‘আমার লেখা গান যেন সুধীন ছাড়া আর কেউ সুর না করে’ বলেছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

‘আমার লেখা গান যেন সুধীন ছাড়া আর কেউ সুর না করে’ বলেছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

তখন কলকাতায় প্রায়ই লোডশেডিং হত | অন্ধকারে ডুবে যেত কলকাতা | আর অন্ধকারে হলেই নিজের গানের ঘর বেরিয়ে এসে একতলার ঘরে গিয়ে পিয়ানো বাজাতেন তিনি | স্যান্ডো গেঞ্জি আর পাজামা পরিহিত মানুষটার পিয়ানোর সম্মোহনী সুর মুগ্ধ করত সকলকে | পড়শিরাও স্তব্ধ হয়ে যেতেন সেই সুর শুনে | কারেন্ট ফিরলে আলো জ্বলে উঠলেই তিনি আবার ফিরে যেতেন নিজের গানের ঘরে | কে সেই মানুষটি ? তিনি সুধীন দাশগুপ্ত ।

সুধীন দাশগুপ্তর জন্ম ১৯২৯ সালের ৯ই অক্টোবর দার্জিলিংয়ে | বেড়ে উঠেছেন সাহেবি পরিবেশে | গানবাজনার প্রতি ভালবাসা ছোট থেকেই | লন্ডনের রয়্যাল স্কুল অব মিউজিক থেকে সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন | এমন কোন বাদ্যযন্ত্র ছিল না যা তিনি বাজাতে পারতেন না | বাঁশি, তবলা, এমনকী হার্পও ছিল সেই তালিকায়। খেলাধুলাতেও ছিলেন ভীষণ দক্ষ | র‍্যাকেট হাতে কোর্টও কাঁপাতেন। তিনবারের রাজ্য ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন ! জলপাইগুড়ির নবাবকন্যা বেগম জব্বার একবার এক সংগীত সন্ধ্যার আয়োজন করেন | তখন তিনি স্কুলে পড়েন | সেই অনুষ্ঠানে সেতার বাজালেন উস্তাদ ওয়ালিউল্লাহ খান সাহেব | অবিকল সেই রাগটি তাকে বাজিয়ে শুনিয়েছিলেন সেই স্কুলছাত্রটি | মুগ্ধ হয়েছিলেন উস্তাদ ওয়ালিউল্লাহ খান সাহেব | অনুষ্ঠানের পর একটি রত্নখচিত সেতার সেই খুদে শিল্পীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন নবাবকন্যা বেগম জব্বার |

ধসের কারণে ছাড়তে হয় দার্জিলিঙের বাড়ি | গোটা পরিবার চলে আসে কলকাতায় | ছোট থেকেই বাংলা ভাল বলতে পারতেন না সুধীন দাশগুপ্ত | পরে শিক্ষক রেখে শিখলেন বাংলা | কলকাতায় এসে তিনি কাজ শুরু করলেন সংগীত পরিচালক কমল দাশগুপ্তের সহকারী হিসেবে | যুক্ত হন ভারতীয় গণনাট্য আন্দোলনের সঙ্গে। ‘ওই উজ্জ্বল দিন ডাকে স্বপ্নরঙিন’, ‘স্বর্ণঝরা সূর্যরঙে’, ‘এই ছায়াঘেরা কালো রাতে’ এইসব গান তৈরী করেছিলেন গণনাট্য সংঘের জন্যই | কিন্তু তিনি খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলেন না | সাময়িক সাফল্য হয়ত আসছিল কিন্তু তা ছিল ক্ষণস্থায়ী | তিনি প্রায়ই কাজের জন্যে যেতেন স্বনামধন্য গীতিকারদের কাছে | কিন্তু তখন সংগীতের দুনিয়ায় তার মত এক নতুন সুরকারকে খুব একটা বেশি পাত্তা দিতেন না গীতিকাররা | গানের প্রসঙ্গ এলে এড়িয়ে যেতেন তারা | জেদ চেপে গিয়েছিল মানুষটার | এই উপেক্ষা বদলে দিয়েছিল তাকে | সেই জেদ থেকেই তৈরী হয়েছিল বাংলার সংগীত দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালককে | সুধীন দাশগুপ্তর হাত ধরেই তৈরী হয়েছিল বহু কালজয়ী গান যার রেশ রয়ে গেছে আজও |

আরো পড়ুন:  ৪৯ টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু,অরিজিৎ ভট্টাচার্যের ভার্চুয়ালইনফোকম আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ ভিডিও গেম কোম্পানি

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুধীন দাশগুপ্তের পরিচয় “ডাক হরকরা” ছবির সূত্রে । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন এই কাহিনী । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ওই সিনেমার জন্যে গানও লিখেছিলেন কয়েকটা । এমনই একটি গান হল ‘ওগো তোমার শেষ বিচারের আশায়।’ লোকসংগীতের ধাঁচে ওই গানটির সুর দিলেন সুধীন দাশগুপ্ত । প্রথমে ঠিক হয়েছিল এই গানটি গাইবেন শান্তিদেব ঘোষ মহাশয় । যিনি নিজে বাউলের অন্যতম সেরা গায়ক এবং বাউলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ওই সিনেমায় । কিন্তু সুধীন দাশগুপ্ত বললেন মান্না দে গাইবে এই গান । শেষমেশ কে গান গাইবে ঠিক করতে মিটিং হল । আলোচনা শেষে শান্তিদেব নিজেই বললেন, ‘না, এটা মান্নাবাবুই গাইবেন, উনি সত্যিই ভাল গাইলেন গানটা।’ গানটি প্রাণ দিয়ে গেয়েছিলেন মান্না দে । রেকর্ডিং হয়েছিল বোম্বেতে । রেকর্ডিং শেষ হওয়ার পর দেখা গেল এক বিরল দৃশ্য । মান্না দে এবং সুধীন দাশগুপ্ত পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন । সুধীন দাশগুপ্তের বয়স তখন মাত্র আঠাশ বছর ।

এই গানের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছিলেন তারাশঙ্করবাবু । দেখা হলেই সুধীন দাশগুপ্তকে বলতেন ওই গানটি শোনাতে । একদিন চৌরুঙ্গী রোডে স্ত্রী মঞ্জুশ্রী দাশগুপ্ত-র সঙ্গে একটা বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে শোকেসে বই দেখছেন সুধীনবাবু । হঠাৎ দেখলেন তারাশঙ্করবাবু ছুটতে ছুটতে আসছেন । সুধীনবাবু যেন কাউকে দেখেন নি, এমন ভাবেই মঞ্জুশ্রীকে বললেন ‘চলো চলো শিগগির পালাই। নইলে এখনই বলবেন গানটা শোনাও।’ এই বলে দোকান থেকে বেরিয়ে যান তিনি । তারাশঙ্করবাবু খুব ভালোবাসতেন সুধীন দাশগুপ্তকে । ‘ওগো তোমার শেষ বিচারের আশায়’ গানটি শুনে কাঁদতেন । বলে গিয়েছিলেন, ‘আমার লেখা গান যেন সুধীন ছাড়া আর কেউ সুর না করে’। পাশ্চাত্য সঙ্গীতে যেমন দক্ষ ছিলেন তেমনি লোকসঙ্গীতেও ছিলেন পারদর্শী । ছোটদের জন্যেও ‘হিংসুটে দৈত্য’ বা ‘ছোটদের রামায়ণ’-এ’ কী অসাধারণ সুর করেছেন সুধীনবাবু ।

আরো পড়ুন:  গান গাওয়ার অপরাধে ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন বাবা,সেই ছেলেই পরবর্তীতে হলেন "শ্যামল মিত্র"

শঙ্খবেলা সিনেমা | গান লিখেছেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় | সুর দেবেন তিনি | কে গাইবেন, ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ আর ‘আমি আগন্তুক, আমি বার্তা দিলাম’ গান দু’টি? শুরু হল মিটিং | তিনি প্রথম গানে চাইলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে এবং দ্বিতীয়টিতে মান্না দে-কে | কিন্তু বাকিরা বললেন একই নায়কের গলায় দুই গানে দুই কণ্ঠ বাংলায় চলবে না। তখন তিনি বললেন তাহলে দু’টি গানই গাইবেন কিশোরকুমার। কিন্তু বাকিরা ঠিক নিশ্চিত হতে পারলেন না | শেষমেশ মান্না দে দুটি গান গাইবেন বলে ঠিক হল | উত্তমকুমার নিজেও প্রথমে মান্না দে-র ক্ষেত্রে যথেষ্ট দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কিন্তু মান্না দের কণ্ঠে সেই গানদুটি তৈরী করেছিল ইতিহাস | মান্না দে কে বাংলা গানে প্রথম বড় সুযোগ দিয়েছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত । সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লিপে মান্না দে-র কণ্ঠে ‘তিন ভুবনের পারে’ ছবির (১৯৬৯) ‘জীবনে কী পাব না’, ‘হয়তো তোমারই জন্য’ বা ‘বসন্ত বিলাপ’-এর (১৯৭৩) ‘লেগেছে লেগেছে আগুন’ তো তাঁরই লেখা এবং সুর করা। এসব গান কি কেউ ভুলতে পারে ?

আরো পড়ুন:  তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত শাস্ত্রের সর্বোচ্চ উপাধি "র‌্যাংলার" সম্মান পেয়েছিলেন

কে গাননি সেকালে সুধীন দাশগুপ্তের সুরে ? হেমন্ত (‘নীল…নীল…সবুজের ছোঁয়া কিনা’), সতীনাথ (‘এলো বরষা যে সহসা’), শ্যামল (‘কী নামে ডেকে’), সন্ধ্যা (‘ও কথা বলবো না’), লতা (‘আজ মন চেয়েছে’), আশা (‘ডেকে ডেকে চলে গেছি’), গীতা (‘একটু চাওয়া একটু পাওয়া’), প্রতিমা (‘একটা গান লিখো আমার জন্য’), সুবীর (‘এতো সুর আর এতো গান’) থেকে কম-প্রতিষ্ঠা পাওয়া শ্যামশ্রী (‘টিয়া টিয়া টিয়া’) .. কে নয়? প্রতিটা গান এক একটা ইতিহাস ।

স্বভাবত অন্তর্মুখী মানুষটি। স্বল্পবাক। আপাদমস্তক ভদ্রলোক । গীতিকারও ছিলেন সুধীনবাবু। তাঁর মত গীতিকার ও সুরকার আজও বিরল । “জীবনে কি পাবো না” বা “হয়তো তোমারই জন্য” বা “এতো সুর আর এতো গান”এর মত গীতমালা আর কোনো সুরকার লিখে যেতে পারেননি। কিন্তু গীতিকার সুধীন চাপা পড়ে গেছে সুরকার সুধীনে।

১৯৮২ সালের ১০ জানুয়ারি | বিকেলে বাণীচক্র থেকে গান শিখিয়ে ফিরলেন | বাথরুমে গেলেন | হার্ট অ্যাটাক হল | মুহূর্তেই সব শেষ | আর উঠতে পারলেন না। দরজা ভেঙে বের করা হয়েছিল মৃতদেহ |

মাত্র ৫২ বছর বেঁচেছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত | প্রায় পঞ্চাশটির কাছাকাছি বাংলা ছবিতে গান লেখা, সুর করেছিলেন | কিন্তু বাঙালি তার মৃত্যুর পর তাকে আর মনে রাখেনি | তীব্র অর্থকষ্টে শিল্পীর অসুস্থ স্ত্রীকে এক সময় দরজায় দরজায় ঘুরে শাড়ি বিক্রি করতে হয়েছিল | ভাবা যায় ! বাংলা গানের স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান স্তম্ভকে ভুলে গিয়েছিল বাঙালি ।

যতদিন বাংলা গান থাকবে সুধীন দাশগুপ্তের সৃষ্টি ততদিন থাকবে | দূরে কোথাও বেজে চলেছে ‘কে প্রথম কাছে এসেছি……..

লেখক – অভীক মণ্ডল
তথ্য – আনন্দবাজার পত্রিকায় পৌলমী দাস চট্টোপাধ্যায় এর লেখা, উইকিপিডিয়া

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।