বাবা বিষ দেওয়া মিষ্টি খাইয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল তাঁকে,দুনিয়া সেই মেয়েকেই চিনল “বেগম আখতার” নামে

বাবা বিষ দেওয়া মিষ্টি খাইয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল তাঁকে,দুনিয়া সেই মেয়েকেই চিনল “বেগম আখতার” নামে

অনেক পুরোনো দিনের কথা | ফৈজাবাদের এক মিশনারি স্কুলে অর্থ সাহায্য করতে এসেছেন ‘ফার্স্ট ডান্সিং গার্ল’ গহরজান | তিনি যখন স্কুল পরিদর্শন করছেন হঠাৎই তাঁর ওড়নায় টান পড়ে | গহরজান দেখলেন ছোট্ট একটি মেয়ে অবাক হয়ে দেখছে তাঁর বহুমূল্য ওড়নাটি | গহরজান মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলেন নাম কি তোমার ? মেয়েটি বলল তার নাম | গলার আওয়াজ শুনে গহরজান বুঝলেন মেয়েটি গান গায় | তিনি মেয়েটিকে বললেন,তুমি গান গাও ? মেয়েটি বলল না | এরপর গহরজান কথাতেই মেয়েটি একটি গানের কয়েক লাইন গেয়ে শুনিয়েছিলেন | গান শুনে গহরজান মেয়েটিকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, তুমি একদিন বিরাট বড় শিল্পী হবে |

ফৈজাবাদ হাইকোর্টের মুনসেফের মেয়ে মুশতারি বেগমকে বিবাহ করেছিলেন সৈয়দ ঘরানার ব্যারিস্টার অসগর হুসেন | বিয়ে করলেন ঠিকই,তবে স্বীকৃতি দিলেন না মুশতারি বেগম | লুকিয়ে গিয়েছিলেন প্রথম বিয়ের কথা | ফলে স্বামীর বাড়িতে জায়গা হল না মুশতারি বেগমের | অসগর হুসেন মুশতারি বেগমকে বলেছিলেন কিছুদিন পর নিজের বাড়িতে জায়গা দেবেন | কিন্তু সেইদিন আর আসেনি | মুশতারি বেগম থেকে যান ফৈজাবাদে | অসগর হুসেন ফিরে গিয়েছিলেন লখনউয়ে | ১৯১৪ সালের ৭ অক্টোবর মুশতারি বেগম জন্ম দেন দুই যমজ বোনের | নাম রেখেছিলেন জ়োহরা আর বিব্বী | দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে মারাত্মক দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে শুরু করেন মুশতারি বেগম | এরই মাঝে অসগর হুসেনের বাড়ি থেকে দুই যমজ বোনকে মারার জন্যে পাঠানো হল বিষ দেওয়া মিষ্টি | সেই মিষ্টি খেয়ে মারা গেল জ়োহরা | বেঁচে গেলেন বিব্বী আর তার মা | শুরু হল লড়াইয়ের জীবন | আর সেই পরিস্থিতিতেই গান গাওয়া শুরু করল বিব্বী | এরই মাঝে মুশতারি বেগমের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিল অসগর হুসেনের পরিবারের লোকজন | বিব্বীর মা বুঝলেন ফৈজাবাদে বেশিদিন থাকা সম্ভব না | ছোট্ট বিব্বীকে নিয়ে তিনি চলে এলেন গয়া | উঠলেন এক দূর সম্পর্কের ভাইয়ের বাড়িতে | সেখানে বাড়ির যাবতীয় কাজের বিনিময়ে থাকা খাবার ব্যবস্থা হল মা মেয়ের | এদিকে ছোট্ট বিব্বী স্কুল যেতে চায় না | সে পড়বে না, গান শিখবে | মা প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না | কিন্তু শেষমেশ রাজি হলেন | মেয়ের গান শেখার জন্যে ওস্তাদ রাখলেন | শুরু হল তালিম | কিন্তু এখানেও বিপত্তি | বিব্বীকে একা পেয়ে সেই ওস্তাদ নিজের হাতের পাতা বুলিয়ে দিলেন বিবির উরুতে | বিব্বী বুঝল ওই ওস্তাদের মতলব | চিৎকার করে উঠল সে | স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে উস্তাদ তার শরীরে হাত দেয় তার কাছে কিছুতেই গান শিখবে না | মুশতারি বেগম বিদায় করলেন সেই ওস্তাদকে | নতুন উস্তাদ এলেন উস্তাদ আতা মোহাম্মদ খাঁ | সেই সময় কলকাতা সঙ্গীতের অন্যতম পীঠস্থান ছিল | উস্তাদ আতা মোহাম্মদ খাঁ প্রস্তাব দিলেন কলকাতায় গেলে বিব্বী সঙ্গীতশিক্ষা ও প্রতিভাবিকাশের জন্যে অনুকূল পরিবেশ পাবে | মুশতারি বেগম মেনে নিলেন | মাত্র তেরো বছর বয়সে বিব্বী কলকাতায় এল | সঙ্গে মা আর উস্তাদ | কলকাতায় এসে গান শিখতে লাগল বিব্বী |

আরো পড়ুন:  প্রভাংশু জেলাশাসক ডগলাসের পিঠে পরপর পাঁচটি গুলি করার পর ডগলাস সেখানেই লুটিয়ে পড়লেন

একবার কলকাতায় এক চ্যারিটি শো ছিল | সেখানে গান গাইবার কথা ছিল সেই সময়কার বিখ্যাত গায়ক গায়িকাদের | সেই চ্যারিটি শো দেখতে উপস্থিত ছিলেন বিব্বী, তার মা এবং উস্তাদ | কিন্তু অনিবার্য কারণে উপস্থিত থাকতে পারলেন না অনেক গায়ক গায়িকা | উস্তাদ ছুটে গেলেন ব্যাক স্টেজে | গিয়ে উদ্যোক্তাদের অনুরোধ করলেন বিব্বীকে একটা সুযোগ দিতে | রাজি হলেন উদ্যোক্তারা | বিব্বীকে নিয়ে এলেন উস্তাদ | উদ্যোক্তারা বললেন বিব্বী নাম চলবে না | উস্তাদ বললেন ঠিক আছে, ওর নাম বিব্বী না, ওর নাম আজ থেকে আখতারি বাঈ ফৈজাবাদি | বিব্বী হয়ে গেল আখতারি | সেদিন আসর মাতিয়েছিল আখতারি | সকলে ধন্য ধন্য করেছিল |

আরো পড়ুন:  সংগ্রহে ৫২ টি দেশের নোট,ফারাক্কায় রিজুর পানের দোকান যেন মুদ্রা মিউজিয়াম

গান শুনে মুগ্ধ মেগাফোন সংস্থার বড়কর্তা জে এন ঘোষ চুক্তি করলেন আখতারির সঙ্গে | রেকর্ড করলেন আখতারি | বিনময়ে পেলেন রিপন স্ট্রিটে ফ্ল্যাট,গাড়ি | কিন্তু সেই গান হিট হল না | ঘোষবাবুর কপালে ভাঁজ | মেয়ের মাকে সোজা জানিয়ে দিলেন, আর একটা রেকর্ড বের করবেন তিনি, সেটা হিট হলে ভাল না হলে চুক্তি বাতিল | ঘোষবাবুর কাছে কয়েকটা দিন সময় চেয়ে নিলেন মুশতারি | আখতারিকে নিয়ে মুশতারি গেলেন বেরেলি | দেখা করলেন গুরু পীর আজিজ মিয়ার সঙ্গে | পীর সব শুনে আখতারিকে বললেন, ‘কলকাতায় গিয়ে যে গানটা গাইবি, সেই পাতাটা আমার সামনে খুলে ধর তো বেটি। ’ আখতারি খাতা খুলল, সেই পাতায় হাত রাখলেন পীর | বললেন, ‘শোহরত তুমহারি কদম চুমেগি, দৌলত তুমহারি বান্দি হো কর ঘুমেগি’। আর দেরি করলেন না দুজনে | ট্রেন ধরে ফিরলেন কলকাতা | আখতারি গান গাইল ‘দিওয়ানা বানানা হ্যায় তো দিওয়ানা বানা দে’। বাকিটা ইতিহাস |

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত,দাদরা ও ঠুমরি গোত্রের গানের কিংবদন্তি হয়ে উঠলেন আখতারি | দুনিয়া তাকে চেনে বেগম আখতার নামে | বাংলার সাথে তিনি হয়ে গিয়েছিলেন একাত্ম | বাঙালি কি ভুলতে পারে সেই গান – ‘জোছনা করেছে আড়ি’ ! গাইছেন বেগম আখতার, কথা ও সুর দিচ্ছেন রবি গুহ মজুমদার | সত্যজিৎ রায়ের অনুরোধে দুর্গাবাঈ-এর চরিত্রে অভিনয় করলেন বেগম আখতার | জলসাঘরে গানের আসরে দুর্গাবাঈ ধরলেন পিলু ঠুমরি – ‘ভরি ভরি আয়ি মোরি আঁখিয়া’। সুরকার উস্তাদ বিলায়েত খাঁ সাহেব।সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ চলচ্চিত্রের সেই গানের মায়াবি মাদকতায় আজও আচ্ছন্ন বাঙালি |

আরো পড়ুন:  তাঁর লেখা "আলিবাবা" নাটকের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ক্লাসিক থিয়েটার

বেগম আখতার বিয়ে করেছিলেন কাকোরির নবাব ইশতিয়াক আহমদ আব্বাসিকে | ১৯৪৪ সাল | বিয়ের পর সেভাবে গান করেননি | প্রেমের বিয়ে মেনে নিল না আব্বাসির পরিবার | আব্বাসি সাহেব তাকে নিয়ে আলাদা সংসার পাতলেন | সন্তান ধারণ করলেন বেগম আখতার | কিন্তু গর্ভপাত হল। এক বার নয়, সাত বার | ডাক্তার জানিয়ে দিলেন তার পক্ষে আর মা হওয়া সম্ভব নয় | মানসিক অবসাদ গ্রাস করল | ডাক্তার বলল বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় গান | একদিন রেডিয়ো স্টেশনে ফোন করলেন বেগম | বিস্মিত এল কে মালহোত্রা সানন্দে সম্মতি জানালেন | আবার গাইলেন বেগম আখতার | আবার তৈরী হল ইতিহাস | আবার জন্ম হল তাঁর | এত লড়াই যিনি লড়েছেন তিনি কি হারতে পারেন ! পেয়েছিলেন সঙ্গীত নাটক অকাদেমী পুরস্কার,পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ (মরণোত্তর) | ১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর প্রয়াত হয়েছিলেন মল্লিকা-ই-গজল বেগম আখতার |

-অভীক মণ্ডল
তথ্য : বাংলা নিউজ ড. মাহফুজ পারভেজ এর লেখা

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।