আন্দামান সেলুলার জেলে প্রায় একমাস অনশন করে প্রাণ দিয়েছিলেন বিপ্লবী মোহিত মৈত্র,বাঙালি মনে রাখেনি

আন্দামান সেলুলার জেলে প্রায় একমাস অনশন করে প্রাণ দিয়েছিলেন বিপ্লবী মোহিত মৈত্র,বাঙালি মনে রাখেনি

১৭ মে, ১৯৩৩ | বেশ কয়েকজন মোটাসোটা পালোয়ান লোককে সঙ্গে নিয়ে, জেল সুপার, ডাক্তার, জেলের সেলে মধ্যে ঢুকলেন | কিছু বুঝতে না বুঝতেই লোকগুলি, বেশ কয়েকদিন ধরে না খাওয়া দুর্বল মানুষটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল | মানুষটির সারা হাতে পায়ে লাল হয়ে আছে মার খেয়ে, কতোদিন স্নান করতে দেয়নি, ঘা হয়ে গেছে ক্ষতগুলো, রক্তজমাট কালশিটের মানচিত্র গোটা পিঠে | দুজন দুটি হাত, দুজন দুটি পা এবং দুজন পুরো শরীরটা চেপে ধরল। এছাড়াও একজন মাথা ও অন্যজন চিবুক ধরে জোড় করে হা করাল। সেই সুযোগে ডাক্তার একটি সরু নল দিয়ে দুধ ঢালতে শুরু করলেন। আর কোনো উপায় না দেখে ওই মহান মানুষটি তাঁর আমরন অনশনকে বাঁচিয়ে রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবে জোরে জোরে কাশতে থাকলেন, এটা ভেবে যে, যদি কোনোভাবে ওই দুধ ভর্তি নলটি খাদ্যনালী থেকে সরে গিয়ে শ্বাসনালীতে চলে যায় , তারফলে কিছুটা দুধ ফুসফুসে চলে গেলে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, যেমন ভাবা তেমন কাজ, আরও জোরে জোরে কাশতে থাকলেন, ফলে কিছুটা দুধ ফুসফুসে ঢুকেও গেল এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। ফলে তাঁর আমরন অনশন বজায় থাকল | জ্ঞান ভাঙল কয়েকদিন পর জেল সুপার আবার চেষ্টা করলেন কিছু বুঝিয়ে-সুজিয়ে খাওয়ানোর জন্যে। কিন্তু তাঁর অদম্য জেদ, তাঁর ইচ্ছা শক্তি, আর অকৃত্রিম দেশপ্রেমের কাছে সবাই হার মানল। এইভাবেই চলতে থাকল তাঁর আমৃত্যু অনশন |

আরো পড়ুন:  ফাঁসির দিন ভোরবেলা বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের লেখা জীবনের শেষ চিঠি

সাহেব ডাক্তার হাতজোড় করে বলে অনেক তো হলো এবার ওষুধটা খেয়ে নাও |
মানুষটি মুচকি হেসে বলেছিল, I am still on Hunger Strike. My Comrades are not eating. দশদিন যমে মানুষে টানাটানি চলল | ২৮ মে, ১৯৩৩ | চির নিদ্রায় ঢলে পড়লেন তিনি |

মোহিত মৈত্র | পুরো নাম মোহিতমোহন মৈত্র | ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম নেই | আজকালকার বাঙালিও তাঁর নাম শোনেনি | আন্দামান সেলুলার জেলে যারা বেড়াতে গিয়েছেন তাদের চোখে পড়তে পারে মোহিত মৈত্রের মূর্তি | ব্যাস শুধু ওইটুকুই | এর বেশি আর কিছুই হয়নি মোহিত মৈত্রের জন্যে |

মোহিতমোহন মৈত্রের জন্ম পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার নতুন ভারেঙ্গায়। তার পিতার নাম হেমচন্দ্র মৈত্র | যুগান্তর দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন মোহিত মৈত্র | ব্রিটিশরাজ বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ সালে পুলিস তাকে গ্রেপ্তার করে। তার বাড়ি থেকে রিভলভার ও গোলা বারুদ পাওয়ায় তাকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে আন্দামান জেলে পাঠানো হয় | বয়স মাত্র পঁচিশ |

সেলুলার জেলে বিপ্লবীদের উপর অকথ্য অত্যাচার চলত | রাতের পর রাত না খাইয়ে ফেলে রাখা হতো, বরফের উপর শুইয়ে চলতো অত্যাচার। ঠাঠা রোদে দাঁড় করিয়ে অজ্ঞান না হয়ে যাওয়া অবধি চাবুক মারা, ১৮ঘন্টা টানা ঘানি টানতে বাধ্য করা। নারকেল পিষে রোজ ২৫ কেজি তেল বানাতে হত, নইলে দেওয়ালের হুক থেকে ঝুলিয়ে ডান্ডা দিয়ে পেটানো হত | বন্দিদের উপর ব্রিটিশ সরকারে নির্মম অত্যাচারের প্রতিবাদে ১৯৩৩ সালে অনশনে বসেছিলেন ৩৩ জন বন্দি।তাঁদের মধ্যে অনশন করে প্রাণ দিয়েছিলেন মহাবীর সিংহ, মোহনকিশোর নমদাস এবং মোহিত মৈত্র। তিন সপ্তাহ অকথ্য মারধর চলেছে তবু এক দানা মুখে দেয়নি মহাবীর সিংহ, মোহনকিশোর নমনদাস আর মোহিত মৈত্র |

আরো পড়ুন:  মৃত্যুপথে যাত্রা আসন্ন,কবিগুরুর কবিতা আবৃত্তি করছেন দীনেশ,শ্রোতা বাদল,রাজেন গুহ-র বাড়িতে প্রস্তুত বিনয়

কিন্তু এই টানা অনশনের কারণ কি ছিল ? একটাই দাবি ছিল স্রেফ মানুষের মতো ব্যবহার পাওয়া | কিন্তু এই অনশনের ফলে সকল অনশনরত বিপ্লবীদের কপালে জুটল আরও অত্যাচার | ব্রিটিশরা ভেবেছিল এর ফলে বিপ্লবীরা অনশন তুলে নেবে বা মুচলেকা দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেবে | কিন্তু না মোহিত মৈত্র ক্ষমাও চাননি আর অনশনও থামাননি | ১৯৩৩ সালের ২৮শে মে পরলোকগমন করেন তিনি | পরিবারের কাছে মোহিত মৈত্রর দেহটা ও পাঠানো হয়নি। পাথরে বেঁধে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলা হয় |

দুঃখের বিষয়, ‘আলো এবং ধ্বনি’ অনুষ্ঠানে মহাবীর সিংহের নাম উল্লিখিত থাকলেও, বাংলার দুই বীর মোহিত মৈত্র এবং মোহনকিশোর নমোদাস-এর উল্লেখ নেই | স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষে সেলুলার জেলের অত্যাচারে নিহত ছ’জন শহিদের আবক্ষ মর্মরমূর্তি উন্মোচন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মাননীয় কে আর নারায়ণন। আন্দামান নির্বাসিত রাজনৈতিক বন্দি মৈত্রী চক্রের তৎকালীন সম্পাদক বিপ্লবী জ্যোতিষচন্দ্র মজুমদার তাঁর ভাষণে ওই পার্ককে ‘শহিদ পার্ক’ হিসাবে নামকরণ করেন। কিন্তু কে বা কারা পরে ওই পার্কের নাম পরিবর্তন করে ‘সাভারকর পার্ক’ সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়েছেন | বিপ্লবী বারীন্দ্র কুমার ঘোষ ও পুলিন বিহারি দাসের আবক্ষ মর্মরমূর্তি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০০৬ সালের ২০ মার্চ আন্দামান কর্তৃপক্ষকে প্রদান করেন। আজ পর্যন্ত সেই মূর্তি দু’টি স্থাপন তো দূরের কথা, বাক্সবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তই হয়নি।

আরো পড়ুন:  বরিশালের মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন তিনি,বাঙালি মনে রাখেনি অশ্বিনীকুমার দত্তকে

এই ভাবে বিকৃত তথ্যের মাধ্যমে অন্যান্য বীর বন্দিদের তাচ্ছিল্য করে এক জনকে বীর বানানো হয়েছে এবং আন্দামানের এয়ারপোর্টকে ‘বীর সাভারকর এয়ারপোর্ট’ নামকরণ করা হয়েছে | আত্মবিস্মৃত বাঙালিও ভুলে গেছে বীর বাঙালি যোদ্ধাদের | আমরা ভুলে গেছি হয়ত স্বাধীনতাটা রক্ত দিয়ে এসেছিল | ভুলে গেছি বলেই হারিয়ে গিয়েছে মোহিত মৈত্র-রা |

মোহিত মৈত্র | প্রণাম ও শ্রদ্ধা |

তথ্য : সাংবাদিক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ (মোহিত মৈত্র মায়ের দিকে থেকে ময়ূখ রঞ্জন ঘোষের দাদু হন)

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।