অরবিন্দ ঘোষের নেতৃত্বে আলিপুর বোমা মামলার ঘটনায় বোমার ফর্মুলা,মালমশলা সরবরাহ করতেন রাজশেখর বসু

অরবিন্দ ঘোষের নেতৃত্বে আলিপুর বোমা মামলার ঘটনায় বোমার ফর্মুলা,মালমশলা সরবরাহ করতেন রাজশেখর বসু
সাল 1922। জলধর সেনের ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হল একটি গল্প। নামটা ভারী অদ্ভুত – ‘শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড’। এক গল্পেই বাজিমাত। রসসাহিত্য এমনও হয়? কৌতুক আছে, ব্যঙ্গ আছে, কিন্তু ভাঁড়ামি নেই একফোঁটাও। লেখক কে? তার নামটাও তো ভারী অদ্ভুত। ‘পরশুরাম’। এটা আসল নাম না কি ছদ্মনাম? কিছুদিন পরেই জানা গেল লেখকের প্রকৃত নাম। তিনি পেশায় রসায়নবিদ্। বেঙ্গল কেমিক্যালের তৎকালীন সর্বময় কর্তা। নাম? রাজশেখর বসু। বাংলা রসসাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। আবার, তাঁর জন্মশতবর্ষে প্রকাশিত হল এমন এক কাণ্ডের ইতিবৃত্ত, যা এত কাল কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাননি। অরবিন্দ ঘোষ, বারীন ঘোষের নেতৃত্বে মানিকতলা বোমা মামলার ঘটনায় বোমার ফর্মুলা এবং যাবতীয় মালমশলা সরবরাহ করতেন রাজশেখর! ধরা পড়লে সোজা সেলুলার জেল, তবু নির্ভয় কাজ করে গিয়েছেন। এবং নীরবে। এমনই স্থিতপ্রজ্ঞ তিনি।
বড়ো ছেলের নাম শশীশেখর। এবার দ্বিতীয় ছেলেও কি আরেক ‘শেখর’ হবে, নাকি অন্য কিছু? মহারাজ লক্ষ্মীশ্বর সিংহের এই প্রশ্নের জবাবে চন্দ্রশেখর বসু রাজার সামনেই, তাঁরই আশীর্বাদে ছোট ছেলে ফটিকের নাম রাখলেন ‘রাজশেখর’। 1880 সালের 16ই মার্চ জন্ম বর্ধমানের আদিনিবাসী চন্দ্রশেখরের ছোট ছেলের। যদিও কর্মসূত্রে চন্দ্রশেখর থাকতেন মুঙ্গেরে। 1888 সালে মুঙ্গের থেকে চন্দ্রশেখর সপরিবারে চলে এলেন দ্বারভাঙ্গায়। ফটিক ভর্তি হল দ্বারভাঙার রাজ স্কুলে। বাড়ির ছোট ছেলে। সকলের আদরের। কিন্তু স্বভাবটি বড় দস্যি! যে কোনও খেলনা— টিনের ইঞ্জিন, রবারের বাঁশি, স্প্রিংয়ের লাট্টু— হাতে দিলেই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ভেঙে ফেলতেন। প্রশ্ন— কেন বাজে? কেন ঘোরে? পরবর্তীকালে এই ছেলেই যে বিজ্ঞানকে পাথেয় করবে, তাতে আর আশ্চর্য কোথায়! 1895-এ এন্ট্রান্স পাশ করলেন দ্বারভাঙা রাজ স্কুল থেকে। সেই স্কুলে তখন তিনিই একমাত্র বাঙালি ছাত্র। 1897 তে পাটনা কলেজ থেকে পাশ করলেন ফার্স্ট আর্টস। এ বার বাঙালি সহপাঠীর সংখ্যা জনাদশেক। লেখাপড়ার সঙ্গে কিছু সাহিত্য-আলোচনারও সূত্রপাত ঘটল। 1897-তে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় স্নাতক হন। তারপর রসায়ন নিয়ে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় একেবারে প্রথম হন। এরপরই আইন পড়ার শুরু। কিন্তু তিনদিন আদালতে গিয়েই মোহভঙ্গ ঘটল। বরং জীবনের মোড় ঘুরল 1903-এ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে সাক্ষাতের পর। ব্যাস, জীবনের সঙ্গে জুড়ে গেল বেঙ্গল কেমিক্যাল। প্রথমে রসায়নবিদ হিসেবে যোগ দিয়ে, অল্প কয়েক বছরেই ম্যানেজার হয়ে গেলেন। তাঁর গুণে, ব্যক্তিত্বে সবাই মোহিত; তটস্থও। অবসর নিলেও, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ছিলেন বেঙ্গল কেমিক্যালের টেকনিকাল অ্যাডভাইসার।
তবু, বিজ্ঞানের পাশাপাশি সাহিত্যের আকর্ষণও ছিল প্রবল। 42 বছর বয়সে প্রথম লেখা ছাপছেন, আর তাতেই হইহই ফেলে দিচ্ছেন বাঙালি পাঠকসমাজে। আগে কিছু লিখেছেন? বিজ্ঞাপন আর ক্যাটালগ ছাড়া কিছু নয়, অন্তত ছাপার জন্য নয়। আর ছদ্মনাম? আসলে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার জন্য সম্পাদক জলধর সেন গল্প দিতে বলেছিলেন, স্বনাম ব্যবহারে আপত্তি ছিল রাজশেখরের, তাই এই ব্যবস্থা। সে দিন কোনও কারণে বাড়িতে তারাচাঁদ পরশুরাম স্যাঁকরা এসেছিল। সেই নামটাই লেখায় বসিয়ে দেন। কোন কটাক্ষ বা শ্লেষ নয়, নিতান্ত আকস্মিক প্রয়োগ। সাহিত্যজগতে তাঁর প্রবেশও যে আকস্মিকই।
রাশভারী প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু লেখায় ছিল ভরপুর মজা, ব্যঙ্গ। স্বয়ং প্রফুল্লচন্দ্র বলেছিলেন, “এই বুড়া বয়সে তোমার গল্প পড়িয়া হাসিতে হাসিতে chocked হইয়াছি।” রাজশেখরের লেখার ভক্ত ছিলেন আরও একজন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একবার লেখায় মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি এত রস পাও কোথায়?” রাজশেখরের তৎক্ষণাৎ উত্তর, “আপনি ভুলে যাচ্ছেন, আমি রসায়নের লোক! তবে নিজেকে ‘রসসাহিত্যিক’ বলতে ঘোর আপত্তি ছিল রাজশেখরের। বলতেন, “রসসাহিত্যিক আবার কি; আমি কি হাঁড়িতে রস ফুটিয়ে তৈরী করি?”
তবে শুধু গল্পই নয়। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উৎসাহে ও অনুরোধে ‘চলন্তিকা’ অভিধানের কাজ শুরু করেন। সঙ্গে পান সুরেশচন্দ্র মজুমদার ও শৈলেন্দ্রকৃষ্ণ লাহাকেও। লক্ষ্য ছিল একটাই, বাংলা বানানের একটা আধার তৈরি করা। সেখানে স্থান পায় পরিভাষাও। এই বিশাল কাজে মতামতের জন্য চলে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, প্রমথ চৌধুরী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো মানুষদের কাছে। অবশেষে ২৬০০০ শব্দ নিয়ে প্রকাশিত হয় অভিধান ‘চলন্তিকা’। পরে এই শব্দসংখ্যা বেড়ে হয় ৩০০০০। সেই সঙ্গে ছিল পরিভাষার সমাহারও। এর সঙ্গেই চলেছিল রামায়ণ-মহাভারতের অনুবাদ। নানা জটিলতা পেরিয়ে, সহজ সরল ভাষায় মহাকাব্যকে পরিবেশিত করেছিলেন তিনি। এই কাজটা করতে গিয়ে যাতে আসল আখ্যানটির কোনো ক্ষতি না হয়, সেটাও মাথায় ছিল। সব নিয়েই একটা আকর্ষণীয় জগত তৈরি করেছিলেন রাজশেখর বসু |
এত প্রজ্ঞা, জ্ঞান, তীক্ষ্ণ রসবুদ্ধি নিয়ে যিনি চলতেন, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে বারবার আছড়ে পড়েছে ঝড়। 1934 সালের 17ই এপ্রিল মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে চলে যান তাঁর মেয়ে ও জামাই। ১৯৪২-এ মারা যান স্ত্রী মৃণালিনী দেবীও। অসম্ভব দুঃখ, একাকিত্ব— কিন্তু তার মধ্যেও অসম্ভব একটা জোর। সব ভুলে থাকতে হবে। একটি চিঠিতে রাজশেখর লিখছেন, “মন বলছে, নিদারুণ দুঃখ, চারিদিকে অসংখ্য চিহ্ন ছড়ানো, তার মধ্যে বাস করে স্থির থাকা যায় না। বুদ্ধি বলছে, শুধু কয়েক বছর আগে পিছে।” এই নিয়মেই চলেছেন কঠোর নিয়মনিষ্ঠ মানুষটি। তার মধ্যে থেকেই সামলেছেন কাজ, লেখা, অনুবাদ। রাজশেখর বসু এমনই। গাম্ভীর্য ওপরে; ভেতরে বয়ে যাচ্ছে এক অনন্ত প্রসারিত মন; যে মনের যাতায়াত ছিল বেঙ্গল কেমিক্যাল থেকে ‘ভুশণ্ডির মাঠে’ হয়ে পার্শীবাগানের পৈতৃক ভিটেতে বিভিন্ন কবি-পণ্ডিত-শিল্পরসিকদের নিয়ে তৈরী ‘উৎকেন্দ্র সমিতি’ পর্যন্ত। লিখে গেছেন ‘কজ্জলী’, ‘হনুমানের স্বপ্ন’, ‘লম্বকর্ণ’, ‘গামানুষ জাতির কথা’, ‘ধুস্তরী মায়া’, ‘কৃষ্ণকলি’, ‘নীল তারা’, ‘আনন্দীবাঈ’, ‘চমৎকুমারী’ ইত্যাদি একের পর এক গল্প যেখানে ফুটে উঠেছে সামাজিক মন থেকে ব্যক্তিমন। রসায়নের জ্ঞানপ্রয়োগে তৎসম, তদ্ভব, ইংরেজি ও বাংলা মিশিয়ে জিনিসের নিত্যনতুন নামকরণ করতেন তিনি। ‘কীটনাশক পদার্থ’ হল ‘মারকীট’, ‘সুগন্ধ-সার’ বা ‘এসেন্স’ হল ‘কনসেন্ট’, ‘ডায়াবেটিসের ওষুধ’ হল ‘ডায়াবিনল’, ‘আইওডিন প্রলেপ বা মলম’ হল ‘আইডোলেপ’, ‘বোরিক মলম’ হল ‘বোরোলেপ’। ডেসপ্যাচ স্লিপকে লিখতেন যা.পত্র, ভিজিটিং স্লিপকে দ্র.পত্র। একইসঙ্গে নানারকম কাজ করতে পারতেন পরশুরাম। রান্না থেকে সেলাই থেকে বই বাঁধাই। এমনকি, অ্যাবাকাসের নির্মাণকর্তাও এই বাঙালী। সুরুচি, শৃঙ্খলা আর বুদ্ধির সংমিশ্রণে বাঙালী পরশুরামের জীবনটি ছিল এককথায় বিচিত্রের সমাহার। বিজ্ঞান ছিল প্রথম প্রেম, অথচ বাঙালী তাঁকে মনে রেখেছে রসসাহিত্যিক হিসেবে। নাদু মল্লিক থেকে বিরিঞ্চি বাবা – তাঁর সৃষ্ট অবিস্মরণীয় চরিত্রগুলি কৌতুকের মোড়কে খুলে দিয়েছে সমাজের অসাধুতা, ভণ্ডামির মুখোশ। তাঁর লেখার ধারে আজও মুগ্ধ বাঙালী।
– শ্রেয়সী সেন
তথ্যসূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা ও ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত কিছু তথ্য
আরো পড়ুন:  লোকের বাড়ি পরিচারিকার কাজ করতেন, তিনিই হয়ে উঠলেন খ্যাতনামা লেখিকা
Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।