দীনেশ দাস লিখলেন, “বেয়নেট হোক যত ধারালো / কাস্তেটা ধার দিও বন্ধু………

দীনেশ দাস লিখলেন, “বেয়নেট হোক যত ধারালো / কাস্তেটা ধার দিও বন্ধু………

কবিতার উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষের দুঃখ কষ্টকে তুলে ধরা ,কঠিন বাস্তবের বিরুদ্ধে সাধারণ শ্রমজীবী কৃষিজীবী খেটে খাওয়া মানুষের যে নিরন্তন লড়াই তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া,কবিতার উদ্দেশ্য যদি হয় চিৎকার করে বলা যে আকাশের চাঁদও আমার চাই না – আমার যতটুকু দরকার তা হলো এক মুঠো অন্ন, কবিতার উদ্দেশ্য যদি হয় মাদার টেরেসার কথায় বলতে গেলে “to speak for the hungry one – the naked one- the the homeless one – the sick one – the one in the prison- the lonely one – the unwanted one …” তাহলে আধুনিক কবিদের মধ্যে যার কথা প্রথমেই মনে পড়বে তিনি অবশ্যই মানুষের কবি দীনেশ দাস।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে রবীন্দ্র প্রভাব মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে ,নতুন ঘরানার কবিতা লিখে যারা নজির সৃষ্টি করেছিলেন তাদের মধ্যে দীনেশ দাস অন্যতম।যিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে, যোগ দিয়েছিলেন বিপ্লবী গুপ্ত সমিতিতে, প্রত্যক্ষ করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি, দেখেছিলেন মন্বন্তর | পরবর্তীতে লিখেছিলেন “মানুষ এবং কুত্তাতে/ আজ সকালে অন্ন চাটি একসাথে /আজকে মহাদুর্দিনে/ আমরা বৃথা খাদ্য খুঁজি ডাস্টবিনে।” তিনি দেখেছিলেন ১৯৪৬ এর হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা এবং বিশ্বাস, ভালোবাসা ,স্নেহ মায়া-মমতা নামক মানবিক গুণাবলীর ভয়ঙ্কর অপমৃত্যু ,প্রত্যক্ষ করেছিলেন স্বাধীনতা পরবর্তী উদ্বাস্তু সমস্যা ও মানুষের অসহায়তা। সভ্যতার এই মহাসংকটে দাঁড়িয়ে তাই মানুষের কবি দীনেশ দাস এর মনের কোনায় পঞ্চমীর একফালি চাঁদ কোনও আবেগঘন রোমান্টিক ধারণার জন্ম দেয় না, তা হয়ে ওঠে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কাছে লড়াইয়ের প্রতীক স্বরুপ এক মোক্ষম অস্ত্র। দীনেশ দাসের অনেক পরে আর এক কালজয়ী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এর কাছেও পূর্ণিমার চাঁদ কোন রোমান্টিক ধারণার বা ভাবনার জন্ম দেয়নি , বরং তা হয়ে উঠেছিল ক্ষুধাতুর মানুষের কাছে যেন এক ফালি ঝলসানো রুটি।

আরো পড়ুন:  পরিবারের তিন ভাই ছিল বিরাট বিপ্লবী,আমরা কি মনে রেখেছি "ঘোষ" পরিবারের অবদান ?

তাই আর এক কবি জ্যোতির্ময় দাশ দীনেশ দাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বলে ওঠেন “প্রকৃতির লাবণ্যময় প্রতিমার প্রিয় আকর্ষণ /সেদিন ব্যর্থ হয়ে যায় তার কাছে/ একটি গোলাপের মোহময় সুগন্ধের থেকে/ ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ির সোঁদা গন্ধ মানুষের কাছে /যখন অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হতে থাকে/ তখন প্রকৃত কবির কাছে পঞ্চমীর বাঁকা চাঁদ/ ধরা দেয় কৃষকের মেহনতি কাস্তে হিসাবে/ সেদিন আর কবিতার উপমান থাকেনা চাঁদ/ হয়ে ওঠে সংগ্রামের অভ্রান্ত হাতিয়ার…”

কাস্তে কবি দীনেশ দাসের জন্ম ১৯১৩ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর আলিপুরের চেতলা অঞ্চলে | সপ্তম শ্রেণীতে পড়াকালীন কবিতা লেখায় তার হাতে খড়ি। নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন মাত্র ১৫ বছর বয়সে পরাধীন দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে যোগদান গুপ্ত বিপ্লবী সমিতিতে। ১৯২৮ সালে মহাত্মা গান্ধীর লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। স্বাভাবিকভাবেই তার প্রথাগত শিক্ষাই ছেদ পড়ে। এরপর ১৯৩০ সালে মেট্রিক এবং ১৯৩৩ সালে আই.এ পরীক্ষায় পাশ করেন সাউথ সাবার্বান কলেজ থেকে বর্তমানে যা আশুতোষ কলেজ নামে পরিচিত। ১৯৩৩ সালে ভর্তি হন স্কটিশ চার্চ কলেজে।১৯৩৪ সালে তার প্রথম কবিতা ‘শ্রাবণে ‘দেশ পত্রিকায় প্রকাশ পায়।১৯৩৫ খয়াবাড়ি চা-বাগানে চাকরিতে যোগ দিয়ে কার্শিয়াং এ চলে যান। এখানে থাকাকালীন গান্ধীবাদী নীতিতে তার মোহমুক্তি ঘটে। বামপন্থী ভাবধারায় বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন। এরপরে লেখেন প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা, মৌমাছি ,নখ, হাই, চায়ের কাপ ইত্যাদি বিখ্যাত কবিতা।

আরো পড়ুন:  কবিগুরুর "মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চার" অনুপ্রেরণাতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন পাঞ্জাবি ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক

তখনও তার কোন কবিতা সংকলন প্রকাশিত না হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলা কাব্য পরিচয়’ সংকলন গ্রন্থে ‘মৌমাছি’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত করেন।দীনেশ দাস মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে পারে শুধুমাত্র শ্রমজীবী ও কৃষিজীবী মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ।এই বিশ্বাসে মাতোয়ারা কবি দীনেশ দাস ১৯৩৭ সালে রচনা করেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘কাস্তে’ নামক কবিতাটি। অত্যন্ত জনপ্রিয় এই কবিতাটি তৎকালীন সময়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরত।

প্রথম দুটি স্তাবক তুলে ধরলাম –
“বেয়নেট হোক যত ধারালো / কাস্তেটা ধার দিও বন্ধু/ শেল আর বোম হোক ভরালো /কাস্তেটা শান দিও বন্ধু
নতুন চাঁদের বাঁকা ফালিটি তুমি বুঝি খুব ভালবাসতে?/ চাঁদের শতক আজ নহে তো/ এ যুগের চাঁদ হলো কাস্তে।”

আরো পড়ুন:  নিজের লেখা বই বিক্রি করে দশ লক্ষ টাকা ত্রাণ তহবিলে দিলেন লেখক অভীক দত্ত

যাইহোক ব্রিটিশ সরকারের ভয়ে প্রথম এক বছর এই কবিতাটি ছাপা হয়নি ।পরে পুলিশ তার বাসস্থান তল্লাশি করে লর্ড সিনহা রোডে তাকে আটকে রাখে।১৯৪৯ সাল থেকে চেতলা বয়েজ স্কুলের বাংলা বিভাগের শিক্ষক রূপে তিনি কাজ শুরু করেন। এরপর ১৯৫৯ সালে দীনেশ দাসের প্রথম কবিতা সংকলন “উল্টোরথ” পুরস্কারে ভূষিত হয়। ১৯৮১ সালে নজরুল একাডেমী তাকে নজরুল পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৮২ সালে দীনেশ দাস তার শেষ কাব্যগ্রন্থ “রাম গেছে বনবাসে” এর জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার এ ভূষিত হন।কার কাব্যগ্রন্থ গুলির মধ্যে অন্যতম কবিতা, কাস্তে, ভুখ মিছিল, অহল্যা, অসঙ্গতি, রাম গেছে বনবাসে ইত্যাদি। গান্ধীজীর মৃত্যুর পর লেখেন “পেলাম তোমার দেখা কোটি কোটি লাঙ্গলের ভার নিয়ে /হাটো একা একা / তুমি বলেছিলে খালি/ দিল্লি নয়, চলো নোয়াখালী।”

১৯৮৫ সালের ১৩ই মার্চ বনগাঁ গোপালনগরে মানুষের কবি দীনেশ দাস ধরাধাম ছেড়ে অমৃতলোকে গমন করেন। তিনি নেই কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর সৃষ্টি……

-জয়ন্ত বিশ্বাস

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।