অরণ্যের অধিকার রক্ষায় আদিবাসী মানুষের মুখে প্রতিবাদের ভাষা এনে দিয়েছেন ডাক্তার বিনায়ক সেন

অরণ্যের অধিকার রক্ষায় আদিবাসী মানুষের মুখে প্রতিবাদের ভাষা এনে দিয়েছেন ডাক্তার বিনায়ক সেন

বছর চারেক আগের কথা, কল্যাণী গিয়েছিলাম একটা ঘরোয়া নিমন্ত্রণে। গৃহকর্তা আমাদের পেপার ইন্ডাস্ট্রির প্রাক্তনী, ভালোই নামডাক ছিল এককালে। সেখানেই দেখা স্মিতভাষী ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন এই মানুষটির । খুব পরিচিত মুখ অথচ কিছুতেই চিনে উঠতে পারছিলাম না । আমার প্রশ্নের উত্তরে নিজেকে সামান্য একজন বলে এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। এরমধ্যে কেউ একজন ওনাকে ডক্টর বলে সম্বোধন করতেই এক ঝটকায় কল্যানী থেকে পৌঁছে গেলাম ছত্তীশগড়ের ঊষর প্রান্তরে….দল্লি রাজহরার খনি অঞ্চল।

১৯৫০ সালে জন্ম এই মানুষটির পড়াশোনা ক্যালকাটা বয়েজ স্কুলে। সেখান থেকে পাশ করে চলে যান ভেলোর। ক্রিশ্চিয়ান মেডিক্যাল কলেজ থেকে প্রথমে এমবিবিএস ও পরে স্বর্ণপদক নিয়ে MD করেন। ডাক্তারি শুরু করলেন দিল্লিতে কিন্তু দু’বছর যেতেই হাঁফিয়ে উঠলেন‌ একঘেয়ে জীবনে।ডাক্তারি করে শুধু অর্থোপার্জন ছেড়ে কিছু একটা করার তাগিদে ২০০০ সাল নাগাদ চলে এলেন ছত্তীশগড়ের খনি এলাকায়। রাজ্যের প্রত্যন্ত আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে দরিদ্র মানুষের কাছে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকারি ডাক্তার হয়ে কাজ শুরু করলেন। আর তখনই তার নজরে এল নকশাল দমনের অজুহাতে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘণ।

আরো পড়ুন:  মাত্র ৭০০ টাকা পুঁজি নিয়ে প্রফুল্লচন্দ্র রায় চালু করেছিলেন ওষুধ তৈরীর প্রথম ভারতীয় কোম্পানী

ততদিনে স্থানীয় আদিবাসীদের কাছে তিনি হয়ে উঠছেন দেবতা। আদিবাসিদের জন্যে হাসপাতালে দিনরাত কাজ করেন। তাদের উন্নত কৃষিকাজ শেখান। শেখালেন কি করে প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে হয়। রাষ্ট্রসংঘ অব্দি তাঁর এই কাজকে ‘মডেল’ রূপ দিতে চেয়েছে। পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেছে বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা।

মুক্ত অর্থনীতির ঢেউ যখন এদেশেও লাগল, তখন খনিজ সমৃদ্ধ ছত্তিশগড়ে আসতে চাইল অসংখ্য মাইনিং কোম্পানী। বন ধ্বংশ করে তৈরী হবে খনি। দীর্ঘদিন ধরে ওখানে বসবাসকারী আদিবাসীদের না আছে জমির দলিল, না ওরা জানে আইন আদালত। ফলে গুন্ডা এবং পুলিশ দিয়ে আদিবাসী উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে ছত্তীশগড় সরকার। সরকারী মদতে মাওবাদী ধ্বংশ করার নামে তৈরী হয় একটা গুন্ডা বাহিনী, যার নাম সালুয়া জুড়ুম। আসল উদ্দেশ্য কিন্তু আদিবাসীদের তাড়িয়ে ওখানে খনি তৈরী করার পথ প্রশস্ত করা। এই ডাক্তার তার স্ত্রীকে নিয়ে রুখে দাঁড়ালেন। নকশাল আন্দোলনের মোকাবেলা করার জন্য তিনি সরকারকে বারবার প্রস্তাব দিতে লাগলেন তাদের সাথে আলোচনার টেবিলে বসার। ব্যাস হয়ে গেলেন তিনি গণশত্রু!

আরো পড়ুন:  পেটের টানে চায়ের দোকানে কাপপ্লেট ধোঁয়ার কাজ করতেন,তিনিই হয়ে উঠলেন ভারতবর্ষে মাইমের পুরোধা

সাজানো হলো এক চিত্রনাট্য। মাওবাদী নেতা নারায়ন সান্যাল তখন জেলবন্দী। অসুস্থতার জন্য সরকার ওনাকেই নির্দেশ দিয়েছিল ডাক্তার হিসেবে জেলে গিয়ে মাঝেমধ্যে তাঁকে দেখে আসতে। ২০০৭ সালের মে মাসে হঠাৎ একদিন ভোররাতে পুলিশ ডাক্তারকে তাঁর কোয়ার্টার থেকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ, তিনি নাকি জেলবন্দী ঐ নকশাল নেতার কিছু নির্দেশ তার দলের লোকজন দের হাতে পৌঁছে দিয়েছেন। শুধু তাই নয় তার ঘর থেকে নাকি মাও লেনিনের প্রচুর বই পাওয়া গেছে! ভয়ঙ্কর এই অপরাধের জন্য নিম্ন আদালত থেকে হাইকোর্ট, সবাই তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে। অবশেষে দু’বছর পর ২০০৯ সালের মে মাসে সুপ্রীম কোর্ট থেকে জামিন পান। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে তাঁর এই বন্দীদশা কে “প্রিজনার অফ কনসায়েন্স” বলে উল্লেখ করে অবিলম্বে তাঁকে মুক্তি দিতে বলে। লন্ডনে হাউস অব কমন্সে অব্দি আলোচনা হয় অবৈধ ভাবে তাঁকে বন্দী করার জন্য।

২০১০ সালে রায়পুর দায়রা আদালতে এই কেসের রায় ঘোষণা করা হয় এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধের জন্য তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। যদিও সুপ্রীম কোর্ট ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর জামিন মঞ্জুর করে বলেন এই অভিযোগের স্বপক্ষে রাজ্য সরকার তেমন কিছু সাক্ষ্য প্রমাণ পেশ করতে পারেন নি। একধাপ এগিয়ে প্রাক্তন আটর্নি জেনারেল সোলি সোরাবজি বলছেন, এই রায় তামাশা। বিচার ব্যাবস্থার প্রতি অপমান এবং ভারতের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর আক্রমন ! মামলা এখনো চলছে।

আরো পড়ুন:  মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে আয়োজন করেছিলেন 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'

ইতিমধ্যে ডাক্তারবাবু স্ত্রী ইলিনাকে কে নিয়ে ঐ খনি অঞ্চলে গড়ে তুলেছেন ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চা শহীদ হাসপাতাল, যার পরিচালনা করেন খনি শ্রমিকরাই। গড়েছেন জনস্বাস্থ্য সংযোগ নামে এক ভ্রাম্যমান পরিষেবা কেন্দ্র, যারা শ্রমিক মহল্লায় ঘুরে ঘুরে ওষুধ ও স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ দেয়। শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে তাঁর লেখা প্রবন্ধ সমাদৃত হয়েছে দেশ বিদেশের বহু নামকরা পত্র পত্রিকায়। আমন্ত্রিত অধ্যাপক হিসেবে অধ্যাপনাও করেছেন দিল্লির জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে।

মোটেই আসতে চাননা প্রচারের আলোয়……. ডাক্তার বিনায়ক সেন, প্রতিবাদের আরেক নাম।

-স্বপন সেন

Avik mondal

Avik mondal

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।