হাসিনার মুখে মুজিবর হত্যার কাহিনী শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন নীহাররঞ্জন গুপ্ত,বলে উঠলেন “জয় বাংলা”

হাসিনার মুখে মুজিবর হত্যার কাহিনী শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন নীহাররঞ্জন গুপ্ত,বলে উঠলেন “জয় বাংলা”

তাঁর সৃষ্টি কিরীটী রহস্য গোগ্রাসে গিলতে গিলতে অনেকেই কিশোর থেকে বড় হয়ে গিয়েছেন,আবার অনেকেই মধ্য এমন কি জীবন সায়াহ্নে এসেও কাটিয়ে উঠতে পারেননি কিরীটীর রস-রহস্যের আবেশ,এই সব মানুষদের সংখ্যা গুনে বলা অসম্ভব৷মা নিজের মুখে বলেছিলেন ‘‌খোকা, ডাক্তারি পড়তে যাচ্ছিস যা, তবে লেখা ছাড়িস না, লেখার অভ্যাস ছাড়িস না।’‌মহানায়ক উত্তমকুমারের সিনেমার পর্দায় কিরীটী হয়ে ওঠা হয়নি,কারণ চরিত্রের স্রষ্টার মনে হয়নি চরিত্রের সঙ্গে মহানায়ক কে মানাবে৷

গৌরবর্ণের কিরীটি লম্বা প্রায় সাড়ে ছ’ ফুট ,চোখে পুরু লেন্সের কালো সেলুলয়েডের চশমা। মাথা ভর্তি ব্যাক ব্রাশ করা কোঁকড়ানো চুল, দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো,সপ্রতিভ মুখ। আমুদে, সদানন্দ, এবং প্রখর রসবোধ। অসাধারণ বাকচাতুর্য কিন্তু কথা কম বলেন। মহানায়ক উত্তমকুমার কে তাঁর কিরীটি মনে হয়নি৷ বইয়ের জগতে যাদের একটু বিচরণ আছে এমন মানুষদের কাছে কিরীটী নামের গোয়েন্দা কত জনপ্রিয় সেকথা নতুন করে পাঠকদের বলার প্রয়োজন নেই৷বরং রাখঢাক না করে সোজা কথা সোজা বলা ভালো,গোয়েন্দা গল্প, উপন্যাসের উৎসাহী পাঠক অথচ, কিরীটি রায় না পড়ে বড় হয়েছেন, এমন বাঙালি সত্যি খুঁজে পাওয়া কঠিন।ছোটদের ‘‌শিশুসাথী’‌ পত্রিকায় একটা গল্প পাঠিয়েছিলেন বেশ দুরুদুরু বুকে, তখন সবে মাত্র আইএসসি পড়েন।পাক্কা জহুরীর চোখ,হিরে চিনতে ভুল হয়নি পত্রিকার সম্পাদকের৷তরুণ লেখকের গল্পটি মনোনীত ও ছাপাও হল, আরও লেখা চাইলেন পত্রিকার সম্পাদক মহাশয়৷কিছুদিন পরে “শিশুসাথী’‌ পত্রিকার দপ্তরে সম্পাদকের সঙ্গে দেখা৷তাকে দেখে হতবাক সম্পাদক বললেন তুমি তো নিতান্তই ছেলেমানুষ!‌ ক্যাশিয়ারকে বলে দিলেন ছেলেটির লেখা বেরিয়েছে এই সংখ্যায়, এঁকে লেখাটির সম্মান দক্ষিণা দিয়ে দাও।আবার সম্পাদক মহাশয় তরুন লেখককে বললেন সে কি আর কিছু সঙ্গে এনেছ ?‌ তরুণ লেখকের উত্তরে আরও একবার অবাক হওয়ার পালা পত্রিকা সম্পাদকের,লেখক বললেন তাঁর কাছে একটা উপন্যাস আছে, যদি তিনি ধারাবাহিক বার করেন। একেবারে উপন্যাস!‌ আচ্ছা রেখে যাও, পড়ে দেখি | তিনি নীহাররঞ্জন গুপ্ত | তারপর সেই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হওয়া শুরু হল ওই ‘শিশুসাথী’ পত্রিকায়৷প্রথম উপন্যাস লিখেছেন যখন তাঁর বয়স মাত্র আঠারো৷

আরো পড়ুন:  রোদ্দুরে ঘরটা আগুনের মতো গরম,একমনে ঘন্টার পর ঘন্টা লিখেই চলেছেন বিনয় ঘোষ

ওপার বাংলার নড়াইল জেলার ইতিনা এখনকার ইতনা গ্রাম কিরীটী রায়ের স্রষ্টা নীহাররঞ্জন গুপ্তের জন্মভূমি ৷পৃথিবীর প্রথম আলো দেখা ৬ জুন ১৯১১ ৷ মধুমতী নদীর ধারে গ্রামের বাড়িতে সবার সাথে বড় হয়ে ওঠা৷ ছোট থেকে বইয়ের প্রতি অমোঘ টান,সঙ্গে বই পড়ায় মা লবঙ্গলতার উৎসাহ৷তবে বাবা সত্যরঞ্জন গুপ্ত চাইতেন ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হোক৷

ম্যাট্রিকের পরে পাশ করে নীহাররঞ্জন ভর্তি হলেন কারমাইকেল মেডিক্যাল স্কুলে। তখন স্কুলই ছিল। প্রথমে এখানে আইএসসি পাশ করলে মেডিক্যালে ভর্তি হত। কারমাইকেল স্কুল পরে কারমাইকেল কলেজ হয়। স্বাধীন দেশে নাম পরিবর্তিত হয়, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের মাস্টারমশাই রাধাগোবিন্দ করের নামে, রাধাগোবিন্দ কর কলেজ, সংক্ষেপে আরজিকর কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল।নীহাররঞ্জনের কিরীটী কিন্তু প্রথম থেকেই স্টার। বাঙালি চরিত্র তবে কিরীটী রায়ের সাহেবিয়ানায় খুঁত নেই৷ শার্লক হোমস, হারকিউল প্যয়রোদের মত চরিত্রদের সঙ্গে টক্করে এক ইঞ্চি পিছিয়ে নেই কিরীটী রায়৷ হ্যাট-কোট, স্যুট-বুট, হাভানা চুরুট বা কেতা দুরস্থ ইংরেজি কথার জন্য নয় ! পাঠক,সমালোচকদের মনে হয়েছে কিরীটী রায় চরিত্র জন্ম কেবল লেখকের কলমের জোর নয়,বরং তাঁর প্রতিভা,মুন্সিয়ানার সামগ্রিক যোগফল৷

আরো পড়ুন:  বিশেষ পছন্দের ছিল ইলিশের ঝোল,নারকেল চিংড়ি আর কাবাব-ভোজনরসিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প

তখন দেশ পরাধীন | নীহাররঞ্জন সদ্য বিবাহ করেছেন৷চাকরির জন্য দরখাস্ত করলেন৷ সমর–বিভাগ থেকে চাকরির নিয়োগপত্র এসে পৌঁছোল | দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু হয়ে গেল,রণাঙ্গনে যেতে হল৷নীহাররঞ্জনের প্রথম পোস্টিং কক্সবাজারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে সমর–বিভাগের কাজে ইস্তফা দিয়ে বিলেত গিয়ে আরও কিছু ডিগ্রি নিয়ে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে যোগ দিলেন৷ ‘‌হাসপাতাল’‌ উপন্যাস লিখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হয়েছিলেন,আবার লিখলেন ‘অপারেশন’ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যাবতীয় ক্ষোভকে উপেক্ষা করেই৷সর্বদা শিরদাঁড়া সোজা রেখেছেন,মাথা নোয়াননি,মেডিকেল কলেজের পর নীলরতন সরকার হাসপাতালে যোগ দিলেন৷ লিখলেন ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘‌অস্তি ভাগীরথী তীরে’‌। লিখেছেন একাধিক নাটক৷ উল্কা, মায়ামৃগ, রাত্রিশেষ প্রভৃতি।তার লেখা বই থেকে সিনেমা হওয়া শুরু এইসময়েই৷’উত্তরফাল্গুনী’ আজও সিনেমাপ্রেমী মানুষদের অন্যতম ফেভারিট সিনেমা৷কম কোথায় ‘বাদশা’! কলকাতার বাবু সমাজের পটভূমিতে অনেকগুলি উপন্যাস লিখেছেন কিরীটী রায়ের স্রষ্টা৷একদিকে সাহিত্য,অন্যদিকে ডাক্তারি,দুটো জীবনে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারতেন৷ছিলেন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ |

আরো পড়ুন:  বাঙালি মুসলমান সমাজের প্রথম প্রবাদপ্রতীম ও জনপ্রিয় লেখক ছিলেন মীর মশাররফ হোসেন

ফেলে আসা পৈতৃক ভিটে নিয়ে অসম্ভব টান ছিল নীহাররঞ্জন গুপ্তের । সত্তরের দশক | তখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ শুরু হলে রোজ সাহিত্যিক বন্ধুবান্ধব, সাংবাদিকদের কাছে খবর নিতেন , কত দূর সফল হলেন মুক্তিযোদ্ধারা।তাঁর লেখা ‘লালুভুলু’ উপন্যাসটিকে সম্মান জানাতে ঢাকা থেকে সপরিবার নিমন্ত্রণ আসে নীহাররঞ্জন গুপ্তের কাছে।সপরিবারে বাংলাদেশ গেলেন নীহাররঞ্জন গুপ্ত | কিছু কাল আগে মারা গিয়েছেন মুজিবর।নীহাররঞ্জন গুপ্ত যেখানেই যাচ্ছেন, মুজিবরের স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন | হাসিনার মুখে তাঁর পিতৃহত্যার নৃশংস কাহিনি শুনতে শুনতে নীহাররঞ্জন গুপ্তের দু’চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল | বলে উঠলেন “জয় বাংলা” |

নীহাররঞ্জন গুপ্তের বইয়ের সংখ্যা ২০০’‌র মতো।কিশোর সাহিত্য থেকে গোয়েন্দা কাহিনি,ঐতিহাসিক উপন্যাস,কিংবা সামাজিক উপন্যাস,অথবা নাটক সর্বত্র তিনি ছিলেন সাফল্যের শিখরে৷সমসাময়িক কোনও লেখক বোধহয় এত বাণিজ্যিক সাফল্য পাননি ! সন্তানদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল,ব্যস্ত থাকতেন লেখা আর চেম্বারে৷সকালে বের হয়েছিলেন বেড়াবেন কুকুরদের নিয়ে,বুকে ব্যথা,বাড়ি ফিরে আরো অসুস্থ হলেন৷তারপর দিন দশেকের মধ্যে পাড়ি দিলেন আকাশের তারা হয়ে নাম না জানা দেশের উদ্দেশ্যে৷বাঙালির জীবন থেকে হারিয়ে গেলেন নীহাররঞ্জন গুপ্ত,কিরীটী রায়ের জনক,দিনটি ছিল ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬৷

-অরুনাভ সেন

তথ্যঋণ আজকাল,আনন্দবাজার

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।