শুধু ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনই নয়,বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন “মাসিমা” মনোরমা বসু

শুধু ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনই নয়,বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন “মাসিমা” মনোরমা বসু

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে বাংলার প্রত্যন্ত গাঁয়ের যে কিশোরী অংশ গ্রহণ করেছিলেন সারা জীবনে আর সে পেছন ফিরে তাকায়নি৷অশ্বিনীকুমারের শিষ্যা সেই কিশোরী কালক্রমে হয়ে ওঠেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেত্রী।ব্রিটিশ শাসকের রাজরোষে পড়ে জেল খেটেছেন। ভারতের স্বাধীনতার পর সেই নারী আবার জড়িয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে৷ ভারতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, নারীমুক্তি আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি একজন সামনের সারির নেত্রী ৷ সারাভারতে কংগ্রেসের ডাকে শুরু হয়েছে আইন অমান্য আন্দোলন। বরিশালের সব নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন৷ রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির দাবি উঠেছে সর্বত্র৷ বরিশালে মিছিল বের হল,সেই মিছিলকে ছত্রভঙ্গ করতে ব্রিটিশ পুলিশের দমন-পীড়ন শুরু,তার প্রতিবাদে বরিশালে হরতালের ডাক দেওয়া হয়৷নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি৷হরতালে নেতৃত্ব দেওয়ার কারনে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার৷বিচারপর্বে হল ছয় মাসের জেল ও দেড়শো টাকা জরিমানা৷ এর কিছুদিন পর মহাত্মা গান্ধী এসেছেন বরিশালে | স্টিমার ঘাটে সংবর্ধনা জানালেন অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি শরৎ গুপ্ত এবং সম্পাদক সতীন্দ্রনাথ সেন। বিকেলে জনসভা | অসংখ্য মানুষের সমাবেশে মহিলাদের জন্য নির্ধারিত স্থানে বসে জমিদার বাড়ির বধূ৷গান্ধী বক্তৃতায় সময় আন্দোলনের তহবিলে সাহায্যের আহ্বান জানালেন।সঙ্গে সঙ্গে সেই বধূ দাঁড়িয়ে তাঁর গায়ের সব সোনার অলঙ্কার দান করলেন আন্দোলনের তহবিলে | ক্ষণিকের জন্য হলেও হাজার-হাজার দর্শক-স্রোতার দৃষ্টি মঞ্চ থেকে গাঁয়ের বধূর দিকে৷তাকে দেখেই অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকে দান করলেন আন্দোলন তহবিলে৷ সেই বধূ আর কেউ নন,বিপ্লবী মনোরমা বসু৷ পরে যিনি আবালবৃদ্ধ বনিতার কাছে মাসিমা নামে জনপ্রিয় হয়েছিলেন৷

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সামনের সারির নেত্রী মনোরমা বসু ৷ পৃথিবীর প্রথম আলো দেখেন বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার নরোত্তমপুর গ্রামে ১৮৯৭ সালের ১৮ নভেম্বর। বাবা নীলকন্ঠ রায়, মা প্রমোদ সুন্দরী। মনোরমা অল্প বয়সেই বাবাকে হারিয়েছিলেন৷ বিধবা গরিব মায়ের আর্থিক সামর্থ্য নেই দুই সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন৷ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থেমে গিয়েছিল মনোরমার শিক্ষা৷বাবার মৃত্যুর কয়েক বছর পরে বাঁকাই গ্রামের জমিদারপুত্র চিন্তাহরণ বসুর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়ে গেল৷ তখন তিনি তেরো অথবা চোদ্দ বছরের কিশোরী৷ স্বামী মানুষটা ছিলেন উদারমনা ও প্রগতিশীল। স্বামীর সহযোগিতায় ও সমর্থনে মনোরমা বসু স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন৷ সংসার সামলে সমাজসেবামূলক কাজে জড়িয়ে পড়লেন৷ মনোরমা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন৷ ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরামের ফাঁসি,তাঁর হৃদয় প্রবল ভাবে আলোড়িত হয়৷ মনে মনে বোধহয় তখন থেকে শপথ নিয়েছিলেন ভারতের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি থাকবেন একেবারে সামনের সারিতে৷

আরো পড়ুন:  হাস্যরসের আড়ালে অভিনীত হল ইংরেজদের অত্যাচারের স্বরূপ,গ্রেফতার হলেন অমৃতলাল বসু

জেলখাটা স্বদেশী মনোরমা বসু ৷ সংগঠনের চেতনা আর স্বদেশপ্রেম যার শিরায়,ধমনীতে তিনি কি কারাবাসের পরে চুপ থাকতে পারেন৷মনোরমা বসু চুপ করে থাকেননি,বরং নিজের ঘরের বারন্দায় মাদুর পেতে নিজের কন্যা সহ আরও কয়েকজনকে পড়ানো শুরু করলেন৷ মাতৃমন্দির আর মনোরমা বোধহয় একে অপরের আত্মা। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির আলোচনা করা সম্ভব নয়৷ মাতৃমন্দিরের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তাঁর সারা জীবনের সকল ভালোবাসা,আবেগ,পরিশ্রম৷ তিনি নিজের বাড়িতে পাড়ার ও নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ” মাতৃমন্দির প্রাথমিক বিদ্যালয়”৷ জমিদার বাড়ির গৃহিণী থেকে শিক্ষিকায় উত্তরণের সময় জেলখাটা স্বদেশী আন্দোলন করা মনোরমার নতুন ভূমিকার কথা ছড়িয়ে পড়ল। অনেকেই তাঁর তৈরি করা স্কুল দেখতে এলেন।এই মাতৃমন্দিরের বিষয়ে প্রখ্যাত বিপ্লবী ও সাহিত্যিক সত্যেন সেন লিখেছেন, “এবার বাড়ি তৈরি করবার আয়োজন শুরু হয়ে গেল। শহরের উকিল, শিক্ষক এবং অন্যরা চাঁদা করে ৩০০ টাকা তুলে দিলে মাসিমা তাঁর গলার হার বিক্রি করে ২৫০ টাকা সংগ্রহ করলেন। এই ৫৫০ টাকা পুঁজি করে বিদ্যালয়ের বাড়ি তোলার কাজে হাত দেয়া হল।…নতুন বাড়ি তৈরি করার পর ছাত্রী সংখ্যা একশোর উপর উঠে গেলে এবার আরো দু’জন শিক্ষয়িত্রীকে নিয়োগ করতে হল।…কিন্তু বিদ্যালয়ের খরচ চলবে কী করে? ছাত্রীদের কাছ থেকে বেতন নেয়া হত না। …এই আর্থিক সমস্যার সমাধানের জন্য মাসিমা বাড়িতে বাড়িতে মুষ্টি-ভিক্ষার ঘট বসালেন। প্রতি রবিবার মাসিমা এবং অন্য শিক্ষয়িত্রিরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে এই মুষ্টি- ভিক্ষার চাল সংগ্রহ করতেন। এ থেকেই শিক্ষয়িত্রীদের বেতন দেয়া হত।” সমাজসেবার সঙ্গে সক্রিয় ভাবে জড়িয়ে ছিলেন রাজনীতিতে৷ বরিশালে তখন কৃষক নেতা অমৃত নাগের নাম ঘরে ঘরে৷মনোরমার আত্মীয় ছিলেন অমৃত নাগ৷রাজনৈতিক আদর্শে তখন দু’জন কাছাকাছি৷অমৃত নাগের প্রভাবে বাম রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়লেন মনোরমা বসু৷ ১৯৫০ সালের সালের দাঙ্গার সময় কৃষক নেতা অমৃত নাগকে হত্যা করা হয়েছিল৷তবে মনোরমা বসু অমৃত নাগের স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে তাঁর পাঠাগারের নাম রাখলেন “পল্লীকল্যাণ অমৃত পাঠাগার”৷১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন মনোরমা বসু৷ততদিনে তিনি হয়ে উঠেছেন সবার মাসিমা। ১৯৪৩ সালে কলকাতা শহরের মতো বরিশালেও মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গড়ে তুলেছিলেন। সংগঠনের প্রথম নির্বাচিত সম্পাদক তিনি৷ ১৯৪৩-৪৪ সালে ব্রিটিশ শাসকদের অবহেলায় সারা বাঙলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে৷ একটু খাবারের জন্য অনাহারে থাকা মানুষগুলো খিদের যন্ত্রনায় ধুঁকতে ধুঁকতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন৷কোথাও রাস্তার কুকুর,পাখিদের সাথে লড়াই করে ডাস্টবিনে খাবারের খোঁজ করছেন৷ ঘরে বসে থাকার মানুষ ছিলেন না মনোরমা বসু,ঝাঁপিয়ে পড়লেন ত্রাণের কাজে৷শত-শত মহিলাদের নিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ালেন৷ নোয়াখালী দাঙ্গায় সাধারন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করেছেন৷তাঁর সঙ্গে থাকতেন বিপ্লবী ইলা মিত্র, আবদুল্লাহ রসুল, রমেশ ব্যানার্জী, বিভা দাসগুপ্ত ও নৃপেন সেনের মত মানুষেরা৷

আরো পড়ুন:  বীরভূমের "মাসিমা"ই ছিলেন অস্ত্র আইনে দন্ডিতা প্রথম মহিলা বিপ্লবী

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও দেশ ভাগ হয়৷ নতুন দেশ পাকিস্থান৷সেই নতুন দেশের অনেক মানুষ ভারতে চলে আসলেও মনোরমা বসু থেকে গেলেন বাপ ঠাকুরদাদার ভিটে পূর্ব পাকিস্থান তথা বাংলাদেশে৷ এখানেই তাঁর ভালোবাসার “মাতৃমন্দির”। আত্মীয়-স্বজন, সহযোদ্ধাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেলেও মনোরমা বাংলাদেশে থেকে গেলেন৷ দেশভাগের পর “নারী কল্যাণ সমিতি” উঠে যায়,গঠিত হল “পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি”৷ এর প্রথম সম্মেলন হয় ময়মনসিংহ শহরে, সেখানে তিনি বরিশালের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিলেন৷১৯৪৮ সাল পূর্ব পাকিস্থানে চালের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে৷দাম কমানোর উদ্যোগ নেই পাকিস্থানের শাসকদের,প্রতিবাদে বরিশালে আন্দোলন গড়ে উঠছে৷ হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে সামিল হয়েছেন৷ব্রজমোহন কলেজের ছাত্ররা যোগ দিয়েছেন বিক্ষোভে৷আন্দোলনের নেতৃত্বে মনোরমা বসু৷ জনগনের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে পুলিশের লাঠিচার্জ৷ মহিলা সমিতির ৪ জন নেত্রীসহ ৮ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এইসময় মনোরমা বসু প্রায় ১০ মাস বিনাবিচারে কারাগারে আটক ছিলেন। পরে বিচারে ৪ বছরের জেল হয় এবং জেল থেকে মুক্তি পান৷ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণের অভিযোগে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল মাতৃমন্দির।জেলের কুঠুরি থেকে মুক্তির পরে সেই বছরেই মনোরমা বসু ভেঙে ফেলা মাতৃমন্দির পুনরায় গড়ে তুললেন৷সেই সময় বিপ্লবী সত্যেন সেন “মাতৃমন্দিরের” জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছেন৷

আরো পড়ুন:  স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত বিশ্বের প্রথম ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ জন

১৯৫৪ সালে হারালেন জীবনসঙ্গী স্বামী চিন্তাহরণ বসুকে৷ এদিকে আবার নতুন করে মনোরমা বসুকে হয়রানির নীল নকশা তৈরি করেছে পাকিস্থানের শাসকরা৷ তবে এবার তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি প্রশাসন ৷ পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করে নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত থেকেছেন৷পরে অবশ্য তাঁর উপর থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা উঠে যায়৷স্বৈরশাসক আয়ুব খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন মাসিমা মনোরমা বসু৷

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন অগ্রণী সৈনিক৷স্বাধীনতা যুদ্ধের দিনগুলোতে মহিলাদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ৷ মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ কাঙ্খিত স্বাধীনতা অর্জন করলে পাক বাহিনীর হাতে ধ্বংস হওয়া “মাতৃমন্দির” ও স্কুল পুনরায় পুনরায় গড়ে তুলেছিলেন৷ বরাবর বাংলাদেশের নানা প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন৷নারী উন্নয়ন ও নারীদের কল্যাণের জন্য জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাজ করেছেন৷ইংরেজ শাসক,হোক বা পাকিস্থানের সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষুকে ভয় করে চলার মানুষ ছিলেন না বিপ্লবী মনোরমা বসু৷হারতে শেখেননি তিনি৷ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়৷ মহীয়সী নারী মনোরমা বসু ১৯৮৬ সালের ১৬ অক্টোবর তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মাতৃমন্দিরে প্রয়াত হন৷১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর “বেগম রোকেয়া”পুরস্কার প্রদান করে। মাসিমা মনোরমা বসুর দেশপ্রেম, সমাজসেবা, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে ধর্ম-বর্ণ-দল-মত নির্বিশেষে সব মানুষের কাছে তিনি মাসিমা তিনি বিপ্লবী মনোরমা বসু,তাঁর স্থান ভারত-বাংলাদেশের বাঙালির হৃদয়ের মনিকোঠায়৷

-অরুনাভ সেন

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।