মানতে পারেননি দেশভাগ,বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে তথ্যচিত্রও বানিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক

মানতে পারেননি দেশভাগ,বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে তথ্যচিত্রও বানিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক

১৯৪৮ সাল | কলকাতার হাজরা রোডের উপর একটা ছোট চায়ের দোকান | নাম প্যারাডাইস ক্যাফে | নিয়মিত সেখানে আড্ডা দিতে আসেন এক যুবক | এই যুবকদের মধ্যে একজন ছিলেন সবচেয়ে বেপরোয়া | মৃণাল সেন, তাপস সেন, সলীল চৌধুরী কেউই তাঁর সাথে তর্কে পেরে উঠতেন না | সেই যুবক ছিলেন ঋত্বিক ঘটক |

নাটকই ছিল ঋত্বিক ঘটকের প্রথম পছন্দ | মেজদা সুধীশ ছিলেন সিনেমার লোক | সেই সূত্রেই ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় আসা | বেশ কিছু সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার পর পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন ঋত্বিক ঘটক | তাঁর সিনেমার সংখ্যা বেশি না। অর্থাভাব ও নানা কারণে তিনি বেশি সিনেমা করেননি, এমনকি কিছু তথ্যচিত্র ও শর্ট ফিল্মের কাজ হাতে নিয়েও শেষ করতে পারেননি। ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত মোটামুটি ৮-৯ টি সিনেমা আছে, প্রতিটা দেখুন। পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকে কলকাতা তথা বাংলার রূঢ় বাস্তবতা নির্মম ভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর সিনেমায়। মানুষের জীবনের কষ্টই তাঁর সিনেমার উপাদান। ‘নাগরিক’, ‘অযান্ত্রিক’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘সুবর্ণরেখা’, ‘যুক্তি, তক্কো ও গপ্পো’ এই সিনেমাগুলো বাংলাকে চেনার, তৎকালীন সমাজকে বোঝার কালজয়ী দলিল | বাংলা ভাগ মানতে পারেননি ঋত্বিক | বলেছিলেন ‘বাংলা ভাগটাকে আমি কিছুতেই গ্রহন করতে পারিনি– আজও পারিনা। ইতিহাসে যা হয়ে গেছে তা পাল্টানো ভীষন মুশকিল, সেটা আমার কাজও নয়। সাংস্কৃতিক মিলনের পথে যে বাধা, যে ছেদ,যার মধ্যে রাজনীতি-অর্থনীতি সবই এসে পড়ে, সেটাই আমাকে প্রচন্ড ব্যথা দিয়েছিল’। এই বাংলা ভাগের যন্ত্রণার কথা তিনি বারবার তুলে ধরেছেন নিজের সিনেমায় | বড় ভালবাসতেন বাংলাদেশকে তিনি | একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন | মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে নির্মাণ করেন ‘দুর্বার গতি পদ্মা’। সায়েন্টিস্টস অফ টুমরো(১৯৬৭),ইয়ে কিঁউ(১৯৭০),পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্য নিয়ে পুরুলিয়ার ছৌ(১৯৭০), লেনিনের ১০০তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমার লেনিন(১৯৭০) , ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজকে নিয়ে তথ্যচিত্র রামকিঙ্কর(১৯৭৫) ছিল ঋত্বিক ঘটকের উল্লেখযোগ্য কিছু তথ্যচিত্র |

আরো পড়ুন:  কমল দাশগুপ্তের তত্ত্বাবধানেই ফিরোজা বেগম মাত্র ১২ বছর বয়সে প্রথম গান রেকর্ড করেন

মানুষকে নিছক আনন্দ দেওয়ার জন্যে সিনেমা বানাননি তিনি | ঋত্বিক ঘটক বলতেন ‘একটি ছেলের সঙ্গে একটি মেয়ের দেখা হলো-এ ধরনের পুতু পুতু গল্পে আমার রুচি নেই। আমি আপনাদের ঘা দেব এবং বোঝাবো,এ কাহিনী কাল্পনিক নয়। বলবো,চোখের সামনে যা দেখছেন তার অন্তর্নিহিত বক্তব্য,আমার বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করুন। যদি সচেতন হন এবং আমার উত্থাপিত প্রতিবাদটি উপলব্ধি করতে পারেন,তবে বাইরে বেরিয়ে বাস্তবকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেন,তাহলেই স্বার্থক আমার ছবি করা।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর হৃদয়জুড়ে | তিনি বলতেন “রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া আমি কিছুই প্রকাশ করতে পারি না। আমার জন্মের অনেক আগেই তিনি আমার সমস্ত অনুভূতি জড়ো করে ফেলেছিলেন। তিনি আমাকে বুঝেছিলেন এবং সেসব লিখেও ফেলেছিলেন। আমি যখন তাঁর লেখা পড়ি তখন আমার মনে হয় যে সবকিছুই বলা হয়ে গেছে এবং নতুন করে আমার আর কিছুই বলার নেই |”

আরো পড়ুন:  মুক্তমঞ্চে নাটক চলাকালীন পায়ে বিঁধল পেরেক,তবুও অভিনয় থামালেন না বিজন ভট্টাচার্য

১৯৬২ সালে বানালেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘সিজর্স’ ও ১৯৬৩ সালে ডকুমেন্টরী ‘ওস্তাদ আলাউদ্দীন খান’। এই সময় ‘বগলার বঙ্গদর্শন’ নামে একটি সিনেমার কাজ শুরু করলেও আর শেষ করতে পারেননি | এইসময় থেকেই মদের নেশা গ্রাস করল ঋত্বিক ঘটককে | ধীরে ধীরে নিজেকে আলাদা করে নিলেন | পুনের ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন ঋত্বিক, দু’বছর কাজ করেছেন সেখানে | ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার মণি কাউল,কুমার সাহানি এবং প্রসিদ্ধ আলোকচিত্রী কে কে মহাজন তাঁরই ছাত্র।শিক্ষকতা সম্পর্কে একবার ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন ‘আমি মনে করি,আমার জীবনে যে সামান্য কয়েকটি ছবি করেছি সেগুলো যদি পাল্লার একদিকে রাখা হয়,আর মাস্টারি যদি আরেক দিকে রাখা হয় তবে মাস্টারিটাই ওজনে অনেক বেশি হবে। কারণ কাশ্মীর থেকে কেরালা,মাদ্রাজ থেকে আসাম পর্যন্ত সর্বত্র আমার ছাত্র-ছাত্রীরা আজকে ছড়িয়ে গেছে। তাদের জন্য আমি যে সামান্য অবদান রাখতে পেরেছি সেটা আমার নিজের সিনেমা বানানোর থেকেও বেশী গুরুপ্তপূর্ণ’।

আরো পড়ুন:  মার্কশিট কি আদৌ পরীক্ষার্থীর মেধার সার্বিক মূল্যায়ন করে ?স্বামীজীর প্রাপ্ত নম্বর কেমন ছিল?

১৯৭৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী মাত্র ৫১ বছর বয়সে প্রয়াত হন ঋত্বিক | ঋত্বিককে বাঙালি প্রাপ্য সম্মাণ দেয়নি। সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়ে থাকা ঋত্বিককে বাঙালি বুঝে উঠতে পারেনি | কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের সৃষ্টি আজও ভাবায় বাঙালিকে | বলে “ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো….” | সত্যজিৎ রায় এই জন্যেই বলেছিলেন,”ঋত্বিক মনেপ্রাণে বাঙালি পরিচালক ছিল, বাঙালি শিল্পী ছিল– আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি। আমার কাছে সেইটেই তার সবচেয়ে বড়ো পরিচয় এবং সেইটেই তার সবচেয়ে মূল্যবান এবং লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।”

তথ্য : রোর,বিকাশপিডিয়া

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।