জীবিতাবস্থায় কারও কাছে শির অবনমিত করেননি,মৃত্যুর পর দাঁড় করিয়ে দাহ করা হয়েছিল বীরেন্দ্রনাথ শাসমলকে

জীবিতাবস্থায় কারও কাছে শির অবনমিত করেননি,মৃত্যুর পর দাঁড় করিয়ে দাহ করা হয়েছিল বীরেন্দ্রনাথ শাসমলকে

বীরেন্দ্রনাথ শাসমল তাঁর উইলে লিখেছিলেন – “জীবিতাবস্থায় আমি যে শির কাহারও নিকট অবনত করি নাই, মৃত্যুর পরেও যেন আমার সেই শির অবনমিত করা না হয়।” সেই কথাকে মাথায় রেখেই মৃত্যুর পর দাঁড় করিয়ে দাহ করা হয়েছিল বীরেন্দ্রনাথ শাসমলকে |

১৮৮১ সালে ২৬ অক্টোবর মেদিনীপুরের কাঁথি মহকুমাধীন চন্ডীভেটিতে জন্মগ্রহণ করেন বীরেন্দ্রনাথ শাসমল | সেই সময়ে মেদিনীপুরে উঠেছিল স্বদেশী আন্দোলনের ঝড় | ছাত্রাবস্থাতেই বীরেন্দ্রনাথ শাসমল স্বদেশী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন । ১৯০০ সালে কন্টাই হাইস্কুল থেকে এনট্রান্স পাস করেন | শিক্ষক তারকগোপাল ঘোষ ও শশীভূষণ চক্রবর্তীর স্বদেশপ্রেমের চিন্তাধারা তাঁকে বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিলেন।স্কুলের পর প্রথমে কলকাতা মেট্রোপলিটন কলেজে ভর্তি হন বীরেন্দ্রনাথ শাসমল | কিন্তু কিছুদিন পর রিপন কলেজে(অধুনা সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজ) যোগ দেন | এরপর উচ্চশিক্ষার জন্যে ইংল্যান্ডে যান | মিডল টেম্পল থেকে ১৯০৪ সালে ব্যারিস্টারি পাশ করে কলকাতা হাইকোর্টে যোগ দেন। এরপর তিনি মেদিনীপুর জেলা আদালতে যোগ দেন | তিনি জেলা বোর্ড ও মিউনিসিপ্যালিটির সদস্যও ছিলেন | মেদিনীপুরে ব্রিটিশ সরকার ২২৭ টি ইউনিয়ন বোর্ড তৈরী করে গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন আনতে চাইলে বীরেন্দ্রনাথ আশঙ্কা করেন যে এর ফলে প্রায় ৭ গুণ ট্যাক্স বৃদ্ধি পেতে পারে। তিনি তীব্র গণআন্দোলনের ডাক দেন। ইউনিয়ন বোর্ড বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তিনি জুতো না পড়ার প্রতিজ্ঞা করেন।তার ডাকে সাড়া দিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ ট্যাক্স বয়কট করে।ফলে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে ২২৭ টি বোর্ডই বাতিল করে দেয়।

আরো পড়ুন:  লর্ড হার্ডিঞ্জকে কেন হত্যা করতে চেয়েছিলেন রাসবিহারী বসু এবং বসন্ত বিশ্বাস?

১৯১৩ সালে পুনরায় কলকাতা প্রত্যাবর্তন করে তিনি হাইকোর্টে ওকালতি করতে থাকেন । তবে শাসমল ইতিমধ্যেই চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। নাগপুর সম্মেলন থেকে ফিরে এসে শাসমল ওকালতি ছেড়ে অসহযোগ আন্দোলনে (১৯২১) যোগ দেন। তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন।

আরো পড়ুন:  তার লিখিত বই "ফার্স্ট বুক" বাঙালিকে ইংরেজি ভাষার সঙ্গে পরিচিত করিয়েছিল

বীরেন্দ্রনাথ শাসমল মনে করতেন শিক্ষা হওয়া উচিত অবৈতনিক এবং ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই শিক্ষার সুযোগ থাকা উচিত। তিনি কাঁথিতে নিজ বাসগৃহে একটি জাতীয় স্কুল স্থাপন করেন | দেশের মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন | ১৯১৩, ১৯২৬, ১৯৩৩ সালে মেদিনীপুর বন্যায় ত্রাণ কর্মী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রিন্স অব ওয়েলস-এর ভারত সফর বয়কটকে কেন্দ্র করে বাংলার মানুষের অসন্তোষ চরমে পৌঁছে। এইসময় বীরেন্দ্রনাথ শাসমলকে গ্রেফতার করা হয় | শাসমল ১৯২৮ সালের বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির কৃষ্ণনগর অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু সভাপতির ভাষণে সন্ত্রাস ও সহিংসতার ওপর তাঁর মন্তব্যের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতির পদ থেকে শাসমলকে বাদ দেওয়ায় বেঙ্গল প্যাক্ট ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।  ১৯৩০ সালের আইন অমান্য আন্দোলনের সময় তাঁকে আবার গ্রেফতার করা হয় | মুক্তি পাওয়া মাত্রই তিনি চট্টগ্রাম আসেন অস্ত্রাগার দখল মামলায় (১৯৩০) আসামী পক্ষের উকিল হয়ে বিনা পারিশ্রমিকে মামলা লড়েন | মেদিনীপুরের জেলাশাসক ডগলাস ও বার্জ হত্যা মামলায় আবারও তিনি বিনা পারিশ্রমিকে বিপ্লবীদের উকিল হিসেবে মামলা লড়েন।

আরো পড়ুন:  তাঁর নামেই রাস্তার নাম হয়েছে "আলিমুদ্দিন স্ট্রিট",আমরা কি মনে রেখেছি বিপ্লবী সৈয়দ আলিমুদ্দিন আহমেদকে?

বীরেন্দ্রনাথ শাসমল মেদিনীপুর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সভ্য হয়েছিলেন। পন্ডিত মদনমোহন মালব্যের অনুরোধে ভারতীয় আইনসভা সদস্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন ও জয়লাভ করেন | ১৯৩৪ সালের ২৪ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। দেশের রাজনীতিতে অবদান ও সংস্কারমূলক কাজের জন্যে তাকে দেশপ্রাণ উপাধি দ্বারা সম্মানিত করা হয়।

তথ্য – উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।