তপন সিংহর ছবিতে ডেট না পেয়ে মামলা করলেন মহানায়ক উত্তমকুমার

তপন সিংহর ছবিতে ডেট না পেয়ে মামলা করলেন মহানায়ক উত্তমকুমার

কাজের বিষয়ে বেশ খুঁতখুঁতেই ছিলেন তপন সিংহ৷”ঝিন্দের বন্দি”পরিচালনা করার সময় তার নির্দেশে ঘোড়ায় চড়ার অভ্যাস করতে হয়েছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মত বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতাকে৷আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগের কথা৷মাঝখানে দীর্ঘ বিরতি, পরে “আতঙ্ক” ছবি করার সময় তপন সিনহা বলেছিলেন ‘‘ও যে নিজেকে কতটা পরিণত করেছে, জানাই ছিল না আমার। টের পেলাম ‘আতঙ্ক’ করতে গিয়ে।…সঞ্জীবকুমার যেমন ধরনের অভিনেতা, সৌমিত্র ঠিক তেমনই। কিংবা তার চেয়ে বেশি বলে আমার মনে হয়।’’সত্যজিৎ থেকে তপন সিংহ কোনও কঠিন চরিত্রর কথা ভেবেছেন, খোঁজ পড়েছে সৌমিত্রের, যিনি সর্বাধিক অভিব্যক্তিতে রক্তমাংস এনে দিতে পারেন সেই চরিত্রে৷

“হুইলচেয়ার” করার সময় সেই সৌমিত্রর মত অভিনেতাকে তপন সিংহ বলেছিলেন “তোমাকে অন্তত এক মাস হুইল চেয়ারে বসে ঘুরে বেড়ানো রপ্ত করতে হবে”৷এক শারীরিক প্রতিবন্ধী ডাক্তারের চরিত্র তুলতে কয়েক মাস ধরে হুইল চেয়ারে চলাফেরা রপ্ত করেন সৌমিত্র। প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসালয়ে গিয়ে দিনের পর দিন লক্ষ করেছেন ডাক্তার-রোগীর সম্পর্ক, চিকিৎসকের মানসিক অবস্থার সূক্ষ্ম রকমফের।বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমারকে দাওয়াই দিলেন তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা যেন একটা করে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন৷সেই পরামর্শ উপেক্ষা করেননি বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমার৷

কিন্তু সেই অন্তরঙ্গতা সম্পর্কে চিড় ধরেছিল “বাঞ্ছারামের বাগান” সিনেমায়৷উত্তমকুমার এমন চ্যালেঞ্জিং চরিত্র পেয়ে খুশি হয়েছিলেন,কিন্তু তালটা কাটল,শুনুন সেই কথা ছবির পরিচালক তপন সিংহর মুখে৷‘‘হঠাৎ ডেট বদলাতে চাইল উত্তম। বম্বেতে কী একটা হিন্দি ছবির কথা চলছিল। ওই ছবির জন্য আমাকে দেওয়া ডেটগুলোর দরকার হয়ে পড়ল ! পরের মাসে শ্যুটিং করতে চাইল …ওকে বললাম, হতে পারে অন্যরা ছোট আর্টিস্ট। কিন্তু তাঁদেরও তো একটা সম্মান আছে। পরের মাসে শ্যুটিং করা যাবে না। তুমি বরং ছবিটা ছেড়ে দাও।’’ তারপর সেই সম্পর্কে কেবল শীতলতা ৷ দীপঙ্কর দে আসলেন উত্তমকুমারের জায়গায়৷ শ্যুটিং শেষে কলকাতায় ফিরে তপন সিনহা শুনলেন সুপ্রিয়া চৌধুরী মামলা করেছেন।যদিও মামলায় হেরে গিয়েছিলেন উত্তমকুমার৷

আরো পড়ুন:  ২০২০ সালের বিশ্বের সেরা ৫০ চিন্তাবিদের তালিকায় জায়গা দখল করে নিলেন এই বঙ্গকন্যা

ভারতীয় তথা বাংলা চলচ্চিত্রে অমর হয়েই থাকবেন তপন সিংহ৷ সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালির রুচির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অসাধারন সব সিনেমা তিনি উপহার দিয়েছেন ।দর্শক,বিদগ্ধ মহল,চলচ্চিত্র সমালোচকরা মুক্তকণ্ঠে তার প্রশংসা করেছেন তাঁর সিনেমার । তার বড় কৃতিত্ব বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের গল্প সেলুলয়েডে পর্দায় ধরে রেখেও অটুট রেখেছিলেন সাহিত্য রস,আবার সেই সিনেমা দেখে একইভাবে মুগ্ধ হয়েছেন দর্শক৷সাহিত্যিকদের তালিকায় কে নেই, রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর, বনফুল, সমরেশ বসু, রমাপদ চৌধুরী, শংকরের মত দিকপালরা ছিলেন সেই তালিকায়৷১৯২৪ সালের ২ অক্টোবর বীরভূম জেলার মুরারই থানার জাজিগ্রামের সিংহ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তপন সিংহ, কারো কাছে তিনি আবার তপন সিনহা৷পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী,বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতোকত্তর করার পর তিনি ১৯৪৬ সালে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে সহকারী শব্দগ্রহণকারী হিসাবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন৷তপন সিনহার প্রথম ছবি “অঙ্কুশ”৷ কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিয়ে “কাবুলিওয়ালা” রাতারাতি সিনেমাপ্রেমীদের মন জিতে নিল৷পরিচালক তপন সিংহর নামে ধন্য ধন্য করছেন সকলে।

আরো পড়ুন:  চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য ভারত সরকার কিছু করছে না,পদ্মশ্রী পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

এদিকে স্বয়ং সত্যজিত রায় ছবির একটা বিষয়ে বেশ ক্ষুব্ধ !
হঠাৎ সত্যজিতের ফোন তপন সিংহকে, অসহায়তার কথা কবুল করলেন তিনি।ঘটনাটা আসলে কি ছিল !
সিনেমার প্রধান চরিত্র ছবি বিশ্বাস স্পিরিট গাম দিয়ে দাড়ি লাগাতে দিতেন না। ফলে কাবুলিওয়ালার দাড়িটি নিয়ে আপত্তি ছিল সত্যজিৎ রায়ের৷
বার্লিন ফেস্টিভ্যালে এক বিদেশি সাংবাদিক পরিচালকের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, ‘‘অভিনয়টি এতই ভাল যে, আপনাকে উনি ওঁর দাড়ির ব্যাপারটা ভুলিয়ে ছেড়েছেন।’’ সুহৃদ সত্যজিৎ বলেছিলেন কাজের স্বার্থে তিনি যেন কোনও কমপ্রোমাইজ না করেন৷

কাবুলিওয়ালা সিনেমাটি শ্রেষ্ঠ জাতীয় ছবির পুরস্কার পায়,তেমনই পায় বাংলা ভাষায় সেরা ছবির শিরোপা৷সপ্তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জিতে নেয় সিলভার বিয়ার এক্সট্রা অর্ডিনারি প্রাইজ অফ দ্য জুড়ি৷পরিচালক তপন সিংহ অভিনেত্রী অরুন্ধতী দেবীর সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন৷ মনোজ মিত্রের লেখা নাটক “সাজানো বাগান” -অবলম্বনে তপন সিংহর “বাঞ্ছারামের বাগান” শুধুমাত্র এই ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য সিনেমাপ্রেমী মানুষ কখনও ভুলতে পারবেন না মনোজ মিত্রকে৷বাংলা চলচ্চিত্রের শক্তিশালী অভিনেতা রবি ঘোষের জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল তপন সিনহার “গল্প হলেও সত্যি”তে অভিনয়ের পর। ছবিতে এক চাকরের ভূমিকায় অভিনয় করলেও অসমান্য অভিনয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মূল চরিত্র।

আরো পড়ুন:  ইউরোপে সত্তর হাজার ভারতীয় প্রাণ দিয়েছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে,প্রথম কিন্তু একজন বাঙালি

সামাজিক অবক্ষয়,একজন নারী আর ধর্ষন নিয়ে তপন সিংহের অনবদ্য ছবি “আদালত ও একটি মেয়ে”৷ছবির মুখ্য চরিত্রে তনুজার অভিনয় কি কখনও ভোলা যাবে ! ছবিটি শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে৷”এক ডক্টর কি মউত” পরিচালক তপন সিংহের আর এক অনবদ্য সৃষ্টি৷সিনেমা নিয়ে কাটিয়েছেন জীবনের প্রায় ষাটটি বসন্ত৷ “অঙ্কুশ” থেকে “আনোখা মতি” বাংলা হিন্দি সহ বিয়াল্লিশটি ছবি অথচ বানিজ্যিক ভাবে অসফল এমন ছবি নেই ! শুধুমাত্র বানিজ্যিক সফলতা পরিচালক তপন সিংহর ইউএসপি ভাবলে ভুল হবে৷বরং চলচ্চিত্র বোদ্ধারা তার সিনেমা নির্মাণের মুন্সিয়ানা কিংবা শিল্পবোধকে সর্বদা সম্মান করেছেন,শ্রদ্ধা করেছেন৷ যিনি নিজে ৪২টি সফল ছবি পরিচালনা করেছেন তাকে কি এভাবে চেনানো যায় ! নাকি সম্ভব ! তপন সিনহা দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার বিজয়ী পরিচালক,বাঙালির গর্ব৷স্বীকার করতে দ্বিধা নেই তপন সিংহ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক,যার নাম সত্যজিৎ রায়,মৃণাল সেন,ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গেই উচ্চারিত হয়৷

-অরুনাভ সেন
তথ্যঋণ-আনন্দবাজার পত্রিকা (দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়)

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।