন৷অশোক কুমার অভিনীত সফল ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘চল চল রে নওজোয়ান’, ‘শিকারী’ ‘মহল’ ‘সংগ্রাম’,’সমাধি’ |

বাংলা ভাষার ছবি ‘হসপিটাল’, ‘আনন্দ আশ্রম’ অভিনয় করেছেন অশোককুমার৷ জীবনে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার৷ ১৯৬৯ সালে সেরা অভিনেতার সম্মান পেয়েছেন। ১৯৮৮ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার জয়, ১৯৯৫ সালে পদ্মভূষণ পদক।১০ ডিসেম্বর, ২০০১,সবাইকে ফাঁকি দিয়ে দাদামণি আকাশের তারা হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন,শেষ হল ভারতীয় সিনেমার একটি সোনালী অধ্যায় |

-অরুনাভ সেন
তথ্য : আনন্দবাজার পত্রিকা (চিরশ্রী মজুমদার)

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।