বিজ্ঞানী মণি ভৌমিকের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন মাতঙ্গিনী হাজরা,মাতঙ্গিনী হাজরা হয়ে উঠেছিলেন মণি ভৌমিকের উপদেষ্টা

বিজ্ঞানী মণি ভৌমিকের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন মাতঙ্গিনী হাজরা,মাতঙ্গিনী হাজরা হয়ে উঠেছিলেন মণি ভৌমিকের উপদেষ্টা

১৯৪২-এর ২৯ সেপ্টেম্বর, বেলা তিনটে। পরাধীন ভারতের স্বাধীনতার দাবিতে জনতার মিছিল এগিয়ে চলেছে তমলুক থানা ও আদালতের দিকে। গান্ধীজীর ডাকে দেশজুড়ে চলা এই অহিংস আন্দোলন কে আখ্যা দেয়া হয়েছিল Quit India বা ভারত ছাড়ো আন্দোলন। তমলুক শহরের চারটে প্রধান প্রবেশপথে সেই মিছিল আটকানোর জন্য সেদিন মোতায়েন করা হয়েছিল সশস্ত্র পুলিশ। মিছিলে মানুষের মুখে স্লোগান, ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’, ‘বন্দেমাতরম’, ‘গান্ধীজি কি জয়’।

রূপনারায়ন নদের তীর ধরে আসা নিরস্ত্র মিছিল টি প্রথমে বৃটিশ পুলিশের রাইফেল ও বেয়নেটের মুখোমুখি হলো । মিছিলে সবার আগে রয়েছেন মাতঙ্গিনী হাজরা যাকে সম্মান করে গ্রামের লোকজন বলতো “গান্ধী বুড়ি” । ইংরেজ পুলিশ সুপারের “stop” এবং “go back” ঘোষণা শুনে ইংরাজী না জানা মাতঙ্গিনী হাজরা এটুকু বুঝেছিলেন যে সাহেব তাঁদের পিছিয়ে যেতে বলছে। আদেশ অমান্য করতে চললো গুলি…….প্রথম গুলিটা লাগল বামহাতে, দ্বিতীয় গুলিটা লাগল ডানহাতে । দুহাতে গুলি লাগা অবস্থাতেও তেরঙ্গা ধরে চীৎকার করে বলেছিলেন “বন্দেমাতরম”। আঁকড়ে ধরলেন প্রিয় পতাকা । এই সময়ই পুলিশ অফিসার অনিল ভট্টাচার্য্যের নির্দেশে ৭৩ বছরের বৃদ্ধার কপাল লক্ষ্য করে গুলি করা হল…… শহীদ হলেন মেদিনীপুরের গান্ধী বুড়ি …….

আরো পড়ুন:  ক্ষুদিরাম বসুর আত্মবলিদান দিবস উদযাপন,কিশোর সুভাষের নেতৃত্বে অনশন পালন করা হল স্কুলে

সে দিন মাতঙ্গিনী হাজরা ছাড়াও ব্রিটিশের গুলিতে তমলুকের মাটি লাল হয়েছিল মথুরি গ্রামের লক্ষ্মীনারায়ণ দাস, দ্বারিবেরিয়ার পুরীমাধব প্রামাণিক, মাশুরির জীবনকৃষ্ণ বেরা, আলিনানের নগেন্দ্রনাথ সামন্ত, ঘটুয়ালের পূর্ণচন্দ্র মাইতি, তমলুকের নিরঞ্জন জানা, কিয়াখালির রামেশ্বর বেরা, হিজলবেড়িয়ার নিরঞ্জন পাখিয়াল, খনিকের উপেন্দ্রনাথ জানা ও ভূষণচন্দ্র জানা এবং নিকাশীর বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী, আশুতোষ কুইলা -সহ বারোজন দেশপ্রেমিক শহিদের তাজা রক্তে।

মাতঙ্গিনী হাজরার জন্ম ১৮৬৯ সালের ১৭ই নভেম্বর তমলুক থানার হোগলা গ্রামে। বাবা ছিলেন গরিব কৃষক ঠাকুরদাস মাইতি। বাবা ঠাকুরদাস মেয়েকে ডাকতেন ‘মাতু’ বলে। বারো বছর বয়সে মাতঙ্গিনীর বিয়ে হয় আলিলান গ্রামের ত্রিলোচন হাজরার সঙ্গে। ১৮৮৮ সালে ১৮ বছর বয়সে তিনি স্বামীহারা হন। সাধারণ কৃষক বাড়ির সন্তানহীনা, নিরক্ষর, বাল্যবিধবা ছিলেন তিনি। খুব সাধারণ হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন অসাধারণ, অনন্যা। তাই তিনি স্বপাকে আতপচালসিদ্ধ আর নিরামিষ আহার করতেন। থাকতেন তাঁর স্বামীর বাড়ির এক গোলাঘরে। ১৯৩০ সালে গান্ধীজির ডান্ডি অভিযান ও লবণ আইন আন্দোলন মাতঙ্গিনীকে অনুপ্রাণিত করেছিল দেশসেবা ও জনসেবার মহান ব্রতে। তিনি নিয়োজিত করেছিলেন নিজেকে দেশ ও দেশের মানুষের কাজে। গান্ধীজির মতোই সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন মাতঙ্গিনী। তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘গান্ধীবুড়ি’। দেশের মানুষের বলিষ্ঠ অনুপ্রেরণা এবং বন্ধু।তিনি বুঝেছিলেন “জনসেবা” তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য । মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতেন সবসময়, আর্ত-পীড়িত মানুষের সেবা করতেন । গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে ঘুরে স্বাধীনতার কথা প্রচার করতেন মাতঙ্গিনী হাজরা ।

আরো পড়ুন:  বিশ্বের সবথেকে পুরনো চালু স্টুডিওটি ছিল কলকাতাতেই,বহু ইতিহাসের সাক্ষী "বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড"

দেশের কাজ করার সময়েই মাতঙ্গিনী হাজরার পরিচয় হয় সিউরি গ্রামের কংগ্রেস নেতা গুণধর ভৌমিকের (বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিকের বাবা) অজয় মুখোপাধ্যায় এবং সতীশ সামন্ত’র মত নেতৃত্বের সাথে । পরবর্তীতে গুণধর ভৌমিক তাঁর বাড়িতে আশ্রয় দেন মাতঙ্গিনী হাজরাকে । প্রসঙ্গ ক্রমে জানাই, বর্তমানের বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী, তমলুকেরই সন্তান ড. মণি ভৌমিক তখন এক গ্রাম্য বালক। সেদিনের সেই অতি সহজ সরল কপর্দকশুন্য মাতৃময়ী বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা হয়ে উঠেছিলেন মণি ভৌমিকের খুব প্রিয়। তাঁর নিজের বর্ণনায়, “তাঁর বাবার বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না। তিনি আঠারো বছর বয়সে বিধবা হওয়ার পরে ধান ভাঙার কাজ করে, একটি ঝুপড়ির মধ্যে থেকে তাঁর জীবন ধারণ করতেন। আমি তখন হাড় জিরজিরে নিঃসঙ্গ গরিব এক বালকমাত্র। কিন্তু স্নেহমমতার দৃপ্ততায় মাতঙ্গিনী হাজরা হয়ে উঠেছিলেন আমার বন্ধু এবং উপদেষ্টা।”

আরো পড়ুন:  কলকাতায় বনধ,মানুষের পাশে দাঁড়াতে ট্যাক্সিচালকের ভূমিকায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু

মাতঙ্গিনী হাজরা ১৯২০ থেকে ১৯৪২ সাল কংগ্রেসের প্রায় সকল আন্দোলনেই যোগদান করেছিলেন । লবণ সত্যাগ্রহ থেকে সরকারি কর বন্ধ আন্দোলন, আদালতে জাতীয় পতাকা তোলা, সামনে থেকে লাটসাহেব’কে কালো পতাকা দেখানো সবেতেই তিনি ছিলেন অগ্রভাগে । পুলিশের নির্মম অত্যাচার সহ্য করেছেন, জেলও খেটেছেন । বহরমপুর কারাগারে ছয় মাস বন্দী ছিলেন, হিজলি বন্দি নিবাসেও বন্দি ছিলেন দুই মাস । মাতঙ্গিনী হাজরা হয়ে উঠেছিলেন এক যোদ্ধা । কংগ্রেসের আদর্শে বিশ্বাস করেও সহিংস আন্দোলনেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন । তিনি বলেছিলেন, ‘’দেশের জন্য, দেশকে ভালোবাসার জন্য, দণ্ডভোগ করার চেয়ে বড়ো গৌরব আর কী আছে?’’ মাতঙ্গিনী হাজরার আদর্শ তাই আজও প্রজ্জলিত ।

-স্বপন সেন

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।