পরীক্ষা করতে গিয়ে বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত পা,অগ্নিদগ্ধ গোটা দেহ তবুও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলে উপস্থিত অর্ধেন্দু দস্তিদার

পরীক্ষা করতে গিয়ে বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত পা,অগ্নিদগ্ধ গোটা দেহ তবুও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলে উপস্থিত অর্ধেন্দু দস্তিদার

দিনটি ছিল ১৮ এপ্রিল, ১৯৩০…চট্টগ্রামে সেদিন রচিত হয়েছিল এক অসীম সাহসিকতার উপাখ্যান । সর্বাধিনায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে মাত্র ৬৫ জন যুবকের একটি দল পরাক্রমশালী ব্রিটিশ শক্তির হাত থেকে চট্টগ্রামকে স্বাধীন করার অসম্ভব এক স্বপ্ন বুকে লড়াইয়ে নেমেছিল সেদিন। বিপ্লবীরা দখল করে নিয়েছিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার | এই বিপ্লব নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা ব্রিটিশ রাজকেই। বিপ্লবীদের বিশ্বাসের পালে হাওয়া লাগিয়ে সেদিন চট্টগ্রামে উড়েছিল ভারতীয় পতাকা | এরপর ২২ শে এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে হল সেই লড়াই – জালালাবাদের যুদ্ধ | চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা বুক চিতিয়ে লড়াই করল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে | এইসব ঘটনা আমরা কম বেশি সকলেই শুনেছি |

সেদিনের সেই ৬৫ জন যুবকের মধ্যে ছিল এক হোমিওপ্যাথি পাঠরত পড়ুয়া | বয়স মাত্র সতেরো | শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পরম ভক্ত ছিল সে | নাম অর্ধেন্দু শেখর দস্তিদার | জন্ম ১৯১৩ সালে চট্টগ্রামের ধলঘাটে। বাবার নাম চন্দ্রকুমার দস্তিদার। ছোট থেকেই সে মাস্টারদার কথা শুনে বড় হয়েছে | মাস্টারদার দলে নাম লেখাতে চাইল অর্ধেন্দু | কিন্তু তার বাবা চন্দ্রকুমার দস্তিদার রাজি হলেন না | এদিকে অর্ধেন্দু মাস্টারদার দলে নাম লেখাবেই, বাবার সঙ্গে মতবিরোধে বাড়ি ছাড়ল সে | যোগ দিল মাস্টারদার ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মিতে |

আরো পড়ুন:  ইংরেজদের দাসত্ব করবেন না,আই সি এস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েও ঘোড়ায় চড়ার পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকলেন অরবিন্দ ঘোষ
মাস্টারদা

মাস্টারদার দলে যোগ দিয়ে বোমা বানাত অর্ধেন্দু | চট্টগ্রাম অস্ত্রগার দখলের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে বোমা বানানোর সময় একটি বোমা ফেটে যায় | সেই বোমার আঘাতে পুরো দেহ জ্বলে যায় অর্ধেন্দুর | মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয় তার বাম পা | পরিস্থিতি এমন হয় যে হাঁটার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে অর্ধেন্দু | সবাই তাকে বিশ্রাম নিতে বলে | কিন্তু অর্ধেন্দুর একটাই কথা – সে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলের দিন যাবেই | হ্যাঁ, অর্ধেন্দু ঘোষ দস্তিদার সেদিন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলে গিয়েছিল | বাম পা প্রায় অকেজো, সেই অবস্থাতেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সে গিয়েছিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলে | এখানেই শেষ নয় | জালালাবাদের যুদ্ধেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল অর্ধেন্দু শেখর দস্তিদার | ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে মারাত্মক আহত হয় সে | গুলি লাগে অর্ধেন্দুর বা কিডনি এবং হাতে | আগেই ছিল পায়ের ক্ষত, এরপর হাতে আর পেটে গুলির আঘাতে জ্ঞান হারায় অর্ধেন্দু | সকলে ভাবে মারা গিয়েছে সে | কিন্তু অর্ধেন্দুর দেহে তখনও প্রাণ ছিল | প্রায় বেশ কয়েকঘন্টা জালালাবাদের পাহাড়ে পড়ে ছিল অর্ধেন্দু | তারপর তার জ্ঞান আসে | জ্ঞান আসার পর সে তার এক সহ বিপ্লবীকেও পাহাড়ে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে | কিন্তু জ্ঞান আসার পরেও অর্ধেন্দু তখন চলনশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল | সেই সহ বিপ্লবীটি চেষ্টা করেছিল অর্ধেন্দুকে পাহাড়ের নিচে নিয়ে আসতে, কিন্তু সে ব্যর্থ হয় | তখন অর্ধেন্দু তাকে একই নিচে নেমে যেতে বলে | যখন সেই সহ বিপ্লবী নিচে নেমে যাচ্ছে অর্ধেন্দু তাকে বলেছিল, ” হয়ত আমার সাথে মাস্টারদার আর কোনওদিন দেখে হবে না | কিন্তু তোমার সাথে যদি মাস্টারদার কোনওদিন দেখা হয় তাহলে মাষ্টারদাকে বলে দিও অর্ধেন্দু জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অবধি মাস্টারদার আদর্শ মনে রেখেছে – Death or Liberty ” | একজন সতেরো বছরের ছেলে দেশকে কতটা ভালোবাসলে এই কথা বলতে পারে……

আরো পড়ুন:  অন্ধকার থেকে উদয় হলেন নেপাল নাগ,পুলিশ কনস্টেবলকে লক্ষ্য করে পরপর দুটো গুলি করলেন কপালে ও বুকে
অর্ধেন্দু দস্তিদার | প্রায় নব্বই বছর আগের ছবি | কিন্তু ছবিটি ভাল করে দেখলে বোঝা যায় মুখের মধ্যে সাদা দাগ | বোমা বিস্ফোরণের ফলেই আগুনে জ্বলে এই সাদা দাগ জন্ম নেয় |

২৩ তারিখ সকালে আবার কিছু বিপ্লবী জালালাবাদের পাহাড়ের উপরে যায় | সেখানে গিয়ে তারা অর্ধেন্দুকে পড়ে থাকতে দেখে | তারা বুঝতে পারে অর্ধেন্দুর দেহে প্রাণ আছে | তখন সকাল দশটা | বিপ্লবীরা কোলে করে অর্ধেন্দুকে পাহাড়ের নিচে নিয়ে আসে | দুপুর প্রায় দুটোর কাছাকাছি তাকে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম হাসপাতালে | সেই খবর ব্রিটিশদের কাছে পৌঁছায় | তারা চলে আসে চট্টগ্রাম হাসপাতালে | সেখানেই অর্ধেন্দুকে জেরা করা শুরু করে ব্রিটিশরা | কিন্তু অর্ধেন্দু মুখ খোলেনি | একটি কথাও ব্রিটিশরা তার কাছ থেকে বের করতে পারেনি | ২৪ তারিখ রাত একটা বেজে পঞ্চাশ মিনিটে অনন্তলোকে পাড়ি দেয় বিপ্লবী অর্ধেন্দু দস্তিদার | প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য অর্ধেন্দুর দুই ভাই পূর্ণেন্দু দস্তিদার ও সুখেন্দু দস্তিদারও ছিলেন বিরাট বড় বিপ্লবী |

আরো পড়ুন:  বীরভূমের "মাসিমা"ই ছিলেন অস্ত্র আইনে দন্ডিতা প্রথম মহিলা বিপ্লবী
অন্তিমযাত্রায় অর্ধেন্দু দস্তিদার

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু উপস্থিত ছিলেন অর্ধেন্দু দস্তিদারের শেষকৃত্যে | খালি পায়ে নিজের কাঁধে করে তিনি অর্ধেন্দুর দেহ নিয়ে যান শ্মশানে |

অর্ধেন্দু দস্তিদারকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে | আমরা জেনেছি “চরকা কেটেই স্বাধীনতা এসেছে” |

অর্ধেন্দু শেখর দস্তিদার | প্রণাম ও শ্রদ্ধা |

-অভীক মণ্ডল

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।