গোপনাঙ্গে ঢোকানো হল চারটি সেদ্ধ গরম ডিম,তবুও মুখ খুললেন না ইলা মিত্র

গোপনাঙ্গে ঢোকানো হল চারটি সেদ্ধ গরম ডিম,তবুও মুখ খুললেন না ইলা মিত্র

অনেক পুরোনো দিনের কথা । রোহণপুর স্টেশনের দিকে এগিয়ে চলেছে সাঁওতাল নারী-পুরুষের একটি দল । সেখান থেকেই ট্রেন ধরবে তারা । আশেপাশে পুলিশের চর ছিলই । লক্ষ্য একটাই যেমন করেই হোক ধরতে হবে তেভাগা আন্দোলনের সেই নেত্রীকে । ছদ্মবেশে বহুদিন আত্মগোপন করে আছে সেই নেত্রী । হঠাৎ সাঁওতাল নারী-পুরুষের দলটির মধ্যে এক সাঁওতাল নারী কোমরের কাছে শাড়িতে গোঁজা ঘড়ি বের করে সময় দেখলেন । ব্যাপারটা নজর এড়াল না পুলিশের , তারা বুঝেছিল একজন দরিদ্র সাঁওতালের কাছে ঘড়ি থাকতে পারে না । সাথে সাথে গ্রেফতার করা হল সেই সাঁওতাল নারীকে । সেই ছদ্মবেশী সাঁওতাল নারী ছিলেন নাচোলের ‘রাণী মা’ ইলা মিত্র ।

ইলা মিত্র একটি বিপ্লবের নাম। একটি দর্শনের নাম। নারী আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, সাঁওতাল আন্দোলনের লড়াকু যোদ্ধার নাম। ইলা মিত্র সারাজীবন গরীব-দুঃখী সাঁওতাল কৃষকদেরকে জোতদার, জমিদার ও মহাজনদের শাসন-শোষণ ও অত্যাচার থেকে মুক্ত করার জন্য ইস্পাতদৃঢ় সংকল্প নিয়ে লড়াই করেছেন। সাঁওতালদের কাছে ইলা মিত্র ছিলেন মায়ের মতো, তাই তারা তাঁকে ‘রাণী মা’ বলে ডাকতেন তারা ।

ইলা মিত্রের জন্ম কলকাতায় ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর। তাঁর বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অধীন বাংলার একাউনটেন্ট জেনারেল। তাদের আদি বাড়ি ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রামে। ইলা মিত্র পড়তেন বেথুন স্কুলে । তারপর বেথুন কলেজে । এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ও সংস্কৃতে এম এ ডিগ্রি লাভ করেন । ছোট থেকেই খেলাধুলায় পারদর্শী ছিলেন । ১৯৩৫-৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাজ্য জুনিয়র এ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়ন । সাঁতার, বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টন – সবেতেই ছিলেন দক্ষ । তিনি প্রথম বাঙালি মেয়ে হিসেবে ১৯৪০ সালের জাপান অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেবার আর অলিম্পিকের আসরই বসেনি ।

আরো পড়ুন:  নেতাজির অনুপ্রেরণায় অতীন বসু সিমলা ব্যায়াম সমিতিতে শুরু করেছিলেন কলকাতার প্রথম সার্বজনীন দুর্গাপুজো

বেথুন কলেজে পড়াশুনা করার সময়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি ইলা মিত্রের । ১৯৪৩ সালে তিনি কলকাতা মহিলা সমিতির সদস্য হন । পরে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন । ১৯৪৫ সালে ইলা মিত্রের বিয়ে হয় বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা রমেণ মিত্রের সাথে । বিয়ের পর কলকাতা ছেড়ে চলে এলেন শ্বশুরবাড়ি রামচন্দ্রপুর হাটে । সেখানেই নিরক্ষর মেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার জন্যে তিনজন ছাত্রী নিয়ে স্কুল শুরু করেন ইলা । তিনমাসের মধ্যে ছাত্রী বেড়ে হয় ৫০ জন ।

রমেণ মিত্রের কাছে ইলা মিত্র জমিদার ও জোতদারের হাতে বাংলার চাষীদের নিদারুণ বঞ্চনার কথা শোনেন । ১৯৪০ সালে বাংলার ভূমি ব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাব দেয় ‘ফাউন্ড কমিশন’। এই কমিশনের সুপারিশ ছিল জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করে চাষিদের সরাসরি সরকারের দাসে পরিণত করা এবং তাদের উৎপাদিত ফসলের তিনভাগের দুইভাগের মালিকানা প্রদান করা । ১৯৪২-৪৩ সালে বাংলায় দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ । সেই সময়ও চলতে থাকে কৃষকের ওপর শোষণ । একসময় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে কৃষকরা । ১৯৪৬-৪৭ সালে দিনাজপুরে কমরেড হাজী দানেশের প্রচেষ্টায় শুরু হয় তেভাগা আন্দোলন । কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতি চাষিদের সংগঠিত করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালু করে । চল্লিশের দশকে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন ইলা মিত্র ।

১৯৪৮ সাল – ইলা মিত্র অন্তঃসত্ত্বা । তিনি গোপনে কলকাতায় যান ও সেখানে পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। এক মাস বয়সের ছেলেকে শাশুড়ির কাছে রেখে তিনি আবার ফিরে আসেন নাচোলে।ঐক্যবদ্ধ করেন কৃষকদের । নাচোলে মাতলা মাঝির নেতৃত্বে সাঁওতাল ও ভূমিহীনদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এক শক্তিশালী তীরন্দাজ ও লাঠিয়াল বাহিনী। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে জোতদার, মহাজনদের দল । সাঁওতালদের কাছে ইলা মিত্র হয়ে ওঠেন ‘রাণী মা’।

আরো পড়ুন:  নেতাজীকে আশঙ্কার কথা বলতেই দৃঢ়কন্ঠে জবাব পেলেন মুসেনবার্গ-''I haven’t come all this way to go back.''

এই ঘটনার কিছুদিন পরেই রোহণপুর স্টেশনের থেকে গ্রেফতার হন ইলা মিত্র । কিভাবে অত্যাচার করা হয়েছিল ইলা মিত্রের উপর ? শুনুন তার নিজের ভাষায় –

“গ্রেফতারের পর আমাকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি, এক ফোঁটা জলও না। ঐ দিন বিকালে সিপাহিরা আমার মাথায় ও নিতম্বে বন্দুক দিয়ে আঘাত করতে থাকে থানার এসআই এর উপস্থিতিতে। আমার নাক দিয়ে ক্রমাগত রক্ত পড়তে থাকে। এরপর কারাকক্ষে এসআই সিপাহিদের আদেশ করে চারটি সেদ্ধ গরম ডিম নিয়ে আসতে। এসময় এসআই হেসে বলেন এবার ঠিকই কথা বলবে। আমাকে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে বলা হয় এবং আমার গুপ্তাঙ্গে সেদ্ধ ডিম প্রবেশ করানো হয়। আমার মনে হচ্ছিলো আমাকে জীবন্ত পোড়ানো হচ্ছে এবং আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।

পরদিন সকালে যখন জ্ঞান ফিরলো এসআই ও কয়েকজন সিপাহী কারাকক্ষে প্রবেশ করে বুট দিয়ে আমার পেটে লাথি মারতে লাগলো। এসময় আমার ডান পায়ের গোড়ালিতে পেরেক ঢুকে যায়। অর্ধচেতন অবস্থায় আমি এসআইকে বলতে শুনি তারা রাতে আবার আসবে। তখনো যদি না মুখ খুলি তবে আমাকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়।

রাতে এসআই এবং সিপাহিরা ফিরে আসে কিন্তু আমি তখনও কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানালে তিন- চারজন মিলে আমাকে ধর্ষণ করে।”

আরো পড়ুন:  নিজের লেখা বই বিক্রি করে দশ লক্ষ টাকা ত্রাণ তহবিলে দিলেন লেখক অভীক দত্ত

এত অত্যাচারের পরেও মুখ খোলেননি ইলা মিত্র । পুলিশ আদায় করতে পারেনি স্বীকারোক্তি ।

মুক্তি পাওয়ার পর বহু বছর চিকিৎসার পর সুস্থ হন ইলা মিত্র । কলকাতা সিটি কলেজে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত হন। ১৯৮৯ সালে অবসর নেন ।পশ্চিমবঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টির জেলা ও প্রাদেশিক কমিটির সদস্য ছিলেন।১৯৬২ থেকে ১৯৭৮ সাল ছিলেন মানিকতলার বিধায়ক । ১৯৬৭-৭২ সালে বিধানসভায় কমিউনিস্ট ডেপুটি লিডার ছিলেন । পাঁচবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন । ইলা মিত্র ভারতের মহিলা ফেডারেশনের জাতীয় পরিষদ সদস্য, পশ্চিমবঙ্গ মহিলা সমিতির সহ-সভানেত্রী এবং ভারত ও সোভিয়েত সাংস্কৃতিক সমিতির সহ-সভানেত্রী ছিলেন । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়েও বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের ।

নিজেই বলেছেন “বাংলাদেশের মানুষের সাথে সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তারা আমার প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের জন্য কিছু করা আমার জন্য ঋণ পরিশোধের সুযোগ। আমি অনেক কিছু পেয়েছি তাদের কাছ থেকে, আমার স্বাধীনতা। তারা আমাকে পাকিস্তানের কারাগার প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্ত করেছে। আমি কি করে তাদের দুর্দিনে মুখ ফিরিয়ে নেই? যারা আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছে তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমি কি করে পিছিয়ে যাই?”

২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর কলকাতায় পরলোকগমন করেন ইলা মিত্র । নিজের শত শত বিঘা জমি দান করে গেছেন কৃষকদের নামে। বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৃষক আন্দোলনের প্রধান নেত্রী হয়ে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন চিরকাল ।

-অভীক মণ্ডল
তথ্য : রোর,জাগরনিয়া,লাইফ স্টোরিস ব্লগ,ইলা মিত্রের নিজের লেখা

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।