কলকাতায় প্লেগ,নিজের জীবন তুচ্ছ করে কলকাতার গলিতে গলিতে ঘুরে মানুষের সেবা করলেন ভগিনী নিবেদিতা

কলকাতায় প্লেগ,নিজের জীবন তুচ্ছ করে কলকাতার গলিতে গলিতে ঘুরে মানুষের সেবা করলেন ভগিনী নিবেদিতা

আজকাল চারিদিকে করোনার প্রকোপ । সারা বিশ্বে মারা গিয়েছেন বহু মানুষ । প্রভাব পড়েছে বাংলার উপরেও । মারাও গিয়েছেন অনেকে । তবে এরকম রোগ বা মহামারীর প্রকোপ কিন্তু বাংলায় আগেও হয়েছে ।

১৮৯৮ সাল । লোকের মুখে মুখে ঘুরছে একটাই কথা বোম্বেতে একটা ভয়ানক ব্যাধি দেখা দিয়েছে, তার নাম প্লেগ । সেই ব্যাধিতে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছে । বোম্বে থেকে ধীরে ধীরে গুজরাট, কচ্ছ, সিন্ধু ও পাঞ্জাবের কিছু অংশ এবং মাদ্রাজ পেরিয়ে সেই রোগ নাকি কলকাতাতেও থাবা বসাতে চলেছে । এমন সময় একদিন রাতে বোম্বে মেল্ থেকে হাওড়া স্টেশনে নামলেন এক মহিলা । মুখটা তার ঘোমটায় ঢাকা । হাওড়া স্টেশনের বাইরে তখন ছিল ঘোড়ার গাড়ির স্ট্যান্ড । একটি ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে সেই মহিলা চলল কলকাতার দিকে । হাওড়া রোড পেরিয়ে গাড়ি তখন হ্যারিসন রোডে, কোচোয়ান জানতে চাইল, আপনি যাবেন কোথায় ? সেই মহিলা জবাব দিলেন আমি কলকাতাতেই থাকব, আমাকে চিনতে পারছিস না ! আমি প্লেগদেবী । এই কথা শুনে কোচোয়ান আঁতকে উঠল । পিছনে তাকিয়ে সে দেখল নেই । ঊনিশ শতকের শেষভাগে প্লেগ নিয়ে এই গল্পটা ছড়িয়েছিল ।

আরো পড়ুন:  জোম্যাটোর বাতিল অর্ডারের খাবার অভুক্ত শিশুদের মুখে তুলে দেন "রোলকাকু" পথিকৃৃৎ সাহা

ভারতে থাবা বসানোর আগে সারা বিশ্বে বেশ কয়েকবার প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছিল । ৫৪২ খ্রিস্টাব্দে রোমে প্লেগে মারা যায় এক কোটি মানুষ, এরপর ১৩৪৬ সালে ইউরোপ প্লেগে মারা যায় আড়াই লক্ষ মানুষ ।১৮৯৮ সালে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ল কলকাতায় । অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ইঁদুরের উৎপাত এবং সেই ইঁদুরের গায়ে বসা ফ্লি মাছি খুব দ্রুত প্লেগের সংক্রমণ ঘটিয়েছিল মানুষের মধ্যে । ব্রিটিশরা হিমশিম খেয়েছিল পরিস্থিতি সামাল দিতে । মারা গিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ । কলকাতায় গলির পর গলি উজাড় হয়ে গিয়েছিল প্লেগে । ছড়িয়ে পড়েছিল গুজব – ইংরেজের হাতে টীকা নিলে রোগ আরও ছড়াবে এমনকি মৃত্যুও হতে পারে । কেউ বলল প্লেগের টীকা নেওয়ার ১০ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু নিশ্চিত। এর ফলে অনেকে টিকা নিতে চাইল না , মারাও গেল তারা । কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য দফতরের প্রধান ছিলেন কুক, অনেকে তাকে মারবে বলেও ঠিক করল । তখন কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য দফতরের প্রধান ছিলেন কুক সাহেব। অনেকে তাঁকে মারবে বলে সুযোগ খুঁজতে লাগল।

এদিকে মৃত্যুমিছিল বেড়েই চলল । মানুষ কলকাতা ছাড়তে চাইল । সমসাময়িক পত্রিকায় আছে ‘প্লেগের কথা শুনিয়া কলিকাতাস্থ লোকের আতঙ্ক ভয়ানক বৃদ্ধি পাইয়াছিল। সকলেই বিভব দূরে ফেলিয়া পুত্রকন্যা লইয়া শহর ত্যাগে প্রস্তুত হইল। সে ভয়, সে ভাবনা সহজে বর্ণনা করা যায় না…।’ হাজার হাজার মানুষ ট্রেনে, ঘোড়ার গাড়িতে চেপে শহর ছাড়ল । এই পরিস্থিতিতে শুরু হল দাঙ্গাহাঙ্গামা । গোটা শহর আবর্জনায় ও দুর্গন্ধে ভরে উঠল । কলকাতা পরিণত হল শ্মশানে ।

আরো পড়ুন:  মা-বাবার মৃত্যু,স্বামীর অত্যাচার-সর্বস্ব হারিয়েও লড়াই করে রূপা চৌধুরী হয়ে উঠলেন বাংলায় সুইগির প্রথম মহিলা ডেলিভারি গার্ল এবং ওলা চালক

স্বামী বিবেকানন্দ তখন ছিলেন দার্জিলিংয়ে । প্লেগের কথা শুনেই তিনি কলকাতা ফিরে আসলেন । মঠের সন্ন্যাসীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেবাকার্যে । মহামারীর জন্যে টাকা ওঠাতে তিনি বেলুড় মঠ বিক্রিও করে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু বাধা দিলেন রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের জননী সারদা দেবী । তিনি বোঝালেন, শুধু একবার ত্রাণকার্য চালিয়েই কি রামকৃষ্ণ মঠের কাজ শেষ হয়ে যাবে ? মঠ থাকলে ভবিষ্যতেও সাধারণ মানুষের সেবা করা যাবে । সেই সময় মঠের সন্ন্যাসীদের সাথে আরও একজন বিদেশিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন কলকাতার মানুষের সেবায় – তিনি ভগিনী নিবেদিতা । সেইসময় বাংলার বিখ্যাত ডাক্তার রাধাগোবিন্দ কর (যার নামে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ) কলকাতার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে রোগী দেখতেন । তিনি লিখেছেন, ‘একদিন চৈত্রের মধ্যাহ্নে রোগী পরিদর্শনান্তে গৃহে ফিরিয়া দেখিলাম, দ্বারপথে ধুলিধূসর কাষ্ঠাসনে একজন য়ুরোপীয় মহিলা উপবিষ্টা। উনিই ভগিনী নিবেদিতা।’

আরো পড়ুন:  প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়

প্লেগ মহামারীতেই প্রথমবার ত্রাণকার্য করেছিল রামকৃষ্ণ মিশন। প্লেগ খুব ছোঁয়াচে রোগ। রোগীর ধারেকাছে যেতে সাহস পেত না কেউ। স্বামী বিবেকানন্দ, ভগিনী নিবেদিতা ও গুরুভ্রাতারা দরিদ্র বস্তিতে দিনের পর দিন রোগীদের সেবা করেছিলেন । রাধাগোবিন্দ কর একদিন সকালে বাগবাজারের বস্তিতে প্লেগে আক্রান্ত এক শিশুকে দেখে বাড়ি ফিরছিলেন । দেখলেন ভগিনী নিবেদিতা ডাক্তারের বাড়ির সামনে বেঞ্চিতে বসে অপেক্ষা করছেন । ডাক্তারবাবু তাকে জিজ্ঞেস করলে বললেন তিনি ওই ছেলেটির খবর নিতেই এসেছিলেন । এরপর বাগদি বস্তিতে প্লেগের পরিচর্যা সম্পর্কেও দুজনের বিস্তারিত কথা হয়েছিল ।

কলকাতার গলিতে গলিতে ঘুরে রোগীদের সেবা করতেন নিবেদিতা । প্রায়ই একবেলা খেয়ে থাকতেন । এমনকি সংক্রমণ যাতে না ছড়ায় তার জন্যে শহরকে পরিছন্ন রাখতে ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নেমেছিলেন ভগিনী নিবেদিতা । বিদেশি বলে যে কলকাতা নিবেদিতার ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলত, সেই কলকাতাকেই দিনের পর দিন নিজের সেবা দিয়ে গিয়েছেন নিবেদিতা । ধীরে ধীরে বেশ কয়েকমাস পর প্লেগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় । আর এই সেবাকর্মে সবার প্রথমে থাকবে স্বামী বিবেকানন্দ, ভগিনী নিবেদিতা এবং রামকৃষ্ণ মিশনের গুরুভ্রাতাদের অবদান ।

-অভীক মণ্ডল
তথ্য – দ্য ওয়াল,নিউস ১৮ বাংলা,বঙ্গদর্শন

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।