কোঁচড়ে মাত্র পাঁচ টাকা আর দু’চোখে দুঃস্থ মানুষদের সেবার স্বপ্ন

কোঁচড়ে মাত্র পাঁচ টাকা আর দু’চোখে দুঃস্থ মানুষদের সেবার স্বপ্ন

সেবা আর ভালোবাসো দিয়েই তিনি জিতে নিয়েছেন মানুষের হৃদয় ভরা ভালোবাসা আর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা৷শুধুমাত্র সেবার মানসিকতা আর ভালোবাসার পরশ পাথর দিয়ে মানুষের সব দুঃখ,কষ্ট, যন্ত্রনা দূর করা যায় জীবনে বারে-বারে তিনি প্রমান করে গিয়েছেন৷ভালোবাসা বিলিয়ে তিনি পৃথিবীর মানব জাতির সবার “মা”৷তিনি মাদার টেরিজা৷

পৃথিবীর মানুষের চোখে যারা অনাকাঙ্খিত – যাদের জীবনে নেমে এসেছিল সমাজ,ভাগ্যের অভিশাপ,যারা অনাশ্রিত, অসমর্থ, অসুস্থ, অবহেলিত, স্নেহ মায়া মমতার পরশ কখনও পাননি জীবনে,তাদের কাছে মাদার সহানুভূতি, স্নেহ, ভালোবাসা ও সেবার মূর্ত প্রতীক৷ কুষ্ঠরোগীদের তিনি কেবল আশ্রয় দিতেন না, নিজের হাতে তাদের সেবা করেছেন দিনের পর দিন,বছরের পর বছর৷

২৬ আগস্ট ১৯১০, তিনি পৃথিবীর প্রথম সুর্যের আলো দেখেন ৷ পিতৃদত্ত নাম ছিল অ্যাগনিস | মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারাতে হল৷ অ্যাগনিসের বাবার প্রয়াণের পর মা তাঁকে রোমান ক্যাথলিক আদর্শে বড় করতে লাগলেন৷
অ্যাগনিস ছোটো থেকেই মিশনারিদের জীবন, তাদের কাজকর্মের গল্প শুনতে পছন্দ করতেন৷১২ বছর বয়সেই তিনি সন্ন্যাস জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।১৮ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করে একজন ধর্মপ্রচারক হিসেবে যোগ দিলেন সিস্টার্স অফ লোরেটো সংস্থায়। মা আর দিদিদের সঙ্গে তার আর কোনোদিন দেখা হয়নি।অ্যাগনিসকে যেতে হয়েছিল আয়ারল্যান্ডের রথফার্নহ্যামে লোরেটো অ্যাবেতে ইংরেজি ভাষা শিখতে ৷নিজে ইংরেজি জানতেন না অথচ ভারতে সিস্টার্স অফ লোরেটোর শিক্ষার মাধ্যম ইংরাজি৷১৯২৯ সালে ভারতে পদার্পণ করে দার্জিলিংয়ে নবদীক্ষিত হিসেবে কাজ শুরু করলেন৷ ১৯৩১ সালের ২৪ মে তিনি সন্ন্যাসিনী হিসেবে প্রথম শপথ গ্রহণ করেন। এই সময়ে তিনি ধর্মপ্রচারকদের পৃষ্ঠপোষক সন্ত Thérèse de Lisieux –এর নামানুসারে টেরিজা নাম গ্রহণ করেন।১৯৩৭ সালের ১৪ মে কলকাতায় একটি লোরেটো কনভেন্ট স্কুলে পড়ানোর সময় তিনি চূড়ান্ত শপথ গ্রহণ করেন৷মানুষের জন্য কাজের ইচ্ছা ছিল সেই কিশোরী বয়স থেকেই৷কিন্তু মাদারকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল কুড়ি বছর৷ফাদার ভিদজাক ছিলেন মাদারের অনুপ্রেরণার মানুষ৷তাঁর থেকে পেতেন বাংলা সম্পর্কে তথ্য,মানুষের জন্য কাজ করার উপদেশ৷ভ্যাটিকানের অনুমোদন না পাওয়ায় তাঁকে কাজ শুরু করতে হয়েছিল শিক্ষিকা হিসেবে ৷ ১৯৩১ সালে কলকাতায় ফিরে কাজ চালানোর মতো বাংলা শিখে নিয়েছিলেন মাদার৷সেন্ট মেরিজ কনভেন্টে শিক্ষকতা করতেন৷১৯৩৭সালে স্কুলের প্রিন্সিপালও হয়েছিলেন৷এদিকে শুরু হয়েছে বিয়াল্লিশের মন্বন্তর৷কনভেন্টের ঘরের জানালা দিয়ে শীর্ণ-রুগ্ন মানুষদের গোঙানির আওয়াজ পৌঁছে যেত মাদারের কানে৷তিনি অস্থির হতেন,উদ্বেল হতেন৷সেন্ট লরেন্স স্কুলের ফাদার বুশকে অনেক দিন পরে মাদার বলেছিলেন ঘেরাটোপে তিনি থাকবেন না৷১৯৪৬ সালেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মানুষের মধ্যে মিশে কাজ করবেন৷তবে ক্যাথলিক অনুশাসনে একজন নারীর সেই অধিকার পাওয়া বেশ কঠিন ছিল ! ১৯৪৮-মাদারের আর্জি মেনে নিলো ভ্যাটিকান৷ফাদার ভান এক্সহেম মাদারকে জানালেন তাঁকে শিক্ষিকার ধরা বাধা জীবনে থাকতে হবে না ৷ উল্লসিত মাদার ১৯৪৮-এর ১৮ আগস্ট কুড়ি বছরের আশ্রয়স্থল লোরেটো কনভেন্ট ছেড়ে রাস্তায় নেমে এলেন একটা নীল পাড় সাদা শাড়ি পরে, কোঁচড়ে পুঁজি মাত্র পাঁচটা টাকা।

আরো পড়ুন:  বিনামূল্যে করোনা আক্রান্তদের পরিষেবা দিচ্ছেন শিলিগুড়ির প্রথম মহিলা টোটোচালক মুনমুন সরকার

দু’চোখে স্বপ্ন মিশনারিজ অব চ্যারিটি স্থাপনের।যারা মেতে উঠবেন দুঃস্থ আর্ত অভাগাদের সেবায় ৷ মাদার পাটনা গিয়েছিলেন,নিলেন রোগী সেবার প্রশিক্ষণ৷ কলকাতায় এসে আশ্রয় সিঁড়ির ঘর ৷ তবে কিছুদিন পরেই ঠিকানা ১৪নম্বর ক্রিক লেনের বাড়ি ৷ ১৯৪৮ সাল,মাদার রাস্তায় বের হলেন ট্যাংরার মতিঝিল বস্তিতে যাবেন৷ উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন,কাজ করবেন গরির -দুঃখীদের জন্য৷৷পরনে নীল পাড়ের সাদা রঙের শাড়ি,সস্তা হাওয়াই চটি পায়ে৷বস্তির সবার দশা প্রায় একরকম৷নুন আনতে পাম্তা ফুরিয়ে যায়৷বৃষ্টি হলে নোংরা জলে থই,থই৷অপুষ্টি ব্যাধি যেন বারোমাস লেগেই আছে মানুষগুলোর জীবনে৷ ব্রত করলেন এদের দুঃখ ঘোচাবেন তিনি৷মাদারকে সাহায্য করলেন ফাদার ভান এক্সহেম৷তিনি মাদারের সেবার কাজের খবর পৌঁছে দিলেন ইউরোপে৷ফাদার হেনরি এগিয়ে এলেন৷কলকাতার আর্চ বিশপ পেরিয়ার মাদারকে জোগাড় করে দিলেন এক লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকা৷সেই টাকায় কেনা হয়েছিল ৫৪এ লোয়ার সার্কুলার রোডের দোতলা বাড়ি৷সেই বাড়িই মিশনারিজ অফ চ্যারিটির সদর দফতর বা “মাদার হাউস”৷মতিঝিলে মাদারের কাছে খাবারের সঙ্গে ওষুধের জোগান আসা শুরু হল৷গড়ে উঠল বস্তির ডিসপেনশারি৷শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে তৈরি হল স্কুল৷সত্তরের বেশি বছরে মাদারের একাগ্র মমতা আর ভালোবাসা মতিঝিলের বস্তির মানুষ পেয়েছিলেন সেটি ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছে সারা পৃথিবীর কোটি কোটি দুঃস্থ মানুষের কাছে৷

আরো পড়ুন:  জরুরি অবস্থায় গণতন্ত্রের মৃত্যু হয়েছে বলে মাথা কামিয়ে অশৌচ পালন করলেন তিনি

সামান্য খাবার খেতেন মাদার৷কখনো একটা মাত্র রুটি,পাতলা ডাল আর সবজি ছিল মাদারের আহার।ভালো কিছু খাবারের পরামর্শ হেসে উড়িয়ে দিতেন৷তাঁর খাবারের মেনুতে উদ্বিগ্ন ডাক্তার মাদার ডেঙ্গল একদিন সাহস করে মাদার টেরিজাকে বলেই দিলেন ‘‘এ ভাবে চললে আপনার দরিদ্রসেবার কী হবে?’’শেষপর্যন্ত অবশ্য তিনি ডাক্তারের পরামর্শ উপেক্ষা করেননি৷তবে পরিবর্তিত সেই মেনু না হয় একটু শুনুন৷সকালের খাবারের বলতে মাত্র একটা রুটি,সামান্য সবজি,একটা কলা,আর এক কাপ চা৷ দুপুরে খেতেন জলো তরকারি সহযোগে সামান্য ভাত৷কারন তিনি বিশ্বাস করতেন গরিবদের এর থেকে ভালো খাবার খাওয়ার সাধ্য নেই৷তাঁর রাতের খাবারের মেনু ছিল এক বা দেড় হাতা খিচুড়ি৷

১৯৫০ সালে ৭ অক্টোবর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল “মিশনারিজ অফ চ্যারিটি”র৷পথে নেমে মানুষের সেবা করতে যে বাধা পেতে হয় প্রথম অনুভব করেছিলেন টিটাগড়ে কুষ্ঠরোগীদের ক্লিনিক তৈরির জন্য জমি পেতে৷তবে সব বাধা পেরিয়ে মাদার জমি পেয়েছিলেন৷১৯৬১ সালে “লেপার ক্লিনিকের”ইট পড়েছিল৷দেওয়াল গাঁথা হয়েছিল৷রোগীদের বেড ও বেঞ্চ পাতা হল৷দেড় কাঠা জমির উপর দুটো ঘর তৈরি হয়েছিল৷তিনি সবার মা,শিশুদের মা৷পরিত্যক্ত শিশুদের জন্য তৈরি করেছিলেন “শিশুভবন”৷মুমূর্ষূ মানুষের জন্য কালীঘাটের “নির্মল হৃদয়”৷টিটাগড়,আসানসোল,দিল্লিতে কুষ্ঠরোগীদের আশ্রম৷ভারতের বাইরে অনেক দেশে সেবাকেন্দ্র৷বিদেশের হেভিওয়েট রাজনীতিবিদ থেকে বিখ্যাত খেলোয়াড়,সেলিব্রিটি,এমন কি কলকাতার আকর্ষণে আসা বিদেশি লেখক, কবি,চলচ্চিত্র অভিনেতা-অভিনেত্রী সবাই একবার দেখা করেছেন মাদার টেরেজার সাথে৷সসম্মানে মাদারকে তাদের দেশে নিয়ে গিয়েছেন বিদেশি রাষ্ট্রনায়করা৷তবু মাদার আমাদের,তিনি এই কলকাতার৷ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণের পরে পেয়েছিলেন “পদ্মশ্রী সম্মান”৷৬২ সালেই পেলেন “ম্যাগসাইসাই” পুরস্কার৷কেমব্রিজ এবং অস্কফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়ে সম্মানিত করে৷১৯৮৩ সালে ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সম্মান “অর্ডার অফ মেরিট”-এ ভূষিত হন৷১৭ অক্টোবর ১৯৭৯ তিনি পেয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার৷১৯৮০ সালে মাদারকে ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করা হয়৷মাদার টেরিজার সেবাপরায়ণতা, মানবতার সেবার অনন্য উচ্চতাকে খাটো করার চেষ্টা হয়েছে কুৎসা দিয়ে। তাঁর কাছে আশ্রয় পাওয়া মানুষজনকে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ উঠেছে। তবে সেসব অভিযোগ ধোপে টেকেনি৷মাদার আজ শুধু ‘মা’- নন৷এখন তাঁকে “সন্ত”বলে জানে গোটা বিশ্ব। ভ্যাটিক্যান সিটিতে পোপ ফ্রান্সিস আনুষ্ঠানিকভাবে মাদার টেরিজাকে “সন্ত” উপাধিতে স্বীকৃতি দেন। বিশ্বের মা থেকে “সন্ত”হয়েছেন মাদার টেরিজা৷গোটা বিশ্বের সব সন্তানদের কাঁদিয়ে মাদার টেরিজা পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে প্রয়াত হলেন ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭৷ বিরহের সেই দিন ভুলবে না বিশ্ববাসী৷

আরো পড়ুন:  ইস্টবেঙ্গলকে বাঁচাতে এগিয়ে এলেন বাঙালি শিল্পপতি প্রসূন মুখোপাধ্যায়,কিনবেন ৫০ শতাংশ শেয়ার

-অরুনাভ সেন
তথ্য ঋণ-আনন্দবাজার পত্রিকা

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।