নিজস্ব ডিজাইনে জলদা তিস্তা জলঢাকা নদীর ওপর স্ক্রু পাইলিং করে ব্রিজ নির্মাণ করেছিলেন গগনচন্দ্র বিশ্বাস

নিজস্ব ডিজাইনে জলদা তিস্তা জলঢাকা নদীর ওপর স্ক্রু পাইলিং করে ব্রিজ নির্মাণ করেছিলেন গগনচন্দ্র বিশ্বাস

আজ ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০। আজকের দিনটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।আজকের দিনটিতে সেই সমস্ত মানুষদের সম্মান জানানোর দিন যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে আসছেন, গবেষণা করে আসছেন কিভাবে এই পৃথিবীকে আরও ভালোভাবে বসবাসের উপযোগী করা যায়। অজানা মহাকাশ থেকে শুরু করে তিমিরাচ্ছন্ন মহাসমুদ্রের তলা পর্যন্ত যাদের অবাধ চলাচল। যাদের ন্যূনতম জ্ঞান ছাড়া আজকে আমাদের এই পৃথিবীতে টিকে থাকাই হয়তো দুর্বিষহ। আজ সেই সমস্ত মানুষদের সম্মান জানানোর দিন, আজ ‘ইঞ্জিনিয়ার্স দিবস’। কিন্তু আজকে আমি এমন একজনের কথা আলোচনা করব যার নাম অনেকে হয়তো শোনেননি বা তাকে চেনেন না, জানেন না। তিনি হলেন নদীয়ার এক কৃতিসন্তান গগনচন্দ্র বিশ্বাস ।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক অতি বর্ণময় চরিত্র কর্মবীর গগনচন্দ্র বিশ্বাস। নদিয়াবাসী তথা আপামর বাঙালির কাছে তিনি অবশ্যই এক গর্বের বিষয়।বর্তমানে চাপড়া থানার অধীন কলিঙ্গ পঞ্চায়েতের অন্তর্গত মাধবপুর গ্রামস্থ এক ধনাঢ্য জমিদার বংশে ১৮৪৯ সালে তার জন্ম। পিতা শ্রীমন্ত বিশ্বাস এবং মাতা ননীবালা দেবী।তিনি একাধারে ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী, সমাজ সেবক, শিক্ষাবিদ, এবং অন্যদিকে ছিলেন একজন প্রকৃত দেশমাতৃকার, স্বদেশপ্রেমের এক জ্বলন্ত নিশান।

শৈশবে গগন চন্দ্র বিশ্বাস ছিলেন এক মেধাবী ছাত্র।তিনি কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে বৃত্তিসহ উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে প্রথম বিভাগে এফ এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।সেখান থেকেই তিনি ব্যাচেলর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ (বি.সি.ই) বাংলার সর্বপ্রথম ব্যাচে প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে সসম্মানে উত্তীর্ণ হন। এখানেই তিনি বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন প্রখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার ও শিল্পপতি রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় কে।শ্রীযুক্ত তরুণ বিশ্বাস(গগন চন্দ্র বিশ্বাস এর বংশধর) মহাশয় এর লেখা “একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ও নদীয়ার কৃতিসন্তান গগনচন্দ্র বিশ্বাস” নামক শীর্ষক প্রবন্ধ , যা প্রকাশিত হয়েছিল ভারত সভা বার্তা পত্রিকায় (জুন ২০১৯) থেকে জানতে পেরেছি তিনি বন্ধু রাজেন্দ্রনাথ এর সাথে কলকাতায় অক্রুর দত্ত লেনে একই মেসে থাকতেন।উক্ত প্রবন্ধে তরুণ বিশ্বাস মহাশয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করেছেন। রাজেনবাবু তখন মার্টিন কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ কর্মী।তার উপর দায়িত্ব পড়ে দার্জিলিঙে রেল লাইন দিয়ে ট্রয় ট্রেন কে সর্বোচ্চ স্টেশন ঘুমে নিয়ে যেতে হবে। রাজেনবাবু এই সময়ে সমস্যায় পড়ে যান। শরণাপন্ন হন বন্ধু গগন চন্দ্র বিশ্বাসের। গগনবাবু তার বন্ধুকে নিরাশ করেননি।তিনি বিস্তারিত একটি নকশা তৈরি করে দেন। সেই নকশা অনুযায়ী রাজেনবাবু লাইন প্রতিস্থাপন করে সফলতা লাভ করেন।

আরো পড়ুন:  অনুপ্রেরণা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি,ক্যানসারের ঝুঁকি এড়াতে স্তন বাদ দিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের মৌসুমী রায়

জলপাইগুড়ির ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার থাকাকালীন সর্বপ্রথম গগন চন্দ্র বিশ্বাস নিজস্ব ডিজাইনে জলদা তিস্তা জলঢাকা নদীর ওপর স্ক্রু পাইলিং করে ব্রিজ নির্মাণ করান , যা আজও টিকে আছে।তিনিই পাউনিয়া থেকে রংপুর পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন করেছিলেন।এছাড়া তার অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল ওল্ড জলপাইগুড়ি রেল স্টেশন এর নকশা নির্মাণ |কলকাতা রিপন কলেজ বর্তমানে যা সুরেন্দ্রনাথ কলেজ নামে পরিচিত এই কলেজের বিল্ডিং নির্মাণের তত্ত্বাবধানেও তিনি ছিলেন।এক সময়ে তিনি ব্রিটিশ সরকারের আদেশে ব্রিটিশের তিব্বত অভিযানের জন্য কি টিহরির পথ নির্মাণের কাজেও নিযুক্ত ছিলেন গগন চন্দ্র বিশ্বাস।

স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ গগন চন্দ্র বিশ্বাস কোনদিনই ব্রিটিশের আজ্ঞাবহ দাস হয়ে থাকতে চান নি।তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর উডরফ সাহেবের সাথে একটি রাস্তা নির্মাণ নিয়ে তার মত বিরোধ চরমে ওঠে।জলপাইগুড়ি ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার থাকাকালীন সরকারী অনুমোদনে নিজস্ব ডিজাইন ও তত্ত্বাবধানে শিলিগুড়ি থেকে ভুটান পর্যন্ত গড়ায় অঞ্চলীয় সড়ক নির্মাণ করেন তিনি।ব্রিটিশ সরকার তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করলে তিনি দৃঢ়তার সাথে সেই মামলা লড়েন এবং জয় লাভ করেন। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা ,তেজস্বী মানুষ।এরপর তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন এবং উডরফ সাহেবকে বলে আসেন “I am a sardar of coolies, wherever I shall go with a basket on my head I shall earn my living.” শিশির কুমার ঘোষ তৎকালীন অমৃতবাজার পত্রিকায় গগনচন্দ্র বিশ্বাসের এই দৃঢ়চেতা মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

অত্যন্ত স্বাধীনচেতা এবং দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী গগনচন্দ্র বিশ্বাস মহাশয় ইংরেজের গোলামি করেননি । এরপর প্রায় একক প্রচেষ্টায় গড়ে তোলেন STANDARD ENGINEERING COMPANY। তার এই কোম্পানি ১৯০২ সালে কৃষ্ণনগরে জলঙ্গী নদীর ওপর Railway Bridge তৈরীর জন্য নয় লক্ষ টাকার বরাত পায়।তিনি একদিন নিজের টেবিলে ব্রিজ এর নকশা সংক্রান্ত কাজে নিমগ্ন ছিলেন।Railway Deptt. এর এক উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ অফিসার তার ঘরে প্রবেশ করেন এবং তার টেবিলের উপরে পা তুলে দেন। ক্রুদ্ধ অপমানিত গগনচন্দ্র বিশ্বাস ওই ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ সাহেবকে স্কেল পেটা করেছিলেন। সাহেব ক্ষেপে গিয়ে ব্রিজ তৈরীর সময় প্রতিশোধ নেবার জন্য ব্রিজের ক্ষতি সাধন করে। ফলে ব্রীজে ফাটল দেখা দেয়।এরপর গগনচন্দ্র বিশ্বাস অশেষ ক্ষতি স্বীকার করে নিয়ে নিজের খরচে ওই ব্রিজ পুনরায় নির্মাণ করে দেন।অত্যাচারী ব্রিটিশ তো কবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে কিন্তু গগনচন্দ্র বিশ্বাসের অক্ষয় সৃষ্টি কৃষ্ণনগরে জলঙ্গী নদীর উপরে রেল ব্রিজ আজও সসম্মানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়াও একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার এবং ইঞ্জিনিয়ার ব্যবসায়ী হিসেবে তার বহু কাজের নিদর্শন তিনি রেখে গেছেন।সুবোধ চন্দ্র সেনগুপ্ত সম্পাদিত ‘সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান’ গ্রন্থে গগন চন্দ্র বিশ্বাস সম্পর্কে বলা হয়েছে “তিনিই বাংলায় ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের পথিকৃৎ ” | রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী গগনচন্দ্র বিশ্বাসকে দিয়ে ১৯১৬ সালে ৬২ নম্বর বউবাজার স্ট্রিটে “ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ভবন”টি তৈরি করান এবং ওই ভবনের তৃতীয় তলা কি স্ট্যান্ডার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির নামে গগন চন্দ্র বিশ্বাস কে ভাড়া দেন।

আরো পড়ুন:  স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়ে জীবনের তেইশ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন এই বঙ্গসন্তান

গগন চন্দ্র বিশ্বাস জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়) এর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রথম বাঙালি পরীক্ষক নিযুক্ত হন। কৃষির উন্নতিকল্পে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহারে তিনি অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। এছাড়াও চা শিল্পে তার ভূমিকা প্রশংসার যোগ্য। বাঙালি হিসেবে তিনিই সর্বপ্রথম ব্যবসায়িক ভিত্তিতে চা বাগান শুরু করেন।তিনি বন্ধু রাজেন্দ্রনাথ কেও চা শিল্পে অর্থলগ্নি করতে উৎসাহিত করেন।

সামাজিক ও শিক্ষা মূলক কাজে গগনচন্দ্র বিশ্বাস এর অবদান অনবদ্য।গগন চন্দ্র বিশ্বাস মহাশয় কে নদীয়া জেলার তাহেরপুর থানার অন্তর্গত বাদকুল্লা শহরের জনক নামে অভিহিত করলে অত্যুক্তি হবে না। তিনি এই সময় বাদকুল্লার জমিদারি ক্রয় করেন।বাদকুল্লা তে Railway Station তৈরীর জন্য তিনি ৫০০ বিঘা জমি ও অর্থ দান করেন। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্যএবং তৎকালীন সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য তিনি বাদকুল্লা তে অঞ্জনা নদীর ওপর নিজের খরচে তিনটি ব্রিজ নির্মাণ করে দেন যথা গাংনী ব্রিজ, আড়বান্দী ব্রিজ এবং হেমায়েতপুর ব্রিজ। এছাড়া বাদকুল্লা তে স্কুল ,হসপিটাল ,লাইব্রেরী, ক্লাব ,ডাকঘর ইত্যাদি তিনি নির্মাণ করেন।ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে এবং বাদকুল্লার অর্থনৈতিক উন্নতিতে তিনি হাট প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমানে যা ‘গগনবাবুর বাজার’ নামে পরিচিত।নিজে জন্মস্থান মাধবপুর গ্রামে গ্রামবাসীদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে তিনি ‘শ্রীমন্ত মিডল স্কুল’ এবং ছাত্রাবাস স্থাপন করেন।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই স্কুলেই পড়তে আসতেন দুই বিপ্লবী ভ্রাতা পোড়াগাছার শহীদ বসন্ত কুমার বিশ্বাস এবং বিপ্লবী মন্মথ নাথ বিশ্বাস।

আরো পড়ুন:  বিশ্বে প্রথম প্রতিস্থাপনযোগ্য কৃত্রিম কিডনি আবিষ্কার করেছেন গবেষক শুভ রায়

তার সমাজ ভাবনা এবং শিক্ষা ভাবনা ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। স্বয়ং ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় গগনচন্দ্র বিশ্বাসের কাজের প্রশংসা করেছেন।

গগন চন্দ্র বিশ্বাস এর রাজনৈতিক জীবন এবং কর্মকাণ্ড ছিল বর্ণময়।রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনিষ্ঠ সহকর্মী গগনচন্দ্র বিশ্বাস আজীবন জাতীয় কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি আর যাদেরকে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন তাদের মধ্যে ভূপেন্দ্রনাথ, অম্বিকাচরণ, যাত্রামোহন এর নাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ।তিনি তিরিশ বছর ভারতীয় রাষ্ট্রীয় সমিতির সদস্য ছিলেন।১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাছাড়া তিনি বহু রাজনৈতিক, ব্রিটিশবিরোধী কাজকর্মে জড়িত ছিলেন।কর্ম পাগল এই মানুষটি ১৯৩৫ সালে তার জ্যেষ্ঠপুত্র ডাক্তার ললিত মোহন বিশ্বাসের ২৬ নম্বর বৈঠকখানা রোডের বাড়িতে পরলোকগমন করেন।অথচ দুঃখের বিষয় তার এই বিরাট কর্মকাণ্ড লোকচক্ষুর অন্তরালেই রয়ে গেছে আজও।

-জয়ন্ত বিশ্বাস

তথ্যসূত্র:
১. “একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ও নদীয়ার এক কৃতী সন্তান গগন চন্দ্র বিশ্বাস”, শ্রী তরুণ বিশ্বাস
২. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, শ্রী সুবোধ চন্দ্র সেনগুপ্ত
৩. বিভিন্ন স্থানীয় সূত্র

Avik mondal

Avik mondal

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।