“সম্মান দিতেই হলে কলকাতায় নাট্যশালা বানাক সরকার” পদ্মবিভূষণ প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন শিশির ভাদুড়ী

“সম্মান দিতেই হলে কলকাতায় নাট্যশালা বানাক সরকার” পদ্মবিভূষণ প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন শিশির ভাদুড়ী

১৯৫৯ সাল | নাট্যকার হিসেবে তার অবদানের জন্যে ভারত সরকার পদ্মবিভূষণ প্রাপকদের তালিকায় তার নাম ঘোষণা করে | কিন্তু খবর শোনার পরেই তিনি বললেন এই সম্মান তিনি গ্রহণ করতে পারবেন না, যদি সত্যি তাকে সরকার সম্মান দিতে চায় তাহলে কলকাতায় নাট্যশালা বানিয়ে দিক | তিনি মনে করতেন যদি এই পুরস্কার তিনি গ্রহণ করেন তাহলে শিল্পী মহলে একটি মিথ্যা বার্তা যাবে যে সরকার নাট্যশিল্পী ও মানবজীবনে নাটকের গুরুত্ব নিয়ে খুব সচেতন | পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে সরকারকে লিখেছিলেন “I have a personal reason, besides the one of principle, for not wishing to be conferred the honour. By accepting this I shall mislead the lovers of the theatre into believing that Government are awake of the importance of drama in the life of the nation….If the Government really wished to honour me… the cause that I have served for nearly forty years, a move befitting tribute would have been the gift of a public stage to the city of calcutta. For it is too late to retrieve the theatre I have lost…” |

এমনটাই ছিলেন শিশির ভাদুড়ী | পুরস্কারের মোহে শিল্পীসত্তাকে হারিয়ে যেতে দেননি | আজ আমরা নাট্যমঞ্চ বলতে যা বুঝি সেটা ছিল শিশির ভাদুড়ীর অবদান | তিনি যখন নাটকে আসেন তখন সেট বা মঞ্চসজ্জা, আলোর ব্যবহার কিছুই ছিল না | শিশির ভাদুড়ী নাট্যমঞ্চে নিয়ে এলেন ত্রিমাত্রিক সেট, আলোর ব্যবহার | বাংলা নাটককে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বহির্বিশ্বে | ১৯৩০ সালে নিউ ইয়র্কের ভ্যান্ডারবিল্ট থিয়েটারে নেমেছিল ‘সীতা’। সেটাই ছিল আমেরিকার মাটিতে প্রথম বাংলা নাটক | কলকাতায় বহুবার মঞ্চস্থ হয়েছে “সীতা” | নাটক দেখে মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন ‘‘সীতা নাটক নিয়ে কিচ্ছু বলার নেই। কিন্তু শি‌শিরের প্রয়োগনৈপুণ্যে আমার শ্রদ্ধা এল।’’

শিশির ভাদুড়ী

দেশের প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা | নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে নিজের আদর্শ মানতেন | তার ঘরে শুধু একটিই ছবি ছিল – সেটা ছিল নেতাজীর | নেতাজীর অন্তর্ধানের পর প্রত্যেক বছর ২৩ শে জানুয়ারিতে যত শো করেছেন, প্রত্যেক বার প্রথমে নেতাজীকে মালা পড়িয়েছেন, তারপর তাকে নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন, তারপর শুরু করতেন সেদিনের নাটক | তার একটি বিখ্যাত প্রযোজনা ছিল ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের লেখা ‘রঘুবীর’ নাটক | ১৯৫১ সালের ২৬ জানুয়ারি ‘শ্রীরঙ্গম’-এই নাটকে অভিনয়ের আগে তিনি দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,”১৯১২ সালে রঘুবীর নাটক রচিত হয়৷ কল্পনা করুন তখনকার দেশ সময়৷ তখন দেশে চলেছে ভীষণ রেভোলিউশন- ক্ষুদিরাম প্রমুখরা তখন ভীষণ বিপ্লবী- বোমা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন | রঘুবীর নাটক হচ্ছে এই দেশাত্মবোধের অনুভূতি নিয়ে লেখা প্রথম জাতীয় নাটক |”

আরো পড়ুন:  উদ্যত বন্দুকের সামনে প্রৌঢ় অধ্যাপক বলেছিলেন, Good sence! জবাবে ছুটে এল একঝাঁক বুলেট

শিশির ভাদুড়ীর জন্ম ১৮৮৯ সালের ২রা অক্টোবর হাওড়া জেলার রামরাজাতলায় | কিন্তু তাদের আদি বাড়ি ছিল রাজশাহী জেলার নাটোরে | তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ একজন চলে আসেন হাওড়ায় এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন | তাদের আসল পদবি ছিল ‘খাঁ ভাদুড়ী’। কিন্তু শিশির ভাদুড়ীর পিতা হরিদাস ভাদুড়ী খাঁ বাদ দিয়ে লিখতে লাগলেন শুধুই ‘ভাদুড়ী’। হরিদাস ভাদুড়ীর বিবাহ হয় মেদিনীপুরের কৃষ্ণকিশোর আচার্যের প্রথম সন্তান কমলকামিনী দেবীর সঙ্গে | তাদেরই সন্তান ছিলেন শিশির ভাদুড়ী | কমলকামিনী দেবীর ছিল থিয়েটারের শখ | তা দেখেই ছোটবেলা থেকেই শিশির ভাদুড়ীর থিয়েটার প্রীতি | ১৯০৫ সালে বঙ্গবাসী স্কুল থেকে এন্ট্রাস পাশ করেন শিশির ভাদুড়ী | এরপর স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বি এ পাশ করেন ১৯১০ সালে | ১৯১৩ সালে এম এ পাস করেন ইংরেজি সাহিত্যে | অধ্যাপনা শুরু করেন মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন এবং পরে বিদ্যাসাগর কলেজে |কিন্তু ওই সময় থেকেই অধ্যাপনা করার পাশাপাশি করতেন থিয়েটার | অভিনয় করেছিলেন কয়েকটি ইংরেজি ও বাংলা নাটকে | প্রথম অভিনয় করেছিলেন ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট মঞ্চে | এরপর ১৯২১ সালে অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে তিনি পেশাদার অভিনেতা হিসেবে যোগ দেন ম্যাডান থিয়েটারে | আলমগীর নাটকে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করে সকলের নজর কাড়েন । কিন্তু ম্যাডান থিয়েটারের পরিচালনসমিতির সঙ্গে মতানৈক্য ঘটায় মঞ্চ ছেড়ে তিনি যোগ দেন চলচ্চিত্র্রে | ১৯২৩ সালে আবার ফিরে আসেন নাটকের দুনিয়ায় | দ্বিজেন্দ্রলালের সীতা নাটকে রামচন্দ্রের ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেন | ওই অভিনয় দেখার পর রসরাজ অমৃতলাল বসু তাঁকে থিয়েটারের নবযুগের প্রবর্তক বলে ঘোষণা করেন | এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি | একের পর এক উল্লেখযোগ্য চরিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি | তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চরিত্রগুলি হলো: রঘুপতি ও জয়সিংহ (বিসর্জন, ১৯২৬), যোগেশ (প্রফুল্ল, ১৯২৭), জীবানন্দ (ষোড়শী, ১৯২৭), নাদির শাহ (দিগ্বিজয়ী, ১৯২৮), নিমচাঁদ (সধবার একাদশী, ১৯২৮) এবং চন্দ্রবাবু (চিরকুমার সভা, ১৯২৯)। ১৯৩০ সালে তিনি স্টার থিয়েটারে যোগ দেন। ১৯৪২ সালে তিনি শ্রীরঙ্গম প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে যা বিশ্বরূপা থিয়েটার নামে পরিচিত। শ্রীরঙ্গমেই তিনি তাঁর জীবনের সর্বশেষ অভিনয় করেন।

শিশির ভাদুড়ী

বই পড়া ছিল তার খুব প্রিয় | বাড়িতে ছিল লাইব্রেরি | রাত জেগে পড়াশোনা করতেন | নিরামিষ খেতেই ভালোবাসতেন | শুক্তো ছিল খুব প্রিয় | সিমলে পাড়ার বিখ্যাত দোকান থেকে নিয়মিত গোলাপি প্যাঁড়া প্রায়ই খেতেন | ভালোবাসতেন ফল, দুধ, সন্দেশ |

আরো পড়ুন:  পরিত্যক্ত জিনিস থেকে ঘর সাজানোর রকমারি সামগ্রী,নিউটাউনে চালু হল ‘জিরো ওয়েস্ট স্টোর’

১৯৫৯ সালের ৩০ জুন বরানগরের নিজ বাসভবনে ৭০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যু এক যুগের অবসান |

-অভীক মণ্ডল

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।