ফুটবলের টানে তিন বছর ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করেও ছেড়ে চলে আসেন বদ্রু বানার্জি

ফুটবলের টানে তিন বছর ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করেও ছেড়ে চলে আসেন বদ্রু বানার্জি

খাতায় কলমে গতবছরই বয়স ৯০ পেরিয়েছে। প্রিয় মোহনবাগান তাঁবুতে বেশ ধুমধাম করেই ৯০তম জন্মদিন পালন হয়েছিল। গত ৩০ জানুয়ারি ছিল ৯১তম জন্মদিন। বয়স থাবা বসিয়েছে শরীরেও। কিন্তু মোহনবাগান রত্ন বদ্রু ব্যানার্জির সঙ্গে কথা বললে কিছুতেই বয়স বোঝা যাবে না। অকালে ছেলের মৃত্যু, প্রাণাধিক প্রিয় স্ত্রীর চলে যাওয়া… বারবার ক্ষত বিক্ষত করেছে তাঁকে। কিন্তু প্রাণশক্তি কমাতে পারেনি এতটুকুও। বিশেষ করে ফুটবল নিয়ে কথা বলতে হলেই জ্বলে ওঠে চোখ দুটি। যেন তরতাজা যুবক হয়ে ফিরে যান সেই মেলবোর্ন অলিম্পিকের সময়ে।

আসল নাম সমর ব্যানার্জি। তবে ভারতীয় ফুটবল তাঁকে মনে রাখবে বদ্রু ব্যানার্জি হিসাবেই। ১৯৩০ সালের ৩০ শে জানুয়ারি হাওড়ার বালিতে বিখ্যাত ব্যানার্জি পরিবারে তাঁর জন্ম। বাড়িতে ফুটবলের একটা পরিবেশ ছিলই। পরিবারের প্রায় সকলেই ছিলেন ফুটবল অনুরাগী। দাদা রাধানাথ ব্যানার্জিও ছিলেন একজন খ্যাতিমান ফুটবলার। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ খেলার মধ্যেই একদিন আহত হয়ে তিনি মারা যান । এই ঘটনা বদ্রু ব্যানার্জিকে সাময়িকভাবে ভারাক্রান্ত করলেও দাদার স্মৃতি আকড়েই আগামীদিনে বড় ফুটবলার হওয়ার শপথ নেন। তাই তো স্রেফ ফুটবলের টানে তিন বছর আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করেও তা ছেড়ে চলে আসেন।

আরো পড়ুন:  বক্সিং গ্লাভসের সাথেই চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছিলেন "ফাদার অফ ইন্ডিয়ান বক্সিং"-পি এল রায়

কলকাতা ময়দানে বদ্রু ব্যানার্জির ফুটবলে অভিষেক মিলন সমিতি ক্লাবে। এরপর তিনি যোগ দেন বালি প্রতিভা ক্লাবে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র তখন বদ্রু ব্যানার্জি। পড়ার সাথে চুটিয়ে ফুটবল খেলছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দলেও। যোগ দিলেন বি এন আর দলে। কলকাতা লিগে বি এন আরের হয়ে অসাধারণ খেললেন তিনি। অনেকগুলি ম্যাচে তাঁর গোলেই জিতল বি এন আর। তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েই ১৯৫২ সালে লিগের পর মোহনবাগান কর্তারা সই করালেন নিজেদের দলে। সেই থেকে শুরু। ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত টানা মোহনবাগানে খেলেছেন তিনি।

আরো পড়ুন:  স্বাধীন ভারতের প্রথম মহিলা অলিম্পিয়ান তিনি,আমরা কি মনে রেখেছি নীলিমা ঘোষকে?

মোহনবাগানের অধিনায়কও হন বদ্রু ব্যানার্জি। গঙ্গাপাড়ের ক্লাবটিকে উপুড় করে দিয়েছেন। বাগানের হয়ে ৭৮ গোল করার কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর। দিয়েছেন অনেক অনেক ট্রফি। ১৯৫২ তে শিল্ডে যুগ্মজয়ীর সম্মান পান। পরের মরশুমে এককভাবে। ’৫৩ সালে বাগানের প্রথম ডুরান্ড জয়ে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে গোল ছিল তাঁর। ৫৪ সালে আবার কলকাতা ফুটবল লিগ ও শিল্ড জিতে মোহনবাগানের হয়ে ডাবল করার কৃতিত্ব অর্জন করেন। এমনকী ৫৫তে প্রথমবার রোভার্স কাপ জেতে ক্লাব তাঁর সময়েই।

তবে নিজেকে শুধু ক্লাবের গন্ডীতে আবদ্ধ রাখেননি। দেশের হয়েও তাঁর কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। ৫৬ মেলবোর্ন অলিম্পিকে ভারতীয় ফুটবল দলের নেতৃত্ব দেন বাংলার বদ্রুই। অস্ট্রেলিয়াকে ৪-‌২ গোলে হারিয়েছিলেন তাঁরা। পরে সেমিফাইনালে যুগোশ্লাভিয়ার কাছে ১-‌৪ গোলে হেরে যায় ভারত। শেষপর্যন্ত চতুর্থ হন ব্রোঞ্জ পদকের ম্যাচে বুলগেরিয়ার কাছে ০-‌৩ গোলে হারায়। বাংলার হয়ে সন্তোষেও একইরকম উজ্জ্বল তিনি। বাংলার হয়ে সন্তোষ ট্রফিতে খেলেছেন ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ অবধি। আর চ্যাম্পিয়ন হন ৫৩ ও ৫৫ সালে।

আরো পড়ুন:  ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করায় চার বছর জেল খেটেছিলেন বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ

পেয়েছেন অনেক সন্মান, ব্যক্তিগত জীবনে হারিয়েছেনও অনেক কিছু। তবে সবকিছু ছাপিয়ে ফুটবল জ্ঞান, বোধে আজও যেন তিনি যুবক। বদ্রু ব্যানার্জিরা আসলে আমাদের খেলার দুনিয়ার সোনার সময়, জীবন্ত কিংবদন্তি। তাই ৯১টা বসন্ত পার করা বদ্রু ব্যানার্জির সেঞ্চুরি বসন্তের অপেক্ষায় ফুটবল জগৎ। ভাল থাকবেন ময়দানের সবার প্রিয় বদ্রু দা।

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।