সরকার প্রত্যাখ্যান করল রমেশচন্দ্র মজুমদারের লেখা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস,নিজেই পরবর্তীতে প্রকাশ করেছিলেন বই

সরকার প্রত্যাখ্যান করল রমেশচন্দ্র মজুমদারের লেখা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস,নিজেই পরবর্তীতে প্রকাশ করেছিলেন বই

দক্ষিণ কলকাতায় নিজের বাড়িতে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন , দূরদর্শনে নেতাজি সম্পর্কে তথ্যচিত্রের জন্য। যে কথা বলতে অনেকে কুণ্ঠিত সেই সত্য কথা অকপটেই বলে দিলেন “ভা রত স্বাধীন হয়েছে নেতাজির জন্যে। গাঁধীজির জন্যে বা জওহরলাল নেহরুর জন্য নয়৷”সেই তথ্যচিত্রে তিনি আরো বলেছিলেন, ১৯৪৫-এর আগস্টে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি যে মারা যাননি, তার একটা বড় প্রমাণ,ব্রিটিশ গোয়েন্দা দফতরের ডকুমেন্ট। ওই বিমান দুর্ঘটনার তারিখের অনেক পরে, ব্রিটিশ গোয়েন্দা দফতরের কলকাতা অফিস লন্ডন অফিসের কাছে জানতে চাইছে, নেতাজিকে হাতে পাওয়া গেলে তারা কী করবে। লন্ডন অফিস জানাচ্ছে, নেতাজিকে নিয়ে কী করা উচিত, তা তারা যথাসময়েই জানাবে। বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসচর্চায় যাদের ভূমিকা অগ্রপথিকের,যারা স্মরণীয়,যাদের নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে তাদের মধ্যে তিনি থাকবেন একেবারে সামনের সারিতে৷পুরনো যুগের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে তিনি একেবারে সমালোচিত হননি একথা যেমন বলা যাবে না,তেমন ভাবে একথা সঠিক সত্যের পথ তিনি ত্যাগ করেননি৷ ভারত সরকার স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখার ভার এই মানুষটাকে দিয়েছিল | কিন্তু তিনি লিখলেন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সত্যি ইতিহাস | নেহেরুর সেই ইতিহাস পছন্দ হল না | হবেই বা কি করে,সরকারের মনের মত কাহিনী তো তিনি লেখেননি ! কাজেই বাতিল হয়ে গেল তাঁর লেখা | শেষমেশ স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে নিজের নিরপেক্ষ মতামত চার খণ্ডে প্রকাশ করেছিলেন | তিনি সাহসী ঐতিহাসিক গবেষক বঙ্গসন্তান রমেশচন্দ্র মজুমদার | গবেষক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু আরেক বাঙালি দিকপাল মনীষা চর্যাপদের আবিস্কারক মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর তত্ত্বাবধানে। ‘অন্ধ্র-কুষাণ কাল’ নামক অভিসন্দর্ভ রচনা করে,’প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ’বৃত্তি লাভ করেছিলেন৷

আরো পড়ুন:  স্পষ্টবাদিতা থেকে এসেছিল তাঁর হুতোম প্যাঁচার নকশা লেখার অনুপ্রেরণা

রমেশচন্দ্র মজুমদার পৃথিবীর প্রথম আলো দেখেন ১৮৮৮ সালের ৪ ডিসেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার খন্দরপাড়ায়। পিতৃদেব হলধর মজুমদার, মাতা বিধুমুখী।ছোট থেকেই ছিলেন অসম্ভব মেধাবী৷যদিও প্রকৃতির আচরনে নিজের পড়াশোনার ক্ষেত্রে প্রতিকূলতার মুখে পড়েছেন ছোট বয়সে৷মজার সেই স্মৃতিচারণায় তিনি বলেছেন, মাঠ-ঘাট তলিয়ে যেত অল্প বৃষ্টিতেই। যাতায়াতের জন্য তখন ভরসা কলাগাছ বা তালগাছের ভেলা৷সেই ব্যবস্থা না হলে সাঁতার হত শেষ বিকল্প৷তবে সেসবের কিছুই শিশু রমেশচন্দ্র মজুমদারের মেধা বিকাশে অন্তরায় হতে পারেনি৷উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে উচ্চ মেধার স্বাক্ষর রাখলেন৷প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক হওয়ার পরে সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর ৷ইতিহাসের দিকপাল হয়ে উঠবেন এমনটা হয়ত বাস্তবে ঘটত না ! ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরির জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন কিন্তু স্ত্রীর অসুস্থতায় তিনি পরীক্ষা দিতে পারেননি৷ জীবনের মোড় ঘুরে গেল,ভারতবর্ষ পেল একজন গবেষক,অধ্যাপক, নিরপেক্ষ সাহসী ঐতিহাসিককে৷১৯১৩ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে কর্মজীবন শুরু রমেশচন্দ্র মজুমদারের৷ ১৯১৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন৷ ১৯২১ সালে তিনি নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তিনি রচনা করলেন, ‘Early History of Bengal’৷স্বনামধন্য অথচ ঠোঁটকাটা লেখক হিসেবে পাঠক মহলে সুপরিচিত নীরদ সি চৌধুরীর মত মানুষ রমেশচন্দ্র মজুমদারের প্রংশসা করেছেন মুক্তকণ্ঠে৷’The Autobiography of an Unknown Indian’ বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘His [R C Majumdar] lectures gave me the sense of watching the process of the writing of ancient Indian history, and not merely the experience of reading it.’
নীরদ সি চৌধুরী ছাত্র ছিলেন অধ্যাপক মজুমদারের৷ রমেশচন্দ্র মজুমদারের জীবনে বরাবর তাঁর গবেষক সত্তা স্থান পেয়েছে৷ এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে তাঁর প্রথম গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ হয়েছিল ১৯১৪ সালে। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে তিনি সোসাইটির কাউন্সিলের সভ্য হয়েছিলেন এবং তিনি ছিলেন বয়সে অন্যদের তুলনায় নবীন৷ রমেশচন্দ্র মজুমদারের ‘Corporate Life in Ancient India’ শীর্ষক পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়৷তিন খন্ডে বাংলার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার পরিকল্পনা করেছিলেন অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদার, প্রাচীনকালের বিষয় লেখা প্রথম খন্ড তিনি নিজে সম্পাদনা করেছিলেন,তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় খন্ড সম্পাদনার দায়িত্ব অর্পিত হয় স্যার যদুনাথ সরকারের ওপর। ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম খন্ডটি প্রকাশ করে। গোটা বিশ্বের বিদগ্ধ মহল সেই লেখার উচ্চ প্রশংসা করে৷ রমেশচন্দ্র মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৩৬-১৯৪২ সাল পর্যন্ত | ঢাকার কর্মজীবনে বহু স্বনামধন্য মানুষ তাঁর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাদের মধ্যে একজন৷দেশভাগের পরে ভারতে তিনি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন,সারা জীবনের কর্মসাধনার জন্য তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নানা সম্মানে ভূষিত হয়েছেন৷ইতিহাসের সত্যকে নিজের মনের রং মিশিয়ে বুঝতে চাইলে কোনওদিন বোধহয় আসল সত্য আবিষ্কার হয় না ! সত্যের থেকেও বেশি হয়ে ওঠে বিশ্বাস ও তার নির্মাণ৷ আমাদের দেশে ঐতিহাসিক সত্যকে যথার্থ ভাবে সংরক্ষন করার তুলনার থেকে কল্পনার রঙে রাঙিয়ে নেওয়ার ধারা বহু দিনের৷আর সেখানেই ঘটে অথবা ঘটছে নানা বিপত্তি ! আর হয়ত সেই কারনেই বড্ড অনুভূত হয় সাহসী,নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের অভাব৷কিন্তু তিনি যে আকাশের তারা হয়ে অজানা দেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছেন বেশ অনেককাল আগে,দিনটি ছিল, ১৯৮০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি।

আরো পড়ুন:  বাঙালিকে তিনি চিনিয়েছিলেন বাংলা ও বাঙালির প্রকৃত ইতিহাস,বাঙালি মনে রাখেনি দীনেশচন্দ্র সেনকে

-অরুনাভ সেন
তথ্যসুত্র- বাংলাপিডিয়া,আনন্দবাজার

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।