ভারতের ভৌত রসায়ন বিজ্ঞানের পথিকৃত ছিলেন তিনি,বাঙালি মনে রাখেনি নীলরতন ধর-কে

ভারতের ভৌত রসায়ন বিজ্ঞানের পথিকৃত ছিলেন তিনি,বাঙালি মনে রাখেনি নীলরতন ধর-কে

সময়টা ১৯১০-১১ | কলেজ স্ট্রিটের ১১০ নম্বর বাড়ির সামনে প্রায়ই থেমে যেত ঘোড়ায় টানা ‘ভিক্টোরিয়া’ গাড়ি | গাড়ি থেকে যিনি নেমে আসতেন তাঁর নাম আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় | কিন্তু আচার্য রোজ এই মেসবাড়িতে আসেন কেন ? তিনি আসেন প্রিয় ছাত্রদের সঙ্গে আড্ডা দিতে | ওই মেসেই থাকতেন মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখার্জি, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ ,ভুপেন্দ্রনাথ ঘোষ,নীলরতন ধর,জীবনরতন ধর,সতীশচন্দ্র সেন,ক্ষিতীশচন্দ্র সেন প্রমুখ ছাত্ররা | সকলেই ছিলেন আচার্যের কৃতী ছাত্র | মেসে বসেই আড্ডা দেওয়া নয়, প্রায়ই অধ্যক্ষ গিরিশচন্দ্র বসু বা কবিরাজ উপেন্দ্রনাথ সেন মহাশয়ের গাড়ি করে আচার্য তাঁর সকল ছাত্রদের নিয়ে যেতেন গড়ের মাঠ | সেখানেই বসত আড্ডার আসর | আলোচনা হত দেশ,সমাজ,ইতিহাস,রাজনীতি নিয়ে | আচার্য তাঁর ছাত্রদের পাঠ্য বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চাননি | চেয়েছিলেন তাঁর ছাত্র যেন আদর্শ মানুষ হয় |

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র ছিলেন নীলরতন ধর | পরবর্তীতে ভারতের ভৌত রসায়ন বিজ্ঞানের পথিকৃত হয়ে ওঠেন তিনি | কিন্তু আমরা মনে রাখিনি নীলরতন ধর-কে |

আরো পড়ুন:  ৮০ বছর পেরিয়েও শীত,গ্রীষ্ম,বর্ষায় কে সি পালের ছাতা আজও বাঙালির ভরসা

নীলরতন ধরের জন্ম ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দের ২রা জানুয়ারি অধুনা বাংলাদেশের যশোরে । পিতা আইনজীবী প্রসন্নকুমার ধর। পিতামহ প্রেমচাঁদ ধর। মাতা ছিলেন যশোরের ফতেপুর জমিদার কুঞ্জবিহারী ঘোষের কন্যা নিরোদমোহিনী দেবী। প্রসন্নকুমার ধর ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী । প্রসন্নকুমারের ছয় পুত্র ও তিন কন্যার মধ্যে নীলরতন ছিলেন তৃতীয়। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে পাঁচ বৎসর বয়সে স্থানীয় সরকারি জেলা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু হয় নীলরতনের । ছোট থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি | শিক্ষা জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সর্বস্তরেই প্রথম। এম.এস.সি. তে কলা ও বিজ্ঞান বিভাগ মিলিয়ে সর্বোচ্চ রেকর্ড নম্বর পেয়ে কুড়িটি স্বর্ণ পদক, গ্রিফিথ পুরস্কার ও এশিয়াটিক সোসাইটি প্রদত্ত পুরস্কার লাভ করেন | এম.এস.সি.পড়ার সময়েই তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের নজরে পড়েন | নীলরতন ধর তখন প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও জগদীশচন্দ্র বসুর অধীনে গবেষণা করতেন | ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে স্টেট স্কলারশিপ পেয়ে বিলেত যান | সেখানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে এবং প্যারিসের সরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ডি.এসসি উপাধি লাভ করেন |

আরো পড়ুন:  দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি,রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পাচ্ছেন নদীয়ার তাঁতশিল্পী সরস্বতী সরকার

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আই.ই.এস নির্বাচিত হয়ে এলাহাবাদ ম্যুর সেন্ট্রাল কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রধান হিসাবে যোগ দেন নীলরতন ধর | আজীবন গবেষণার কাজে লিপ্ত থেকেছেন তিনি । ৯৪ বৎসর বয়সেও তাঁর প্রিয় বিষয় Nitrogen Fixation নিয়ে গবেষণায় রত ছিলেন। তাঁর মৌলিক গবেষণা পত্রের সংখ্যা ছয়শোরও বেশি। পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি ডক্টরেট এবং এস.এ. হিল ও জি. হিল স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন। নোবেল পুরস্কার কমিটিতে ১৯৩৮, ১৯৪৭ ও ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে রসায়ন বিভাগে বিচারক ছিলেন নীলরতন ধর । ভারতীয় বিজ্ঞান একাডেমীর তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা |

নীলরতন ধরে জীবনের বিখ্যাত কাজ Induced and photochemical reaction আবিষ্কার | এছাড়াও ” thermal and photo-chemical fixation of atmospheric nitrogen in the soil ” আবিষ্কার করেন তিনি | দেশের প্রতি গভীর ভালবাসা ছিল তাঁর | এলাহাবাদে ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্স এর মূল ভবনটির জন্য ২০ লক্ষ টাকা দান করেন তিনি | সাধারণ জীবনযাপন করতেন নীলরতন ধর | বিজ্ঞান গবেষণার জন্য বহু অর্থ দান করেছেন | চিত্তরঞ্জন সেবাসদনকে ১ লক্ষ টাকা দেন | নীলরতন ধর ৭ বছরের সম্পূর্ণ বেতন এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেছেন | ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ খেতাব দিতে চাইলে তিনি তা বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখান করেন।

আরো পড়ুন:  এভারেস্টের নতুন উচ্চতার ঘোষণা আজ,নেপথ্যে বাঙালি ভূ-বিজ্ঞানী পরমেশ গঙ্গোপাধ্যায়

আমাদের খাদ্য,জমির উর্বরতা বৃদ্ধির উপায়,নিউ কনসেপশন ইন বায়ো-কেমিস্ট্রি,ইনফ্লুয়েন্স অফ লাইট ইন সাম বায়ো-কেমিক্যাল প্রসেসেস প্রভৃতি বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ লিখেছেন নীলরতন ধর | ভারতের ভৌত রসায়ন বিজ্ঞানের পথিকৃত হয়ে ওঠেন তিনি | নীলরতন ধর ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ই ডিসেম্বর ৯৪ বৎসর বয়সে প্রয়াত হন |

তথ্য : উইকিপিডিয়া

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।