দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটক দেখে রাগে মঞ্চে জুতো ছুঁড়ে মেরেছিলেন বিদ্যাসাগর

দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটক দেখে রাগে মঞ্চে জুতো ছুঁড়ে মেরেছিলেন বিদ্যাসাগর

১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে কলকাতায় শুরু হয় ন্যাশনাল থিয়েটার | ন্যাশনাল থিয়েটারের উদ্বোধন উপলক্ষ্যে সেদিন আমন্ত্রিত ছিলেন বাংলার বহু বিশিষ্ট মানুষ | উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় | সেইদিন অভিনীত হয় একটি নাটক | নাম নীলদর্পণ | এই নাটকের মূল উপজীব্য বিষয় হল বাঙালি নীলচাষীদের প্রতি নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচারের কাহিনী। নাটকে দেখানো হয়েছে কিভাবে সম্পন্ন কৃষক গোলকমাধবের পরিবার নীলকর অত্যাচারে ধ্বংস হয়ে গেল এবং সাধুচরণের কন্যা ক্ষেত্রমণির মৃত্যু হল | নীলকর সাহেবের উড-এর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি | তার অভিনয় দেখে রাগের চোটে মঞ্চে জুতো ছুড়ে মারেন বিদ্যাসাগর | সেই জুতো মাথায় তুলে নেন স্বনামধন্য অভিনেতা |

কিন্তু কে লিখেছিলেন নীলদর্পণ?
নাটকটি লিখেছিলেন এক পোস্টমাস্টার | নাম দীনবন্ধু মিত্র | উনিশ শতকের প্রথম ভাগে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের ফলে সেখানকার বস্ত্র-শিল্পে নীলের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছি। এই চাহিদা যোগান দেওয়ার জন্যে ইংরেজরা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে চাষীদের নীলচাষ করতে বাধ্য করে | নীল ছাড়া অন্য কোনো শস্য উৎপাদন করা যাবে না বলে নির্দেশ দেয় ব্রিটিশরা | চাষের পর নীল ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিতে হবে বলে কৃষকদের চুক্তিপত্রে টিপ সই করতে হত আর চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করলে চাষির ওপর চালানো হতো অকথ্য অত্যাচার। যেসব চাষী নীল চাষ করতে চাইত না তাদের বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালানো হত | গৃহ-বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হত। ভয়ে সেইসব কৃষকরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেলে তাদের ছেড়ে জায়গায় শুরু হত নীলচাষ | অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নীল চাষের বিরুদ্ধে চাষীরা ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে এবং ১৮৫৮ সালে নীল বিদ্রোহের সুত্রপাত ঘটে।

আরো পড়ুন:  ছোটবেলায় খালি পায়ে চার মাইল হেঁটে স্কুলে যাতায়াত করতেন বিজ্ঞানী মণি ভৌমিক

দীনবন্ধু মিত্র পোস্টমাস্টার হওয়ার সুবাদে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে চাকরি করেছেন | খুব কাছ থেকে দেখেছেন নীল চাষীদের উপর ব্রিটিশদের অত্যাচার | সেই অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করেই লিখেছিলেন ‘নীলদর্পণ’ | নীল বিদ্রোহ শুরু হওয়ার ঠিক দুই বছর পরে প্রকাশিত হল নীলদর্পণ | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পরবর্তীকালে এই নাটকের সঙ্গে হ্যারিয়েট স্টো-এর আঙ্কল টমস্‌ কেবিন গ্রন্থের তুলনা করেছিলেন।

এইসময় ঠাকুরপুরে একটা বাংলা স্কুল চলাতেন রেভারেন্ড জেমস লং | তিনি ছিলেন ভাষাবিদ | বাংলা সাহিত্য নিয়েও তার গভীর আগ্রহ ছিল | ১৮৬১ সালে দীনবন্ধুর কাছ থেকে নীল দর্পণের একটি কপি পান তিনি। এটি পড়ে মুগ্ধ হন তিনি | কিন্তু তার পক্ষে এটিকে পুরোপুরিভাবে ইংরেজিতে অনুবাদ করা সম্ভব হচ্ছিল না | তিনি সাহায্য নেন এক নেটিভ অনুবাদকের | এরপর সেই ইংরেজি অনুবাদ তিনি পাঠিয়ে দেন প্রকাশক হেনরি ম্যানুয়েলের কাছে | তিনি সেই বই প্রকাশ করেন | বইগুলো হাতে পাবার পরে পাদ্রি লং সেগুলোকে বিভিন্ন গণ্যমান্য ইউরোপীয়দের কাছে ডাকযোগে পাঠানো শুরু করেন। ইওরোপে বিশাল জনপ্রিয়তা পায় বইটি | সমসাময়িক আর কোনও বাংলা সাহিত্য এত জনপ্রিয় হয়নি | ক্ষুব্ধ হয় নীলকর সাহেবেরা | তারা আদালতে মামলা করে | অনুবাদক এবং প্রকাশককে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হল। জেমস লং কিন্তু বইতে অনুবাদকের নাম দেননি | তাই প্রকাশক হেনরি ম্যানুয়েলকে আদালতে তোলা হল। তিনি জানালেন যে, পাদ্রি লং এর কাছ থেকে টাকা পেয়েই তিনি এই বইটি প্রকাশ করেছেন। এরপর মামলা সরে গেল পাদ্রি লং-এর দিকে। দোষী সাব্যস্ত হলেন তিনি | কিন্তু তবুও তিনি বললেন না সেই নেটিভ অনুবাদকের নাম | একমাসের কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয় তাঁকে। যদিও ঘটনাস্থলে সম্পূর্ণ জরিমানা দিয়ে দেন বাংলা নবজাগরণের অন্যতম মুখ‚ কালীপ্রসন্ন সিংহ | জেমস লং না বললেও ইংরেজরা ঠিকই ধরে ফেলেছিল সেই নেটিভ অনুবাদককে। বাংলা এবং ইংরেজিতে ওইরকম তুখোড় দখল তখন বাংলায় মাত্র একজনেরই ছিল। নীলদর্পণের সেই অজ্ঞাতনামা নেটিভ অনুবাদক ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

আরো পড়ুন:  অন্তর্দৃষ্টি দিয়েই সুরসাধনা করতেন তিনি,পঙ্কজকুমার মল্লিকের কথায় ''সে যুগের শ্রেষ্ঠ পুরুষ গায়ক কৃষ্ণচন্দ্র দে''

দীনবন্ধু মিত্রের জন্ম ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে ( ১০ এপ্রিল‚ মতান্তরে ১১ এপ্রিল ) তৎকালীন উত্তর ২৪ পরগণা জেলার চৌবেরিয়ায় | বাবা কালাচাঁদ মিত্র | রামায়ণের কাহিনী অনুযায়ী ছেলের নাম শখ করে রেখেছিলেন গন্ধর্বনারায়ণ | কিন্তু এই নাম পছন্দ ছিল না তার | নিজেই নিজের নাম রাখেন তিনি‚ দীনবন্ধু | দরিদ্র পরিবারে জাত দীনবন্ধুর প্রাথমিক শিক্ষা গ্রাম্য পাঠশালায়। সেখানে কিছুদিন পাঠগ্রহণের পর তার পিতা তাকে জমিদারের সেরেস্তার কাজে নিযুক্ত করে দেন। কিন্তু ১১ বছরের দীনবন্ধুর পাঠশালার পড়া শেষ হতেই বাবা কোনওরকমে গ্রামের জমিদারবাড়িতে সেরেস্তায় কাজের বন্দোবস্ত করলেন | কিন্তু কিছুতেই সে কাজে মন বসাতে পারলেন না ১১ বছরের দীনবন্ধু | পালিয়ে এলেন কাকার কাছে | কাকা নীলমণি মিত্র ছিলেন প্রথম বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার | ভর্তি হন জেমস লঙের অবৈতনিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে কলুটোলা ব্রাঞ্চ স্কুল (বর্তমানে হেয়ার স্কুল) থেকে ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে স্কুলের শেষ পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি লাভ করে হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি কলেজ) ভর্তি হন। কলেজের প্রত্যেক পরীক্ষায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনিই সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করেছিলেন। দীনবন্ধু মিত্র ১৮৫৫ সালে ১৫০টাকা বেতনে পটনায় পোস্টমাস্টার নিযুক্ত হন। ক্রমে তার পদোন্নতি হয় এবং তিনি ওড়িশা, নদিয়া ও ঢাকা বিভাগে এবং পরে কলকাতায় সুপারিনটেন্ডেন্ট পোস্টমাস্টার নিযুক্ত হন। এর কিছু বছরের মধ্যেই তিনি লিখলেন নীলদর্পণ | এই নাটকই তাকে খ্যাতি ও সম্মানের চূড়ান্ত শীর্ষে উন্নীত করে। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়, “‘নীলদর্পণ’ নাটক প্রকাশিত হলে এবং এর ইংরেজি অনুবাদ প্রচারিত হলে একদিনেই এ নাটক বাঙালিমহলে যতটা প্রশংসিত হয়েছিল, শ্বেতাঙ্গমহলে ঠিক ততটাই ঘৃণিত হয়েছিল। এই নাটক অবলম্বন করে বাঙালির স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের সূচনা, এই নাটক সম্বন্ধে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ও রায়তদের মধ্যে মৈত্রীবন্ধন স্থাপিত হয়, এর মধ্যে দিয়েই শ্বেতাঙ্গ নীলকরদের বর্বর চরিত্র উদ্ঘাটিত হয়।”

আরো পড়ুন:  ব্যাডমিন্টনে বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে চার নম্বরে উঠে এসেছিলেন মনোজ গুহ,খেলেছিলেন টমাস কাপ সেমিফাইনালে

১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় নাটক নবীন তপস্বিনী। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে তার অপর এক নাটক জামাই বারিক প্রকাশিত হয়। ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় তার সর্বশেষ নাটক কমলে কামিনী। নাটক ছাড়াও দুখানি কাব্যগ্রন্থও দীনবন্ধু রচনা করেছিলেন – দ্বাদশ কবিতা (১৮৭২) ও সুরধুনী কাব্য (প্রথম ভাগ – ১৮৭১ ও দ্বিতীয় ভাগ – ১৮৭৬) | লীলাবতী তার রচিত অপর একটি সামাজিক নাটক। তাঁর লেখা যে দুটি উপন্যাস সাড়া ফেলেছিল সেগুলি হল পোড়া মহেশ্বর এবং যমালয়ে জীবন্ত মানুষ | দ্বিতীয় রচনা নিয়ে পরে বিখ্যাত হাস্যকৌতুক ছবি তৈরি হয় | মূল ভূমিকায় ছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও বাসবী নন্দী | প্রযোজক ছিলেন বিপ্লবী অনন্ত সিংহ | হিন্দু দেব দেবীদের নিয়ে প্রহসন রচনার ধারা দীনবন্ধু মিত্রই প্রবর্তন করেছিলেন | সধবার একাদশী ও বিয়ে পাগলা বুড়ো তার সৃষ্ট দুটি উল্লেখযোগ্য প্রহসন।

মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে ১ নভেম্বর, ১৮৭৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নাটকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার দীনবন্ধু মিত্র |

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।