বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের আবিষ্কর্তা ছিলেন তিনি,প্রাপ্য সম্মান পাননি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের আবিষ্কর্তা ছিলেন তিনি,প্রাপ্য সম্মান পাননি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে আমরা বাঙালিরা কি ভুলে গেলাম ! তিনি একদিন পাশের দেশ নেপালের রাজদরবার থেকে খুঁজে নিয়ে এসেছিলেন হারিয়ে যাওয়া “চর্যাপদ”৷তিনি বাংলার প্রাচীন ভাষা চিনিয়েছেন বাঙালি জাতিকে৷ তাঁর আবিষ্কারে উন্মোচিত হয়েছে বাংলা ভাষার নতুন দিগন্ত ৷ বাঙালি আত্মবিস্মৃত হতে পারে ! কিন্তু পথপ্রদর্শকও বটে৷অন্তত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর জীবন সেই কথা বলে৷ দুটি মাত্র উপন্যাসের রচয়িতা হরপ্রসাদ শাস্ত্রী৷তাঁর “মহামহোপাধ্যায়” উপাধির কথা বোধহয় ভুলেই গিয়েছে বাঙালি ! সংস্কৃতজ্ঞ, পুরাতত্ত্ববিদ ও ভারতবিদ্যাবেত্তা হরপ্রসাদের “মহামহোপাধ্যায়” উপাধি কতজনের স্মৃতিতে আছে প্রশ্নচিহ্ন বোধহয় থেকেই যাবে ! সহজ সরল সতেজ বাংলা লিখছেন৷তবে তিনি সাহিত্যের বিস্তৃত পরিসর ছেড়ে স্বেচ্ছায় চলে গিয়েছিলেন জ্ঞানের চর্চায়, ভাষার আলোকিত না হওয়া জগত থেকে অমূল্য রত্নের খোঁজে৷তাঁর সেই প্রয়াসে এসেছে সাফল্য,লাভবান হয়েছে বাংলা ভাষা ও বাংলায় কথা বলা মানুষ৷সেই সময় গড়ে উঠেছিল ভাষা-ইতিহাস-ধর্ম-সমাজ-পুরাতত্ত্ব-প্রত্নতত্ত্বের সমাহারে ভারতবিদ্যা তথা প্রাচ্যবিদ্যার এক উর্বর পরিসর।

“ভারতমহিলা” প্রবন্ধ লিখে হোলকার মহারাজার ঘোষিত পুরস্কার পেয়েছিলেন সংস্কৃত কলেজের তরুণ ছাত্র হরপ্রসাদ, বঙ্কিমচন্দ্র ছেপেছিলেন “বঙ্গদর্শনে”৷ তখন তরুণ প্রতিভাবান লেখকদের কাছে বঙ্কিমচন্দ্র মানে তাদের উত্তরণের সিঁড়ি,আর “বঙ্গদর্শনে” লেখা ছাপা অথবা একবার বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশংসা পেলে তাদের আর কিছু দরকার হত না৷ হরপ্রসাদ লিখেছিলেন “বাল্মীকির জয়”৷ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে এই লেখা বাংলা ভাষায় প্রথম গদ্যকাব্য৷ হরপ্রসাদের লেখা ‘বঙ্গদর্শনে” প্রকাশিত হয়েছিল,বঙ্কিমচন্দ্র নিজে সেই লেখায় উচ্ছ্বাসিত হয়েছিলেন৷৷হরপ্রসাদ রচিত “কাঞ্চনমালা”বের হয়েছে “বঙ্গদর্শনে”৷তখন সম্পাদনা করেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়৷

আরো পড়ুন:  প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা আলালের ঘরের দুলাল বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস

বৌদ্ধধর্মের সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট-আশ্রয়ী উপন্যাস৷ পড়ে হরপ্রসাদের উপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তাঁর সাহিত্য গুরু বঙ্কিমচন্দ্র, তাঁর অনুযোগ ছিল বাংলা ও বাঙালির সাহিত্যরুচি শীলিত করে তুলছেন তিনি৷ হরপ্রসাদ রচিত আর একটি উপন্যাস “নারায়ণ” পত্রিকায় “বেণের মেয়ে” “কাঞ্চনমালা” লেখার অনেক পরে লিখেছিলেন৷যখন বয়সে ছোট,তখন তিনি ছিলেন শরৎনাথ৷জন্ম নৈহাটির ভট্টাচার্য পরিবারে ৬ ডিসেম্বর, ১৮৫৩ ৷বাবা রামকমল ভট্টাচার্য ন্যায়রত্ন স্বয়ং বিদ্যাসাগরের মতে তিনি ছিলেন বাংলার অন্যতম সেরা পন্ডিতদের একজন৷শরৎনাথ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, প্রাণসংশয় হয়েছিল, “হরের প্রসাদে” নবজীবন লাভ, সেইজন্য বদল হল নামের৷শরৎনাথ হলেন “হরপ্রসাদ”। বিদ্যাসাগরের বাড়ির ছাত্রাবাসে কিছু দিন থেকেছেন৷অসম্ভব মেধাবী সংস্কৃত কলেজ থেকে এনট্রান্স, এফএ, সংস্কৃতে স্নাতক।১৮৭৭সালে এমএ পাশ করার পরে হরপ্রসাদ হয়েছিলেন”শাস্ত্রী”৷ ১৮৭৮ সালে তিনি শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন হেয়ার স্কুলে৷ ১৮৮৩ সালে সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। এই সময়ই সরকার তাকে সহকারী অনুবাদক নিযুক্ত করে। ১৮৮৬ থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনার সঙ্গে তিনি বেঙ্গল লাইব্রেরিতে গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করেছেন৷১৮৯৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজের সংস্কৃতের বিভাগীয় প্রধান হয়েছিলেন৷ ১৯০০ সালে তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হন। ১৯০৮ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে অবসর নিয়ে সরকারের তথ্যকেন্দ্রে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯২১ থেকে ১৯২৪ পর্যন্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান৷হরপ্রসাদ স্বেচ্ছায় সাহিত্যের পরিসর থেকে সরে এসেছিলেন,নদীর এপার ভাঙলেও অন্য পাড় যেমন গড়ে এখানেও ঘটেছিল ঠিক একই ঘটনা৷ ভাষা-ইতিহাস-ধর্ম-সমাজ-পুরাতত্ত্ব-প্রত্নতত্ত্বের সমাহারে ভারতবিদ্যা তথা প্রাচ্যবিদ্যার এক উর্বর পরিসর। এখানে রাজেন্দ্রলাল মিত্র ছিলেন হরপ্রসাদের গুরু৷ দেশ-রাজ্য-অঞ্চল নির্বিশেষে সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে অসংখ্য গবেষণা, রাজেন্দ্রলাল মিত্র ছিলেন এই ক্ষেত্রে একদম সামনের সারির মানুষ৷তিনি ১৮৮৫ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় সভাপতি, তাঁর সহকারী তখন তরুণ হরপ্রসাদ। ১৮৯১সালে রাজেন্দ্রলালের প্রয়াণের পর হরপ্রসাদ এশিয়াটিক সোসাইটির ভাষাতত্ত্ব কমিটির সম্পাদক হলেন৷ রাজেন্দ্রলাল মিত্রের পর সংস্কৃত প্রাচীন পুঁথির জ্ঞান বাংলায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ছাড়া আর কারও ছিল না তখনকার শিক্ষিত মানুষ সেকথা প্রবল ভাবে বিশ্বাস করতেন৷

আরো পড়ুন:  স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র বিপ্লবীদের সঙ্গেও নিবিড় সম্পর্ক ছিল বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বাংলা ভাষায় অবদান কি? উনি চর্যাপদের আবিষ্কারক আমদের সবার জানা৷তবে সেই আবিষ্কারের গুরুত্ব আমরা কতটা অনুধাবন করি? প্রাচীন এই গ্রন্থকে উদ্ধার করে হরপ্রসাদ আসলে বাংলা ভাষার প্রাচীনত্ব ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন৷ মৈথিলী ভাষার প্রাচীন পুঁথি “বর্ণরত্নাকর” রামাই পণ্ডিতের “শূন্যপুরাণ” মানিক গঙ্গোপাধ্যায়ের “ধর্মমঙ্গল” সংগ্রহ ও প্রকাশ, কাশীরাম দাসের মহাভারতের “আদি পর্ব্ব” সম্পাদনা, আরও কত কৃতিত্ব তাঁর মুকুটে৷দেশের নানা স্থান অথবা, নেপাল— তিনি যেখানে গিয়েছেন, দিনের আলোয় এসেছে অজ্ঞাতপূর্ব সব তথ্য। তাম্রশাসনের বহু শিলালিপি অনুসন্ধান ও পাঠোদ্ধার করেছেন। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃত বৌদ্ধ সাহিত্যের সুপ্রতিষ্ঠা তাঁর হাত ধরেই৷ বৌদ্ধধর্মের নানা আচার-অনুষ্ঠান কি ভাবে মিশে আছে আমাদের জনসমাজের নানা স্তরে নির্যাস, লিখে গিয়েছেন “ডিসকভারি অব লিভিং বুদ্ধিজ়ম ইন বেঙ্গল”- বইয়ে৷ রাজেন্দ্রলাল মিত্রের “নোটিসেস অব স্যানস্ক্রিট ম্যানাস্ক্রিপ্টস”-এর মতো বিরাট কাজ, হরপ্রসাদ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন৷ ১২০ বছর আগে হরপ্রসাদ শুরু করেছিলেন “নোটিসেস’-এর ‘নিউ সিরি‌জ়” সেখানে হরপ্রসাদ-আলোচিত হাতে লেখা পুঁথির সংখ্যা চোদ্দোশোরও বেশি! ভারতবিদ্যার কোনও ‘হল অব ফেম’ নেই,অজস্র দুষ্প্রাপ্য পুঁথির খোঁজ ও আবিস্কারের জন্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নিশ্চিতভাবে সেখানে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিতে পারতেন৷ তিনি দিয়ে গিয়েছেন বিপুল এক আকর, সেখানে সংস্কৃত, বাংলা ও অন্য ভাষার সাহিত্যের ইতিহাস রচনার অমূল্য উপাদানের ছড়াছড়ি। হরপ্রসাদের সূত্রে এশিয়াটিক সোসাইটি ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ লাভবান হলেও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে তেমন হয় নি, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বনিবনার অভাব কিছু ক্ষেত্রে ছিল৷রাজনীতির সংশ্রব থেকে দূরেই থাকতেন। তবে ইংরেজদের প্রতি প্রীতি বোধহয় ছিল না! “ভারতবর্ষের ইতিহাস” বইয়ের একটা পরিচ্ছেদে ছিল “ভারতে ইংরাজ শাসনের সুফল”৷ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছিলেন ” সুফল” পাল্টে “কুফল”করে দিতে ৷ভারততত্ত্ববিদ, সংস্কৃত বিশারদ, এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসবিদ মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৭ নভেম্বর, ১৯৩১ আকাশের তারা হয়ে পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে৷

আরো পড়ুন:  ব্রিটিশদের কাছে শরৎচন্দ্র বসু ছিলেন “The real snake in the grass”

-অরুনাভ সেন

তথ্যঋণ : শিশির রায়,আনন্দবাজার পত্রিকা,উইকিপিডিয়া

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।