“সোনার কেল্লা”র ডায়েরি – কাঁকড়া বিছে ও মন্দার বোস

“সোনার কেল্লা”র ডায়েরি – কাঁকড়া বিছে ও মন্দার বোস
অক্টোবরের শীতের সকাল | যোধপুর সার্কিট হাউসে এক নম্বর ঘরে তখন দুই ছদ্মবেশীর ঘেমে ওঠার জোগাড় | উপলক্ষ্য কলকাতা থেকে আসা একটি টেলিগ্রাম |
পাঁচ নম্বর ঘরের ছদ্মবেশী ভূ – পর্যটক মন্দার বোস
ওরফে কামু মুখার্জি ও অমিয়নাথ বর্মন ওরফে অজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই সংলাপ আজও মনের কোণে উঁকি দেয় ———
মন্দার : একি খোকার জন্য বডিগার্ড আসছে নাকি ?
বর্মন : বডিগার্ড –গোয়েন্দা – টিকটিকি–_ যা বলতে চাও |
মন্দার : Prodosh Mitter — –একে আপনি চেনেন ?
বর্মন : আমি চিনি কিনা সেটাতো বড় কথা না —-_ প্রশ্ন হচ্ছে ডক্টর হাজরা চেনে কিনা —-
মন্দার : তাহলে তো আপনি মাল ক্যাচ ! অতএব একেও খতম —-তাই ত ?
বর্মন :এছাড়া আর কোনো রাস্তা আছে কি ?
মন্দার :আর যদি না চেনে ?
বর্মন : তাহলে তাড়াটা কম —–
মন্দার : কিন্তু ফাঁড়াটা ত রয়েই যাচ্ছে |
ফেলুদাকে ‘ভ্যানিশ’ করার ছক তখনই চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত | আর ‘ভ্যানিশ ‘ করার অস্ত্র ?
আচমকাই বর্মনের মুখের কথা থেমে গেছে | তাঁর নজর বাইরের সিঁড়ির পাশে |সেখানে প্রাতঃভ্রমণে ব্যস্ত এক কাঁকড়া বিছে |
বর্মন : বিছে টিকটিকির খাদ্য , না টিকটিকি বিছের খাদ্য ?
মন্দার :(বিছেটার দিকে তাকিয়ে ) কী ভাবছেন ?
বর্মন : আমার কাছে একটা খালি বোতল আছে |
মন্দার : (আনন্দে গদগদ হয়ে ) ধরবেন ?
বর্মনের হাসি মিলিয়ে যায় | কড়া চোখে মন্দারের দিকে তাকিয়ে , ‘ ধরবো মানে ? তুমি ধরবে |”
মন্দার : অন্য রাস্তা ভাবুন | ও কি মারাত্মক জিনিস জানেন ? এক ছোবলেই সাবাড় |
বর্মন : শেয়ার চাই, না চাই না ? সেটা ঠিক করে বল ত !
মন্দার :(অনিচ্ছা সত্ত্বেও বোতলের ইঙ্গিত করে ) দিন , বোতল দিন |
ওই দিন রাত্রিবেলা | সার্কিট হাউসে হাজির ফেলুদা ও তোপসে | মন্দার বারান্দায় চেয়ারে বসে ধূমপানে ব্যস্ত সঙ্গে টিকটিকি সাফাইয়ের পরিকল্পনায় মগ্ন | টার্গেট সার্কিট হাউসের তিন নম্বর ঘর , ওটাই ফেলুদার ঠিকানা কিনা |
টেনশনে থাকা বর্মন ওরফে ‘নকল’ ডাক্তার হাজরা এক ঝলক ফেলুদাকে দেখেই তড়িঘড়ি ঢুকে গেলেন এক নম্বর ঘরে |
আর এর কিছুক্ষণ পরেই পর্দার সেই দৃশ্য ۔۔۔۔۔۔
মন্দারের ঘর |
মন্দার আলমারি খুলে উপরের তাকের পিছন থেকে একটা বোতল বের করে | হরলিক্স-এর বোতল |
মন্দার : কি বাবা —- আছ , না নেই ?
বিছেটাকে জ্যান্ত দেখে উৎফুল্ল মন্দার বেরিয়ে পড়ে অপারেশন সফল করতে |
‘দুষটু’ মন্দার বোতল খুলে তিন নম্বর ঘরের জানলা দিয়ে এক ঝটকায় বিছেটাকে চালান করে বেশ আশ্বস্ত | ‘ ভ্যানিশ ‘ প্রক্রিয়ার প্রথম পর্যায় সমাপ্ত | আর বিছেটা !
রীতিমতো ‘ভাগ্যবান’ বলতে হবে |
কেন !
সার্কিট হাউসের আশেপাশে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে থাকা বিছেটি তিন নম্বর ঘরে পরিপাটি করে সাজানো বিছানার সাদা চাদরে আসীন |
না , মন্দার ও বর্মনের কপালটাই খাৱাপ | ‘ওয়াটসন ‘ তোপসের চোখে ধরা পড়েই গেল “লোমশ ভি আই পি” |
মনে পড়ে সেই দৃশ্য ۔۔۔۔
তোপসে : (চেঁচিয়ে ) ফেলুদা —-
ফেলুদা লাফিয়ে উঠে টেবিল থেকে কাঁচের গ্লাস দিয়ে চাপা দেয় |
ফেলুদা : দেখে যা তোপসে —- এ জিনিস এতো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবি না |
. . ল্যাজের ডগার হুলটা দেখেছিস ?
তোপসে : যদি ছোবল মারে ?
ফেলুদা : মারাত্মক বিষ —- এক ছোবলে আধমরা | .
. . . . আর শিশু হলে নির্ঘাৎ মৃত্যু —–|
রাজস্থান যাত্রার আগে মানিকবাবু ইউনিটের অন্যদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,’মনে রেখো,ওরাও এখন আমাদের অভিনেতা |’ যথেষ্ট খাতির যত্ন করে নিয়ে যাওয়ার পরে দেখা গেলো দু ‘জনের একজন মৃত | ইউনিটের সবাই বেশ টেনশনে | ব্যতিক্রমী কেবলমাত্র মানিকবাবু |
সন্দীপ রায়-এর কথায় , এই দুই নতুন অতিথিকে জোগাড় করা হয়েছিল কলকাতার শহীদ মিনারের নীচে বসা রবিবারের এক মেলা থেকে | হরলিক্সের শিশি করে যোধপুর সার্কিট হাউসে নিয়ে আসার পরেই দেখা গিয়েছিল একজন দেহ রেখেছেন |
অবশিষ্টটি তখন ইউনিটের সকলের কাছে পেয়েছিল ভি আই পি ট্রিটমেন্ট | ইউনিটের সকলকে রীতিমতো ঘামিয়ে তুলেছিল | মনে পড়ে সোনার কেল্লার সেই শুটিং দৃশ্যের কথা !
মুকুলের ‘দুষ্টু লোক’ মন্দার বোস ওরফে কামু মুখার্জি যখন কাঁকড়া বিছেটিকে ফেলু মিত্তির ওরফে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিছানায় ছেড়েছেন ঠিক তখনই হঠাৎ লোডশেডিং হওয়ায় অন্ধকারের মধ্যে এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় |
আলো জ্বালার পর বিস্তর খোঁজাখুঁজির পরেও বিছে বাবাজি যখন নাগালের বাহিরে ঠিক তখনি তাকে পাওয়া গেল বালিশের ঢাকনার ভিতরে |
আরে দেখুন দেখি কাঁকড়াবিছে নিয়ে কথা হচ্ছে | অথচ পর্দার আড়ালে থাকা এই ঘটনার আসল ‘নায়ক’ কামু মুখার্জির কীর্তিকলাপ নিয়ে তো কিছুই বলা হয় নি |
যোধপুরে সার্কিট হাউসে মানিকবাবু বলেছিলেন , ‘ ওটাকে শিশি থেকে বের করে খালি হাতে ধরতে পারবে?”
কামুবাবুর জবাব, ‘ কেন পারব না |’
মানিকবাবু বলেছিলেন, ‘ করে দেখাও |’
সকলকে অবাক করে কামুবাবু শিশি থেকে অনায়াসে বের করে বলেছিলেন , ‘ এই তো |’
যোধপুর সার্কিট হাউসের বারান্দায় কাঁকড়া বিছেটিকে ছেড়ে দিয়ে হুল সমেত ধরার চর্চা করতেন কামুবাবু | আর সকলকে টেনশনে রেখে অবলীলায় ধরেও নিতেন খাঁটি ভারতীয় এই জিনিসটিকে | সাথে সাথেই রসিক কামুবাবু বলতেন ,’এই বিছের ব্যাপারটা ছবিতে কেমন থ্রিলিং হবে বলুন তো?”
স্মৃতিচারণায় কামুবাবু বলেছিলেন , বড়ো বড়ো লোমযুক্ত নীল রঙের কাঁকড়া বিছেটিকে কামুবাবু চর্চার সময় টপটপ করে ধরে ফেলতেন | আর এটাই কামুবাবুর পক্ষে ‘কাল ‘ হলো |
যোধপুর সার্কিট হাউসে শুটিং হলো ঠিকই কিন্তু কলকাতায় ফিরে মানিকবাবুর মতবদল |
মানিকবাবু বলেছিলেন , ‘ কামু , ওই শটটা অতো ভালো , কিন্তু কাজে লাগাতে পারলাম না |”
কামুবাবু বলেছিলেন , ‘ কেন দাদা ?”
মানিকবাবু বলেছিলেন , ‘ ওতে বাচ্চারা ভয় পাবে না | ভয়টা চলে যাবে | ভাববে যে , তুমি খেলনা বিছে তুলছ |’
এতো কাটছাঁটের পরেও পর্দায় এই দৃশ্য দেখে অনেকেই ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন,’ক্যামেরার কাজটা একবার দেখুন মশাই , রাবারের বিছেকে কেমন করেছে !’
মানিকবাবুর দূরদৃষ্টিকে সেলাম জানাতেই হয় |
সত্য সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ ! অনেক ক্ষেত্রেই গুণী মানুষ তাঁর কাজের যোগ্য স্বীকৃতি পান না |
এবার আসি শুটিং প্রসঙ্গে ——
কামুবাবু খালি হাতে বিছেটাকে ধরে ফেলুদার তিন নম্বর ঘরে বিছানার ওপর ছেড়ে দেওয়ার
দৃশ্যটি যোধপুর সার্কিট হাউসে ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছিল |
আবার ফেলুদার ঘরের দৃশ্য তোলা হয়েছিল কলকাতায় | কলকাতার স্টুডিওতে অবিকল যোধপুর সার্কিট হাউসের ঘর বানানো হয়েছিল | নিশ্চয়ই চোখের সামনে ভেসে উঠছে ফেলুদা ওরফে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিছানায় শোওয়ার দৃশ্য এবং তোপসের চোখে কাঁকড়াবিছের ধরা পড়ার দৃশ্য | এই সময়েই ঘটেছিল লোডশেডিংয়ের ঘটনা |
– লিখেছেন পবিত্র মুখোপাধ্যায়
আরো পড়ুন:  ব্রিটিশ ভারতের স্নাতক ডিগ্রিধারী প্রথম নারী ছিলেন তিনি
Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।