পুকুরে তাম্রশাসনের পুরাকীর্তি রয়েছে,সংগ্রহের নেশায় পুকুরের ধারে চারদিন অপেক্ষা করেছিলেন নলিনীকান্ত ভট্টশালী

পুকুরে তাম্রশাসনের পুরাকীর্তি রয়েছে,সংগ্রহের নেশায় পুকুরের ধারে চারদিন অপেক্ষা করেছিলেন নলিনীকান্ত ভট্টশালী

প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহের নেশায় তিনি ঘুরে বেড়াতেন বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে | সেই সময়ে পরিবহন ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না | কাজেই অনেক সময়ই পায়ে হেঁটে তিনি পৌঁছে যেতেন গ্রামে | একবার খবর পেলেন এক পুকুরে পুরোনো তাম্রশাসনের টুকরো পড়ে আছে | খবর পেয়েই হাজির হলেন | চার দিন পুকুরের ধারে বসেছিলেন। কিন্তু জেলেরা জাল ফেলেও সেটিকে উদ্ধার করতে পারেনি | সেইবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলেন তিনি | কিন্তু প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দমে যাননি তিনি | কোথাও কোনও মূর্তি আবিস্কার হয়েছে শুনলে সেটি সংগ্রহ করার জন্য তখনই সেখানে ছুটে যেতেন । প্রত্নবস্তুটি খুব সহজেই যে জাদুঘরে আনতে পারতেন, তা নয় | এর জন্যে নিতেন বিভিন্ন কৌশল | অনেক ক্ষেত্রেই দেখতেন প্রত্নবস্তুটিকে গ্রামবাসীরা সিঁদুর লাগিয়ে পূজা করত | গ্রামবাসীদের তিনি বোঝাতেন “এ মূর্তিটি তোমরা আমাকে দাও। আমি জাদুঘরে নিয়ে পূজা দেব।” অনেকt বোঝানোর পর রাজি হতেন গ্রামবাসীরা | তিনিও মূর্তিটি জাদুঘরে নিয়ে আসতেন |

কে এই প্রত্নতত্ত্ববিদ ?
তিনি নলিনীকান্ত ভট্টশালী | জাদুঘর সমৃদ্ধ করার জন্য তিনি দিনের পর দিন চিঁড়ে, মুড়ি আর আখের গুড় খেয়ে বসে থাকতেন পূর্ববাংলার কোনও নিভৃত গ্রামের পুকুরের পাড়ে | পায়ে হেঁটে ঘুরতেন মাইলের পর মাইল | লোক মারফত খবর পেলে নলিনীকান্ত প্রথমেই জানতে চাইতেন নিদর্শনটি কীভাবে কার কাছে রক্ষিত আছে | যদি সংবাদ পেতেন প্রত্নবস্তুটি কোনো ব্রাহ্মণ পরিবারের তত্ত্বাবধানে রয়েছে, তবে তিনি পাঞ্জাবি, গলায় পুঁতির মালা এবং ধবধবে সাদা ধুতি পরে ব্রাহ্মণ বেশে হাজির হতেন সেখানে । দীর্ঘদেহী গৌরবর্ণ ভট্টশালীকে ব্রাহ্মণের বেশে দেখে ওই পরিবার সন্তুষ্ট হয়েই ভাস্কর্যটি জাদুঘরে দান করতে রাজি হয়ে যেত। আবার যদি সংবাদ পেতেন প্রত্নবস্তুটি কোনো থানার দারোগা অথবা জেলা প্রশাসকের কাছে রয়েছে, তাহলে তিনি যেতেন শার্ট, প্যান্ট পরে | প্রয়োজন হলে নেকটাই ব্যবহার করতে দ্বিধা করতেন না |

আরো পড়ুন:  জীবনযুদ্ধের লড়াই,রানাঘাট থেকে সাইকেল চালিয়ে শহরাঞ্চলে এসে মিষ্টি বিক্রি করছেন যুবক

নলিনীকান্ত ভট্টশালী ১৮৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার নয়ানন্ধ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস একই জেলার পাইকপাড়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম রোহিনীকান্ত ভট্টশালী আর মাতার নাম শরৎকামিনী। বাবা ছিলেন পোস্টমাস্টার। কাকা অক্ষয় চন্দ্রের যত্নে তিনি লালিত-পালিত হয়েছেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পাইকপাড়া পাঠশালায়। এনট্রান্স পাস করেছেন ১৯০৫ সালে সোনারগাঁও হাইস্কুল থেকে। পাঁচ টাকা বৃত্তিসহ রৌপ্য পদকও পেয়েছিলেন নলিনীকান্ত । ঢাকা কলেজ ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। নলিনীকান্ত ভট্টশালী ১৯১২ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন |

আরো পড়ুন:  'ভাষা হোক উন্মুক্ত'-এই আদর্শেই ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে উন্মুক্ত করেছেন মেহেদী হাসান খান

১৯১২ সালের ২৫ জুলাইয়ের সন্ধেবেলা। পুরনো ঢাকার নর্থব্রুক হলে সেদিন নলিনীকান্ত ভট্টশালী দিয়েছিলেন একটি বক্তৃতা | বিষয় “পূর্ববাংলার প্রত্নবস্তু সংরক্ষণের জন্য ঢাকায় একটা জাদুঘর স্থাপন করতে হবে” | সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন ছোট লাট লর্ড কারমাইকেল | তিনি নলিনীকান্ত ভট্টশালীর বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন | লর্ড কারমাইকেল এই তরুণের আবেগে উজ্জ্বীবিত হয়ে নলিনীকে ২০০০ টাকা পুরস্কার দিলেন | নলিনীকান্তের বয়স তখন মাত্র ২৬। ১৯১৩ সালে ঢাকা জাদুঘর স্থাপন করেন লর্ড কারমাইকেল। তাঁর অনুরোধে ১৯১৪ সালে সেখানে নলিনীকান্ত ভট্টশালী কিউরেটর পদের দায়িত্ব নিলেন। ১৯৪৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রয়াত হওয়া পর্যন্ত তিনি ওই পদেই কর্মরত ছিলেন |

নলিনীকান্ত ভট্টশালী ১৯১১ সালে ছাত্রাবস্থায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ভারেল্লা গ্রামে প্রাপ্ত নটরাজ মূর্তির ছাপ বা লেখার পাঠোদ্ধার দিয়ে ইতিহাস গবেষণা ও চর্চা শুরু করেন । দূরদর্শী গবেষক ভট্টশালী জোর দিয়ে বলতেন, বিক্রমপুরের রামপাল অঞ্চলই ছিল বাংলার প্রাচীন রাজধানী | প্রত্নতাত্ত্বিক খনন বিষয়ে নলিনীকান্ত ভট্টশালীর আগ্রহ ছিল অপরিসীম। তাঁর নিজের কথায়, ‘মনে অহরহ ইচ্ছা জাগিতেছে যে, স্বহস্তে কোদাল ধরিয়া সমস্ত উচ্চভূমি খুঁড়িয়া সমান করিয়া দিই।’ নিজের গবেষণালব্ধ তথ্য নিয়ে বেশ কিছু গ্রন্থ লিখেছিলেন নলিনীকান্ত ভট্টশালী | আইকনোগ্রাফি অব বুড্ডিস্ট স্কাল্পচার ইন দ্য ঢাকা মিউজিয়াম (১৯২৯) তাঁর একটি মাইলফলক গ্রন্থ | তাঁর লেখা বইগুলো আজও গবেষকদের কাছে ভীষণভাবে সমাদৃত | ডক্টর নলিনীকান্ত ভট্টশালী ঢাকা জাদুঘরের কিউরেটর থাকা অবস্থায় মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, কোটালীপাড়া, যশোর, কলিকাতা, নরসিংদী, দিনাজপুর, বগুড়া, কুমিল্লা, ভাওয়াল, পরিভ্রমণ করে মূর্তি, তাম্রশাসন, স্বর্ণমুদ্রা, পুঁথি সংগ্রহ করেছেন | তিনি মুদ্রাতত্ত্ব, প্রত্নলিপিবিদ্যা এবং মৌর্য ও গুপ্তবংশের ইতিহাস বিষয়ে গবেষণা করে ১৯৩৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন |

আরো পড়ুন:  সমস্ত মণ্ডপ কনটেনমেন্ট জোন,সমস্ত পুজো প্যান্ডেলে দর্শক প্রবেশ নিষিদ্ধ-রায় কলকাতা হাইকোর্টের

বই ছাড়াও ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নানা বিষয় নিয়ে ভট্টশালী শতাধিক প্রবন্ধ লেখেন । তিনি প্রাচীন হস্তলিপিবিশারদও ছিলেন । কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্য ছিলেন নলিনীকান্ত ভট্টশালী | ভালো সম্পর্ক ছিল ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও কবি জসিম উদ্দিনের সাথেও | ১৯৪৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী ঢাকা জাদুঘরের বাণী কুটিরে মৃত্যুবরণ করেন নলিনীকান্ত ভট্টশালী |

তথ্য : সাহস পোর্টাল (মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী)

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।