এমএসসি-র রেজাল্টের আগেই সেই ক্লাসেই অধ্যাপক নিযুক্ত হলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ

এমএসসি-র রেজাল্টের আগেই সেই ক্লাসেই অধ্যাপক নিযুক্ত হলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ

১৯১৫ সাল | কলকাতার রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজে কেমিস্ট্রি বিভাগে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ক্লাস চালু করছেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় | ১ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস চালু হওয়ার কথা | এদিকে বেশ কিছু অধ্যাপকের স্থান খালি | অগত্যা উপায় ? স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ডেকে পাঠালেন এক যুবককে | যুবকটি সবে এমএসসি পরীক্ষা দিয়েছে | পরীক্ষার ফলাফল বেরোতে বাকি বেশ কয়েক মাস | যুবকটি গেলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে | স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাকে বললেন তোমাকে রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজে কেমিস্ট্রি বিভাগে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ক্লাস নিতে হবে | এই প্রস্তাবে যুবকটি হতবাক | এমএসসি পরীক্ষার ফলাফল বেরোয়নি, তার আগেই সেই ক্লাসে অধ্যাপনা করতে হবে | এদিকে নির্দেশ স্বয়ং স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের | না বলার উপায় নেই | শেষমেশ সে রাজি হল | এমএসসি পরীক্ষার ফলাফল বেরোলে দেখা গেল এমএসসি-র কেমিস্ট্রিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন তিনিই | এমনকি তার প্রাপ্ত নম্বরের আশেপাশে নেই অন্য কেউ | কে সেই যুবক ?

সেই যুবকটি হলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ | জন্ম ১৮৯৪ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর পুরুলিয়ায় | পিতা রামচন্দ্র ঘোষ | ছোট থেকেই মেধাবী ছিলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ | ১৯১১ সালে আইএসসি পরীক্ষায় চতুর্থ হন তিনি | ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে | ১৯১৩ সালে রসায়ন শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে বিএসসি এবং ১৯১৫ সালে রসায়ন শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি পাশ করেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ । আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের স্নেহধন্য ছিলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ | আচার্য প্রায়ই সন্ধ্যাবেলা কলকাতার গড়ের মাঠে কয়েকঘণ্টার জন্যে তাকে নিয়ে বেড়াতে বেরোতেন | আলোচনা হাত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে | বিএসসি পড়ার সময় জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের বাবা মারা যান | পারিবারিক ঋণের দায়ে দুর্গতি বাড়ে।প্রেসিডেন্সির অধ্যক্ষ জেমস জানতে পেরে অর্ধবেতনে জ্ঞানচন্দ্রকে পড়ানোর ব্যবস্থা করে দেন। বিএসসিতে প্রথম হয়ে অধ্যক্ষের মান রেখেছিলেন জ্ঞানচন্দ্র | তখন বৃত্তি পান ৪০ টাকা | সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহার সতীর্থ ছিলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ |

আরো পড়ুন:  বাঘের দৌরাত্ম্য ছিল কলকাতাতেই,তোলপাড় সেই আমলের খবরের কাগজে

এমএসসির ফল বেরোনোর আগেই রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ।সাড়ে তিন বছর অধ্যাপনা করেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ। এই সময় জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ গাঢ় দ্রবণের মধ্যে লবণের অণুগুলি কীভাবে আয়নিত হয়ে বিদ্যুৎ পরিবহন করে – এই বিষয়ে মৌলিক গবেষণা করেন | তাঁর এই গবেষণালব্ধ তত্ত্ব “ঘোষের আয়নবাদ” নামে বিখ্যাত । লন্ডনের কেমিক্যাল সোসাইটির মাসিক পত্রিকায় সেই বিষয়ক বহু প্রবন্ধ লেখেন জ্ঞানচন্দ্র | ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে ডি.এসসি উপাধি লাভ করেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ | কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি ও স্যার তারকনাথ পালিত স্কলারশিপও পান তিনি | সেইসময় প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তির মূল্য ছিল ৪৫০০ টাকা | এই সময় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে নিযুক্ত কমিশনের সদস্য ফিলিপ হার্টগের সঙ্গে জ্ঞানচন্দ্রের পরিচয় হয়।তাঁর মৌলিক প্রবন্ধ পড়ে স্যার আশুতোষকে জ্ঞানচন্দ্রকে ইউরোপে পাঠাতে অনুরোধ করেন হার্টগ।জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ লন্ডনে গিয়ে গবেষণা করেন এবং ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন | জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের গবেষণায় মুগ্ধ হয়েছিলেন বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাংক, উইলিয়াম হেনরি ব্র্যাগ, ভালগার নের্নষ্ট প্রমুখ বিজ্ঞানীরা | লন্ডনে গবেষণা শেষ করে বার্লিন যান জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ। জার্মান ভাষায় তাঁর গবেষণার প্রবন্ধ অনুবাদ হয়।

আরো পড়ুন:  ইনজেকশনে আর ব্যথা নয়,অভিনব আবিষ্কার বাঙালি গবেষকের

 

ডঃ জ্ঞানচন্দ্র ঘোষসহ অন্যান্য বিজ্ঞানীরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে

এরপর দেশে ফিরে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ নবগঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন | দীর্ঘ কুড়ি বছর অধ্যাপনা ও গবেষণা করেন | আলোক রসায়ন বা ফোটো কেমিস্ট্রি নিয়ে তাঁর বিস্তারিত গবেষণা রয়েছে | সাধারণ গ্যাস হতে ফিসার-ট্রপস পদ্ধতিতে অনুঘটকের উপস্থিতিতে তরল জ্বালানির উৎপাদন নিয়ে তাঁর গবেষণা গোটা পৃথিবীতে সমাদৃত | এই বিষয়ে তিনি বইও লিখেছেন, নাম ‘সাম ক্যাটালাইটিক রিয়্যাকশন অফ ইন্ডাস্ট্রিয়ার ইমপরট্যান্স’ | ১৯৩৯ সালে ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সর অধিকর্তা ও ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সভাপতি হন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ | ইণ্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫০ সালে আই.আই.টি. খড়্গপুরের প্রথম ডিরেক্টর হন | ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন তিনি | ইন্ডিয়ান রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন, জাতীয় প্ল্যানিং কমিশন, বাংলার শিল্প পরিকল্পনা কমিটির সভ্য হিসেবেও বহু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ |

আরো পড়ুন:  লোধা ও শবর উপজাতির অধিকার ও ক্ষমতায়নের জন্য সারাজীবন কাজ করে গিয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী

১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ “নাইট” উপাধিতে ভূষিত হন। ভারত সরকার তাঁকে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে সম্মানিত করে। ১৯৫৯ সালের ২১ জানুয়ারী মাত্র ৬৪ বছর বয়সে কলকাতায় প্রয়াত হন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ | তার অমূল্য গবেষণা কর্ম, শিল্প ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার ও ভারতে প্রযুক্তি শিক্ষার বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

তথ্য ও ছবি : উইকিপিডিয়া

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।