পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন সুফিয়া কামাল

পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন সুফিয়া কামাল

পাকিস্তানের তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহাবউদ্দীন জাতীয় পরিষদকে জানালেন রবীন্দ্রনাথের যেসব গান পাকিস্তানের আদর্শবিরোধী, বেতার ও টেলিভিশন থেকে তার প্রচার বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য গানের প্রচারও ক্রমশ কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে পরদিনই উনিশজন বাঙালি নাগরিকের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হল আজকের বাংলাদেশে,সেদিনের পূর্ব পাকিস্তানে৷রবীন্দ্রনাথ ‘বাংলাভাষী পাকিস্তানীর সাংস্কৃতিক সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ’ দাবি করা বিবৃতিতে ১৯ জনের মধ্যে তিনিও স্বাক্ষর করেছিলেন শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে৷

“আজিকার শিশু” কবিতায় তিনিই লিখেছেন,
“আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা
তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা।
আমরা যখন আকাশের তলে ওড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি
তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।
উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু সব তোমাদের জানা
আমরা শুনেছি সেখানে রয়েছে জিন, পরী, দেও, দানা।
পাতালপুরীর অজানা কাহিনী তোমরা শোনাও সবে”৷

তিনি নিজেই বলেছেন “চৌদ্দ বছর বয়সে বরিশালে প্রথমে সমাজ সেবার সুযোগ পাই। বাসন্তী দেবী ছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্তের ভাইয়ের ছেলের বৌ। তার সঙ্গে দুঃস্থ মেয়েদের বিশেষ করে মা ও শিশুদের জন্য মাতৃসদনে আমি কাজ শুরু করি”৷বিগত শতাব্দীর অধিকাংশ সময় জুড়ে তিনি ছিলেন প্রতিবাদী ভাবমূর্তির প্রতীক৷সমাজসেবা থেকে রাজনৈতিক আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছেন।অথচ তাঁর উপস্থিতি ছিল সর্বদা স্নিগ্ধ,কোমল৷তিনি সুফিয়া কামাল | তাঁর নিজের জীবন ইতিহাসের একটি অধ্যায়৷প্রথিতযশা কবি,লেখিকা পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে আছে নারী আন্দোলনে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা৷তিনি ছিলেন মানবতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে এক আপোষহীন নারী। তাঁর কণ্ঠ সর্বদা সোচ্চার হয়েছে অন্যায়, দুর্নীতি এবং অমানবিকতার বিরুদ্ধে৷

আরো পড়ুন:  চায়ে চুমুক দিয়ে মুগ্ধ নেতাজি বললেন,তোকে আশীর্বাদ দিলাম ভুলু একদিন তোর বোস কেবিনের সুনাম ছড়াবে

একটি রক্ষণশীল পরিবারের কন্যা হয়ে ভেঙেছেন শৃঙ্খল ৷ নারীদের জন্য খুঁজে দিয়েছেন মুক্ত আলোর পথ৷তাঁর পক্ষেই বলা মানায়,
“তোমার আকাশে দাও মোর মুক্ত বিচরণ-ভূমি,
শিখাও আমারে গান। গাহিব, শুনিবে শুধু তুমি”৷

তাঁর জন্ম প্রসঙ্গে নিজের কথা, “মাটিকে বাদ দিয়ে ফুল গাছের যেমন কোনো অস্তিত্ব নেই, আমার মাকে বাদ দিয়ে আমারও তেমন কোনো কথা নেই। আমি জন্ম নেবার আগেই মায়ের মুখে ‘হাতেম তাইয়ের কেচ্ছা’ শুনে আমার নানী আম্মা আমার নাম রেখেছিলেন হাসনা বানু। আমার নানা প্রথম বয়সে সদর আলা থেকে জজগিরি পর্যন্ত সারা করে শেষ বয়সে সাধক-“‘দরবেশ” নাম অর্জন করেছিলেন। শুনেছি যেদিন আমি হলাম, নিজের হাতে আমার মুখে মধু দিয়ে তিনি আমার নাম রেখেছিলেন সুফিয়া খাতুন। কিন্তু আমার ডাকনাম হাসনা বানুটাই আমাদের পরিবারে প্রচলিত। সুফিয়া বললে এখনো কেউ কেউ আমাকে হঠাৎ চিনতে পারেন না। আমার ভাইয়া ছোটবেলায় আমাকে ডাকতেন “হাচুবানু”বলে,কেউ কেউ বলত “হাসুবান”।”

বরিশালের শায়েস্তাবাদ নবাব পরিবারে ভাইয়ার আদরের “হাচুবানু” পৃথিবীর প্রথম আলো দেখেন ১৯১১ সালের ২০ জুন৷ বাবা সৈয়দ আবদুল বারি ছিলেন উকিল।তাঁর বয়স যখন সাত বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে যান৷ তবে মা সৈয়দা সাবেরা খাতুনের ভালোবাসায়,যত্নে বড় হচ্ছিলেন তিনি৷ রক্ষনশীল পরিবারের মেয়ে সন্তান,স্বভাবত সেইসময় বাড়ির বাইরের শিক্ষাঙ্গনে লেখাপড়া করার সুযোগ হয় নি৷ বড় মামার বিশাল পাঠাগারে বাড়ির মহিলাদের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ, সেটাই তাঁর পরম পছন্দের জায়গা হয়ে ওঠে৷ বাড়ির অন্দর মহলে বাংলা ভাষায় পড়ালেখা করা যেত না৷তিনি বাংলা পড়তে শিখেছেন মায়ের কাছে, লুকিয়ে লুকিয়ে৷মামার পাঠাগারের বই গোপনে পড়তেন | শৈশবের শুরুতে এভাবেই তাঁর মনের গহনে রোপিত হয়েছিল সাহিত্যের বীজ। কাজী নজরুল ইসলামের লেখা “হেনা” পড়েছিলেন বানান করে, অদ্ভুত ভালো লেগেছিল৷”প্রবাসী” পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা প্রভাব ফেলেছিল সুফিয়া কামালের মনে৷মাত্র বারো বছর বয়সে সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হল৷স্বামী নেহাল হোসেন মানুষটা নিজেও ছিলেন সাহিত্যিক৷ সহধর্মিনীর সাহিত্যের প্রতি অনুরাগে প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল,উৎসাহ দিয়েছেন নিজেই৷স্বামীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় নিজের সাহিত্য চর্চায় বাধা থাকেনি৷সেই সময় কলম ধরেছেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বেগম সারা তাইফুর | তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, অনেকটা সঙ্গে স্বামীর প্রবল উৎসাহ, কলম হাতে তুলে নিতে নিজের মনে দ্বিধা থাকেনি৷ বরিশালের জনপ্রিয় “তরুণ” পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সুফিয়া কামালের গল্প “সৈনিক বধূ”৷তাঁর রচিত গল্পের বই “কেয়ার কাঁটা” প্রকাশিত হল যখন তিনি মাত্র সোলো বছরের বধূ৷মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, সুফিয়া কামালের জীবনের আরেক অনুপ্রেরণার নারী৷ বেগম রোকেয়ার জীবন দর্শন, নারী জাগরণ ও সাহিত্যানুরাগী চরিত্র ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল শৈশবের সুফিয়াকে |

আরো পড়ুন:  সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন ‘বাউল সম্রাট’ লালন

স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেওয়া তাঁর জীবনের আর একটি পর্ব৷বরিশালে চরকায় নিজের হাতে সুতো কেটে মহাত্মা গান্ধীর কাছে দিয়েছিলেন ৷ সুফিয়া কামাল মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম “ভারতীয় মহিলা ফেডারেশন”-এর সদস্য নির্বাচিত হন। জীবনের আটটি বসন্ত তিনি কলকাতা পুরসভার প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন৷ স্কুলেই তার পরিচয় হয় প্রাবন্ধিক আবদুল কাদির এবং কবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে।সুফিয়া কামাল যখন ২১ বছরের নারী তখন তিনি তাঁর সাহিত্য চর্চার প্রচ্ছন্ন সমর্থক স্বামী নেহাল হোসেনকে হারালেন, প্রয়াত হলেন তিনি৷১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় সুফিয়া কামালের”সাঁঝের মায়া” কাব্যগ্রন্থ৷ কার্যত এর ভূমিকা লিখেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ পড়ে উচ্ছসিত প্রশংসা করেছিলেন। সবসময় জনতার কণ্ঠস্বরে গলা মিলিয়েছেন সুফিয়া কামাল। মানুষটা বাংলাদেশে ১৯৫২ থেকে ১৯৭১—দীর্ঘ সময়ে সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনে নারীদের মিছিল সংগঠিত করেছেন, তিনি বাংলাদেশের নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, “জননী সাহসিকা” সুফিয়া কামাল পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেছেন,গণ-অভ্যুত্থানে নিজের নেতৃত্বে মিছিল করার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন পাকিস্থানের শাসকের “তমঘা-ই-ইমতিয়াজ”পদক। সরাসরি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্রব না থাকলেও তাঁর কাছে মুখ্য ছিল বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম। স্বাধীন বাংলাদেশে ৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেও যেমন তিনি ছিলেন সোচ্চার কণ্ঠ,ঠিক তেমন ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী প্রতিবাদী মৌন মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন৷অনেক সংগঠনের সভানেত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। পদক পেয়েছেন অসংখ্য৷ উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ” বাংলা অ্যাকাডেমি পুরস্কার” “একুশে পদক”, সোভিয়েত ইউনিয়নের “লেনিন পদক” ও চেকোস্লোভাকিয়ার “সংগ্রামী নারী পুরস্কার”। সুফিয়া কামাল রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেগযোগ্য “সাঁঝের মায়া” , ” মায়া কাজল”, “মন ও জীবন”, “দিওয়ান”, “প্রশস্তি ও প্রার্থনা”, “উদাত্ত পৃথিবী”৷ গল্পগ্রন্থের তালিকায় আছে” কেয়ার কাঁটা”, ভ্রমণকাহিনী ” সোভিয়েতে দিনগুলো” ৷ “একাত্তরের ডায়েরী” ছাড়াও লিখেছেন ” ইতল বিতল”, “নওল কিশোরের দরবারে”৷ ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর মহীয়সী নারী “জননী সাহসিকা” সুফিয়া কামাল প্রয়াত হন। গুগল ২০১৯ এর ২০ জুন তাঁর জন্মদিন ডুডুল তৈরি করে সম্মান প্রদর্শন করে৷

আরো পড়ুন:  লকডাউনে স্কুল বন্ধ,চা বাগানের ছেলেমেয়েদের ১০ টাকায় টিউশন পড়াচ্ছেন বাঙালি দম্পতি

-অরুনাভ সেন

Avik mondal

Avik mondal

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।