“নেতাজি শিখিয়েছিলেন সারা জীবন মানুষের জন্য কাজ করবে”-ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সেহগল

“নেতাজি শিখিয়েছিলেন সারা জীবন মানুষের জন্য কাজ করবে”-ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সেহগল

নেতাজি তখন তাঁর সঙ্গী আবিদ হাসানের সঙ্গে দুঃসাহসিক সাবমেরিন অভিযানের মাধ্যমে জার্মানি থেকে এশিয়ায় আসছেন | চূড়ান্ত সংকটের সেই দিনগুলিতে নেতাজী ঝাঁসি বাহিনী সম্বন্ধে আলোচনা করতেন আবিদ হাসানের সঙ্গে | স্বাধীনতার এই যুদ্ধে মেয়েদের যোগ্য স্থান দিতে হবে, এই ভাবনা তখন থেকেই তাঁর মাথায় ছিল | নেতাজি জানতেন ভারতের মেয়েরাও পারদর্শী | আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করার আগেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন | আবিদ হাসান নেতাজীর বক্তব্য লিখে রাখতেন | একদিন আলোচনা চলার সময়ে হঠাৎ সাবমেরিনটি জলের ওপর ভেসে ওঠে এবং শত্রুপক্ষের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় | বিচলিত হয়ে ওঠেন আবিদ হাসান | কিন্তু সেই সময়েও একদম শান্ত ছিলেন নেতাজি | বিপদ কেটে যাওয়ার পর সংকটের সময় ওরকম আচরণের জন্যে নেতাজি তিরস্কার করেন আবিদ হাসানকে | আবিদ হাসান সেই সময় নোট নিয়েছিলেন –“মেয়েদের হতে হবে বীরাঙ্গনা। মৃত্যু ও অসম্মানের মধ্যে ভারতীয় নারী বেছে নিয়েছে মৃত্যু। কিন্তু এখন চিতায় ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যু নয়। অস্ত্র হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। যেমন হয়েছিলেন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঘোড়ায় চড়ে তলোয়ার হাতে যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ দিয়েছিলেন তিনি। তাঁরই পুণ্য নামে হবে রানি অব ঝাঁসি রেজিমেন্ট।”

পৃথিবীর প্রথম সশস্ত্র নারী বাহিনী গঠন করেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। নেতাজি স্বাধীনতা সংগ্রামে বীরঙ্গনা ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈকে স্মরণ করে আজাদ হিন্দ বাহিনীর রেজিমেন্টের নাম দিয়েছিলেন রানী ঝাঁসি রেজিমেন্ট | জাপানিরাও এর বিরোধিতা করেছিলেন | তাঁদের আশঙ্কা ছিল, মেয়েদের হাতে অস্ত্র তুলে দিলে অস্ত্রের সদ্ব্যবহার হবে না এবং অর্থ অপচয় হবে | কিন্তু নেতাজি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় | এইসময় ডাক্তারির ছাত্রী লক্ষ্মী এগিয়ে আসেন | ১৯৪৩-এর ৯ই জুলাই নেতাজি যখন সিঙ্গাপুরে ৬০ হাজার ভারতীয়ের সমাবেশে বক্তৃতা দিচ্ছেন, ঝাঁসি বাহিনী গঠনের আহ্বান সেখানেই শোনা গেল। তিন দিন পরেই একটি সভায় লক্ষ্মী স্বামীনাথনের নেতৃত্বে ২০ জনের একটি মহিলা ইউনিট রাইফেল নিয়ে তাঁকে গার্ড অব অনার দিল। ইউনিফর্ম তখনও আসেনি। নেতাজি এই প্রথম প্রচেষ্টায় খুশি হয়েছিলেন। তবে আলাদা করে ডেকে লক্ষ্মীকে তিনি বলেছিলেন, সব দিক ভেবে কাজে হাত দিতে। এটা কিন্তু লোকদেখানো ব্যাপার নয়, বর্মার জঙ্গলে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। কবে কাজ শুরু করতে পারবে? প্রশ্নের ঝটিতি জবাব, আগামিকাল থেকে।তবু সুভাষের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন সত্যি করে ঝাঁসি বাহিনী যে গড়ে উঠল, তার পিছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ক্যাপ্টেন লক্ষ্মীর। ১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে ঝাঁসি রেজিমেন্ট পথ চলা শুরু করে, এই রেজিমেন্টের নেতৃত্বে ছিলেন লক্ষ্মী সেহগল । প্রথম প্রথম এই বাহিনীতে খুব বেশি মেয়েরা যোগ দেয়নি | সেই সময় লক্ষী সেহগল মেয়েদের সমাবেশের ব্যবস্থা করেন | সেখানে নেতাজির বক্তৃতায় উদ্বুদ্ধ হয় নারীরা | লক্ষ্মীর ভাষায়, ‘he was cheered and applauded and women, young and old, and even those with babies in arms offered to join the regiment immediately. As the days and weeks passed the number of volunteers steadily increased.’ ১৯৪৩-এর ২২ অক্টোবর সিঙ্গাপুর ক্যাম্পের উদ্বোধন করলেন নেতাজি | ১৯৪৩ সালের ২৩ শে অক্টোবর প্রাথমিকভাবে এই মহিলাদের নিয়ে ট্রেনিং ক্যাম্প শুরু হয় সিঙ্গাপুরে । ঝাঁসি রেজিমেন্টের সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরের উদ্বোধনী ভাষণে নেতাজি বলেন : ‘Today while we are facing the gravest hour in our history I have confidence that Indian womanhood will not fail to rise to the occasion. If for the independence of Jhansi India produced a Laxmi Bai, today for the independence of whole India, India shall produce thousands of Ranis of Jhansi,’ (22nd October, 1943). নারী সৈনিকদের কাছে তাঁর অকপট বক্তব্য, ‘Today I can only offer you strenous physical work, no comfort, the barest of food and probably death, but do not fear – the fight for freedom will continue with your efforts.’

আরো পড়ুন:  কাঠগড়া থেকে লাফিয়ে জজের টেবিলে উঠেই গার্লিককে লক্ষ্য করে গুলি চালাল কানাইলাল ভট্টাচার্য

ঝাঁসি রেজিমেন্টের সকল সদস্যরা শাড়ি ছেড়ে পড়লেন খাঁকি প্যান্ট ও জামা, হাতে তুলে নিলেন অস্ত্র । এমনকি নেতাজির দেশ স্বাধীন করার আহ্বান শুনে নারীরা সাধ্যমত তুলে দিয়েছিলেন গয়না, অর্থ । যোগ দিয়েছিলেন জানকী থেভার,অঞ্জলি ভৌমিক, সরস্বতী রাজামনির মত নারীরা | নাম জানা যায়নি এমন অসংখ্য সাধারণ মেয়ের ভূমিকাও নগণ্য নয় | সিঙ্গাপুরের পর রেঙ্গুনেও ঝাঁসি রানী বাহিনীর ক্যাম্প চালু হয় | ক্যাম্পের সব সদস্যাকে একটা করে তোশক, বালিশ আর কম্বল দেওয়া হয়েছিল। কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি বিছানা | টিনের থালায় খাওয়া। শৌচাগার পরিষ্কারের দায়িত্বও নিজেদেরই।নির্দেশ ছিল চুল যেন কাঁধ না ছাড়ায় আর মঙ্গলসূত্র ছাড়া অন্য কোনও গয়না যেন কেউ না পড়ে |

সেনা ব্যারাকে দিন শুরু হত ভোর ছ’টায়। প্রথমেই পতাকা উত্তোলন,তারপর ৪৫ মিনিট ব্যায়াম। সাড়ে সাতটায় প্রাতরাশ। তার পর দু’ঘণ্টা প্যারেড। পরের দু’ঘণ্টা চান, কাপড় কাচা ইত্যাদি। দুপুরের খাওয়ার পর এক ঘণ্টা বিশ্রাম। তার পর দু’ঘণ্টা ক্লাসরুমে। আবার দু’ঘণ্টা প্রশিক্ষণ। নিয়মিত মার্চ করে আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর মহড়া হত। গেরিলা যুদ্ধের রীতিনীতি, রাত্রিকালীন যুদ্ধের নিয়ম, নার্সিং ইত্যাদি সবকিছুই শিখতে হতো মেয়েদের | সাড়ে ছ’টায় পতাকা নামানো। সাতটায় নৈশাহার। সাড়ে ন’টার মধ্যে আলো নিবিয়ে দেওয়া। রবিবার ছুটি।বাহিনীর বিভিন্ন পদ তৈরী হয়েছিল শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুসারে । দুর্গম জায়গায় পাহাড় ফাটানো,রুট মার্চ,অস্ত্র নিয়ে ট্রেনিং হত । বার্মার জঙ্গলে চলত অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ । সন্ধ্যায় বসত ইতিহাস পাঠের আসর – ভারতবর্ষের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা পড়তেন রিজিয়া সুলতান, চাঁদবিবি, ঝাঁসির রাণী, রানী ভবানীর উপাখ্যান | ১৯৪৪ সালের ২৩ শে মার্চ বাহিনীর প্রায় ৫০০ জনের বেশী সিঙ্গাপুর ট্রেনিং ক্যাম্পে রুট মার্চ করে। এর মধ্যে আবার ২০০ জন নার্সিং এর কাজে যুক্ত হয় । মেয়েদের থাকা-খাওয়া, ইউনিফর্ম, প্রশিক্ষণ পুরো কাজের ব্যবহার বহন করতেন প্রবাসী ভারতীয়রা | ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন আইএনএর দক্ষ ও অভিজ্ঞ সেনানায়কেরা | নেতাজির নির্দেশ ছিল, ‘the training given to the Ranis must be similar in every way to the other infantry units ”

ইতিহাসবিদ ভেরা হিলডেব্রান্ড সাম্প্রতিক গবেষণায় বলছেন ঝাঁসি রানী রেজিমেন্টে সাড়ে চারশোর কাছাকাছি সদস্যা ছিলেন | তবে অন্য গবেষকরা বলেছেন সংখ্যাটা ছিল হাজারের কাছাকাছি | শুধু ভারতীয় নন, মালয়ের রবার শ্রমিক পরিবারের মেয়েরাও ঝাঁসি বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন | গভীর নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলতে হত সকলকে |

আরো পড়ুন:  প্রেম নিবেদনের পর ফাঁসি হল "ফুটুদার",দীর্ঘ দশ বছর ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন কল্পনা দত্ত

নেতাজির স্বপ্ন ছিল দেশের জন্যে নারীরাও লড়াই করবে,শহীদ হবে | ঝাঁসি রানী রেজিমেন্টের এমন ৮০ জনের তালিকাও বানিয়েছিলেন তিনি যাদের কাজ হবে দেশের জন্যে শহীদ হওয়া | আইএনএ-র সিক্রেট সার্ভিসেও কিছু মেয়েকে নেওয়া হয়েছিল | আঙুল কেটে নেতাজির কপালে রক্ততিলক এঁকে দিয়েছিলেন সকলে | ঝাঁসি রানী রেজিমেন্টে প্রথম সপ্তাহে পঞ্চাশজন মহিলা যোগ দিয়েছিলেন | এরপর সংখ্যা বাড়তে থাকে | বার্ধক্য এবং শারীরিক অসুস্থতার জন্যে যেসব মহিলাকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া সম্ভব হয়নি তারা আইএনএর হাসপাতালগুলিতে সেবিকার দায়িত্ব গ্রহণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্য সংরক্ষণ, সৈনিকদের পোশাক প্রস্তুতির কাজে যোগ দেন | ২০০ জন নার্সিং এর কাজে যুক্ত হয় । এই অংশের নামকরন হয় চাঁদ বিবি নার্সিং গ্রুপ |

২৪ শে অক্টোবর ১৯১৪ সাল জন্ম নেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন | বাবা মাদ্রাজ হাইকোর্টের আইনজীবী এস স্বামীনাথন | মা সমাজকর্মী অম্মু স্বামীনাথন | ছোট থেকেই মেধাবী ছিলেন লক্ষ্মী | বড় হয়েছিলেন সাহেবি কায়দায় | মা সেই আমলে নিজে গাড়ি চালাতেন। টেনিস খেলতেন। লক্ষ্মীর বাবা একবার একটি সাহেব খুনের মামলায় অভিযুক্ত ভারতীয় ছাত্রের হয়ে মামলা লড়েছিলেন | সেই মামলা উনি জিতেছিলেন, ছাড়া পেয়ে যায় সেই ছাত্রটি | এরপর থেকেই ইংরেজদের বিরাগভাজন হন লক্ষ্মীর বাবা | লক্ষ্মীর পরিবারের লোকেরা এরপর বিলিতি জামাকাপড় পরেননি। লক্ষ্মীর মা কংগ্রেসে যোগ দেন। ১৯৩৮ সালে মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন লক্ষ্মী | এর এক বছর পর তিনি গাইনোকোলজি এবং অবস্টেট্রিক্স বিষয়ে ডিপ্লোমা করেন | এরপর চেন্নাইয়ের ত্রিপলিক্যাল এলাকায় কস্তুরবা গান্ধী সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পাইলট পি কে এন রাওয়ের সঙ্গে প্রেম এবং ১৯৪০ সালে বিবাহ হয় লক্ষ্মীর | কিন্তু সেই বিয়ে টেকেনি | এরপর লক্ষ্মী চলে যান সিঙ্গাপুরে | সিঙ্গাপুরে তিনি একজন বিশিষ্ট গাইনোকোলজিস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন | সেখানে ভারতবর্ষ থেকে আগত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সেবার লক্ষ্যে একটি ক্লিনিক স্থাপন করেন। এরপরই লোভনীয় কর্মজীবন ছেড়ে নেতাজির আহ্বানে সাড়া দিয়ে আজাদ হিন্দ বাহিনীতে যোগ দেন লক্ষ্মী | গড়ে তোলেন ঝাঁসি রানী রেজিমেন্ট |

সামরিক প্রশিক্ষণের পর রানীরা ভারত-বর্মা রণাঙ্গনে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হলেন।পাঁচশো সৈনিক পৌঁছলেন বর্মায়, আটজন তাঁদের মধ্যে কমিশনপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসার, জানকী তাঁদের অন্যতম। ১৯৪৪-এর জানুয়ারি মাসে মেইমিয়োতে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ঘটে মেয়েদের | অবিরাম বোমাবর্ষণে সিঙ্গাপুর শহর, আইএনএ শিবির ও হাসপাতাল এবং ঝাঁসি বাহিনীর শিবির ধ্বংস হয়ে গেলে মেয়েরা ট্রেঞ্চগুলিতে আশ্রয় নেন যেগুলি তাঁরা নিজেরাই খনন করেছিলেন।এর পাশাপাশি শত শত সৈনিকদের সেবাও করেছিলেন ঝাঁসি রানী বাহিনীর সদস্যারা | প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতায় ‘carpet bombing was a happy game for the Anglo-American block over civil areas.’ সব প্রতিকূলতা অগ্রাহ্য করে ঝাঁসি রানী বাহিনীর সদস্যারা আহত সৈনিকদের সেবার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন | জানকী বলেছেন, “কত তরুণ প্রাণ যে তখন জয় হিন্দ ধ্বনি উচ্চারণ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাটিতে মৃত্যুবরণ করেছে তার সঠিক তথ্য কোনোদিন উদ্ঘাটিত হবে না। এটুকু বলা যায়, তাঁদের পাশে অনলস সেবার প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ঝাঁসির মেয়েরা।”

আরো পড়ুন:  আজাদ হিন্দ সরকারের ৪৪ জন সদস্যকে আন্দামানে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করেছিল জাপানিরা,ইতিহাসের অলিখিত অধ্যায়

ঝাঁসি বাহিনী কিন্তু সামরিক অনুশীলন গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন সবসময় | ঠিক ছিল ১৯৪৫ সালের শুরুতে তারা আবার রণক্ষেত্রে যাবেন | কিন্তু জাপানের উপর পরমাণু বোমা ফেলল আমেরিকা | যুদ্ধের গতি সম্পূর্ণ পালটে গেল | ঝাঁসি বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হল তাঁদের প্রথমে রেঙ্গুন এবং রেঙ্গুন থেকে মালয়ে ফিরে যেতে হবে।কিন্তু যুদ্ধ করার বাসনায় তারা নেতাজিকে বললেন তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান | কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব ছিল না | রেঙ্গুন থেকে বর্মার সব মেয়েকে নিজের গৃহে পাঠিয়ে দেওয়া হল | নেতাজি নিজে সঙ্গে থেকে তাঁর নারী বাহিনীকে রেঙ্গুন থেকে ব্যাংকক পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিলেন।সীমান্তের গভীর অরণ্যের মধ্যে এই বিপদসঙ্কুল পদযাত্রায় মেয়েরা শত্র‍ুপক্ষের বোমাবর্ষণের সম্মুখীন হয়েছেন বারবার। জাপানিরা নেতাজীকে যে গাড়িটি দিয়েছিলেন সেটি মাত্র একশ কিলোমিটার যাওয়ার পর ভেঙে পড়ে। জাপানিদের শত অনুরোধ সত্ত্বেও এরপর তিনি গাড়িতে যেতে রাজি হননি। জাপানি জেনারেল ইসোডার সনির্বন্ধ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেছিলেন, ‘Look, my women soldiers are marching over there … I cannot leave them’ | ২৩ দিনের বেশি এই দীর্ঘ যাত্রায় দুজন সৈনিক প্রাণ হারান | লক্ষ্মী সেইসময় মেইমিয়োর আইএনএ হাসপাতাল এবং জেয়াওয়াদি হাসপাতালে কাজ করার পর শান প্রদেশের গভীর জঙ্গলে কালাওয়ের নবগঠিত হাসপাতালে চিকিৎসার দায়িত্ব নেন।

১৯৪৫ সালের মে মাসে ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হাতে কারাবরণ করেন। ১৯৪৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বার্মার কারাগারে তিনি বন্দি থাকেন। দিল্লিতে আইএনএ সদস্যদের বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন তিনি অবিভক্ত ভারতে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে লাহোরে কর্নেল প্রেম সেহগালের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন | থাকতেন কানপুরে | অবিভক্ত পাঞ্জাব থেকে আগত উদ্বাস্তুদের চিকিৎসা করতেন তিনি | সেহগাল দম্পতির দুই কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। তাঁরা হলেন সুভাষিণী আলি ও অনিশাপুরী। সুভাষিণী আলি পরবর্তীতে একজন সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিবিদ ও শ্রমিক কর্মী হয়েছিলেন।১৯৭১ সালে লক্ষ্মী সেহগাল সিপিআই(এম)-এ যোগদান করেন | রাজ্যসভায় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন | বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামেও তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। তিনি উদ্বাস্তু শিবির পরিচালনা সহ কলকাতায় বাংলাদেশি শরণার্থীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে প্রধান ভূমিকা পালন করেন | ১৯৮১ সালে সিপিআই(এম)-এর অখিল ভারতীয় জনবাদী মহিলা সমিতির নারী শাখার প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন | ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বরে ভূপালের গ্যাস দুর্ঘটনায় চিকিৎসক দলের নেতৃত্ব দেন ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সেহগল | ২০০২ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হয়েছিলেন | কিন্তু শেষমেশ রাষ্ট্রপতি হতে পারেননি | ৯২ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত তিনি কানপুরে নিয়মিতভাবে নিজের ক্লিনিকে রোগীদের চিকিৎসা করতেন। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সেহগল হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং ২৩ জুলাই সাতানব্বই বছর বয়সে কানপুরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁর দেহ কানপুর মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রয়োজনে দান করা হয়।

অকপটে বলতেন, “নেতাজি শিখিয়েছিলেন সারা জীবন মানুষের জন্য কাজ করবে।” ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ নেতাজির সান্নিধ্যে কাটানো দুটি বছর তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় এটাও বলতেন ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সহগল |

তথ্য : উইকিপিডিয়া,কালি ও কলম (মৈত্রেয়ী সেনগুপ্তর লেখা)

ছবি – ইন্ডিয়া টাইমস ও ইন্ডিয়া টুডে

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।