সহপাঠীদের উদ্দেশ্যে ক্ষুদিরাম বললেন,”নিজের দেশে তৈরি কাপড় নিয়ে তোমরা মস্করা করছ?”

সহপাঠীদের উদ্দেশ্যে ক্ষুদিরাম বললেন,”নিজের দেশে তৈরি কাপড় নিয়ে তোমরা মস্করা করছ?”

১৯০১ সাল | চাকরীর প্রয়োজনে অমৃতলাল ও অপরূপাদেবী নিজের গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন তমলুকে | অপরূপাদেবীর সঙ্গে ছিলেন তার ভাই | মাত্র তিন মুঠো খুদ দিয়ে কিনেছিলেন বলে তার নাম ছিল ক্ষুদিরাম | পড়াশোনায় তার কোনোদিনই মন ছিল না | সারাদিন বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত সে | কখনও মন্দিরেই রাত কাটিয়ে দিত | রাতেও অনেকসময় বাড়িতেও ফিরত না | অপরূপাদেবী তমলুকের হ্যামিলটন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন তার ভাই এবং তার পুত্র ললিতমোহনকে | দুজনেই পড়তেন চতুর্থ শ্রেণীতে | শরীরচর্চার ব্যাপারে ক্ষুদিরামের ছোট থেকেই উৎসাহ ছিল |

দেশের প্রতি ছোটবেলার থেকেই ক্ষুদিরামের ছিল গভীর টান | তখন তার স্কুলের বেশীরভাগ সহপাঠী বিলাতী মিলের মিহি কাপড় পড়ত | একবার সহপাঠী ফণিভূষণ ঘোষ দেশী মিলের মোটা জামা পরে ক্লাসে এসেছিল | তার ওই পোশাক দেখে টিটকিরি দিতে শুরু করে অন্যান্য সহপাঠীরা | কাঁদতে থাকে ফণি | ক্ষুদিরাম এই ঘটনা দেখে এগিয়ে আসে | যে সব সহপাঠী টিটকিরি দিচ্ছিল তাদের উদ্দেশ্যে জোর গলায় বলে – “নিজের দেশে তৈরি কাপড় নিয়ে তোমরা মস্করা করছ?! এজন্য তোমাদের লজ্জা পাওয়া উচিত। এমন কাপড় পড়তে পাওয়া তো ভাগ্যের কথা।” এরপর সহপাঠীরা তাদের ভুল বুঝতে পারে, ক্ষমা চেয়ে নেয় তারা ফণির কাছে | পরবর্তীতেও ফণিকে আর কেউ টিটকিরি দেয়নি |

আরো পড়ুন:  প্রায় শতাব্দী প্রাচীন ইয়ং বেঙ্গল হোটেলে আজও চলছে উনুনে রান্না,রান্নায় রয়েছে বাটা মশলার স্বাদ

শরীরচর্চায় আগ্রহী হলেও ক্ষুদিরাম খুব বলবান ছিলেন না | প্রায়ই আধপেটা থাকতেন | একেই মা নেই, দিদি সংসারের কাজে অনেকটাই ব্যস্ত থাকত | অপরূপা দেবীর স্বামী অমৃতলাল বাবুও ক্ষুদিরামকে খুব একটা পছন্দ করতেন না | অপরূপা দেবী ক্ষুদিরামকে খুব ভালবাসতেন বটে কিন্তু বেশি সময় দিতে পারতেন না | ক্ষুদিরামের খুব কাছের মানুষ ছিল অপরূপা দেবীর পুত্র ললিতমোহন | ক্ষুদিরামকে সে মামা বলে ডাকত | দুজনে একসঙ্গে স্কুলে পড়ত | ঘুরেও বেড়াত একসাথে | প্রায়ই রাতে অনেক দেরি করে বাড়ি ফিরতেন ক্ষুদিরাম | দিদি-জামাইবাবুর যাতে অসুবিধা না হয় বা ঘুম না ভাঙে তার জন্যে ভাগ্নে ললিতমোহন পায়ে একটা দড়ি বেঁধে বাইরের ঘরে শুতেন। দড়ির অপর প্রান্ত থাকত জানলার বাইরে | ক্ষুদিরাম বাড়ি ফিরলে সেই দড়ি ধরে টানত | ঘুম ভেঙে যেত ললিতমোহনের।তিনি মামাকে দরজা খুলে দিতেন আর তারপর দুজনে রাতের খাবার খেতেন |

হার না মানা মনোভাব ছোট থেকেই ছিল ক্ষুদিরামের | একবার স্কুলে এক শিক্ষক ছাত্রদের হাতের জোর পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন | এক টেবিল দেখিয়ে সকলকে বলেছিলেন দেখি তোমরা কি কতগুলো ঘুষি এই টেবিলে মারতে পারো | সকলে ৭ কি ৮ টি ঘুষি মারতে পেরেছিল | ক্ষুদিরামের সুযোগ এলে সে টেবিলে মেরেছিল তিরিশটি টেবিল কাঁপানো ঘুষি | হাত ফেটে রক্তাক্ত | তবুও থামানো যাচ্ছে না তাকে | শেষমেশ শিক্ষক নিজের হাতে ছাত্রের হাত আগলে ধরে তাঁকে ক্ষান্ত করেন |

আরো পড়ুন:  পার্লামেন্ট হাউসে বোমাবর্ষণে ভগৎ সিং-এর সঙ্গী ছিলেন,বটুকেশ্বর দত্তের শেষ জীবন কেটেছিল তীব্র অর্থকষ্টে

দেশ আর দেশের মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন | মেদিনীপুরে একবার কলেরার মড়ক দেখা দেয় | মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্ষুদিরাম | রাত জেগে সেবা করতেন অসুস্থ মানুষদের | একবার মেদিনীপুরের নিকটবর্তী জনার্দনপুর ভেসে গিয়েছিল কাঁসাই নদীর বন্যায় | ছোট্ট ক্ষুদিরাম ছুটে গিয়েছিল সেখানে | শহরের বাড়ি বাড়ি ঘুরে জোগাড় করেছিল টাকা আর জামাকাপড় | সঙ্গীদের নিয়ে সেই সাহায্য সে পৌঁছে দিয়েছিল বন্যাপীড়িত মানুষদের কাছে |

টিফিনের সময়ে স্কুলের গেটে চালভাজা, মটরভাজা, ছোলাভাজা বিক্রি করতে আসত ফেরিওয়ালারা | একবার ক্ষুদিরামের এক সহপাঠী এক ফেরিওয়ালার কাছ থেকে ফাউ চেয়েছিল | কিন্তু সেই ফেরিওয়ালা সেই ছাত্রটিকে গালাগাল দেয় | খবর যায় ক্ষুদিরামের কাছে | এক দৌড়ে গেটের বাইরে এসে ক্ষুদিরাম সোজা এক লাথি কষিয়ে দেন খাবারের ঝুড়িতে | সব খাবার মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে | খবর যায় হেডমাস্টারের কাছে | তিনি ক্ষুদিরামকে ডাকলে সত্য কথা স্বীকার করে নেয় | হেডমাস্টার মুগ্ধ হয়েছিল ক্ষুদিরামের স্পষ্টবাদিতায় | আর বন্ধুরা ক্ষুদিরামকে চাঁদা তুলে মিষ্টি খাইয়েছিল |

আরো পড়ুন:  জেলাশাসক বার্জ হত্যার নায়ক তিনি,একবার ধান বিক্রির পুরো টাকাটাই বিভির হাতে তুলে দিয়েছিলেন অনাথবন্ধু পাঁজা

অনন্তলাল সাহু ছিলেন ক্ষুদিরামের শ্রেণী শিক্ষক | প্রচন্ড কড়া শিক্ষক | পড়া না পারলে কোনও কথা না শুনেই ছাত্রদের বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে বেত মারতেন | একদিন তিনি ক্লাসে এসে দেখলেন ক্ষুদিরাম আগে থেকেই বেঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে আছেন | অনন্তবাবু হেসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, পড়া করিসনি কেন? ক্ষুদিরাম জবাব দিল, আজ আপনি প্রথমবার পড়া না করার কারণ জিজ্ঞেস করলেন স্যার | অবাক হলেন অনন্তবাবু | ক্ষুদিরাম বলল, আমার পাশের বাড়ির এক ছেলের কলেরা হয়েছিল,তার সেবায় সারারাত জেগে থাকায় পড়া করতে পারিনি | এই ঘটনার পর অনন্তবাবু কাউকে পড়া না করার কারণ জিজ্ঞেস না করে বেত মারেননি।

কুসুমকুমারীকে মাসি বলে সম্বোধন করতেন ললিতমোহন এবং ক্ষুদিরাম। এই মাসির কথা স্মরণ করেই পরবর্তীকালে কবি বোধহয় গান বেঁধেছিলেন –

“দশ মাস দশ দিন পরে
জন্ম নেব মাসির ঘরে, মাগো!”

-অভীক মণ্ডল
তথ্য – ক্ষুদিরাম (সোনালী দত্ত)

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।