জীবনকে এড়িয়ে গোয়েন্দা গল্প লেখার চেষ্টা করেননি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

জীবনকে এড়িয়ে গোয়েন্দা গল্প লেখার চেষ্টা করেননি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

তাঁর হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যে এক সংসারী গোয়েন্দার আবির্ভাব। শাণিত মগজের সঙ্গেই প্রেমিক হৃদয়ের মিশেলে সেই মাছ-ভাত খাওয়া ছাপোষা বাঙালী সত্যসন্ধানীর মানবিক আত্মদর্শনে আপামোর বাঙালী মজে রয়েছে বছরের পর বছর। তবে গোয়েন্দা শব্দটি তাঁর ঘোরতর না-পসন্দ। ডিটেক্টিভ তো আরোই নয়। তাই সে নিজেই নিজেকে উপাধি দিয়েছে ‘সত্যান্বেষী’। দোহারা লম্বা চেহারা, তীক্ষ্ণনাসা, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ আর ক্ষুরধার অনুমানশক্তিসম্পন্ন সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী যেন তাঁর স্রষ্টারই প্রতিবিম্ব। আমরা জানি ব্যোমকেশের স্রষ্টা কে! জানি যে তিনি অসামান্য গল্পকার, চিত্রনাট্যলেখক এবং জ্যোতিষবিশেষজ্ঞ; নিছক রহস্যোপন্যাসকে যিনি উন্নীত করেছিলেন সামাজিক সাহিত্যে; ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে অতুলনীয় শব্দচয়নে যিনি বুনেছিলেন প্রাচীন ভারতের এক বাস্তব অথচ মায়াময় সমাজচিত্র; তাঁর কলমের জাদুতে একের পর এক ভৌতিক কাহিনীও হয়ে উঠেছিল অমোঘ আকর্ষণের কেন্দ্র – তিনি আর কেউ নন; একমেবাদ্বিতীয়ম শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এমনই একজন মানুষ যাঁর প্রথম বই প্রকাশের চৌদ্দ বছরের পর প্রকাশিত হয়েছিল দ্বিতীয় গ্রন্থ। তাও প্রথমটি কবিতার বই। দ্বিতীয়টি গল্পের। জন্ম ১৮৯৯ সালের ৩০শে মার্চ, উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরে। তবে আদতে বরানগরের আদিবাসিন্দা শরদিন্দুর পিতা তারাভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ওকালতি করতেন বিহারের পূর্ণিয়ায়। পরে অবশ্য মুঙ্গেরে চলে যান। সেখান থেকেই ম্যাট্রিক পাশ করে ১৯১৫ সালে কলকাতায় বিদ্যাসাগর কলেজে পড়তে চলে এলেন শরদিন্দু। নিবাস হল প্রথমে ওয়াইএমসিএ হোস্টেল আর তারপরে হ্যারিসন রোডের মেস। এই মেসে এসেই গাঢ় বন্ধুত্ব হল অজিত সেনের সঙ্গে। পাঠক চিনতে পারছেন তো? সত্যান্বেষী গল্পের সেই হ্যারিসন রোডের মেস বাড়ি আর সেখানেই তো ব্যোমকেশের সাথে পরিচয় হল অজিতের! বাস্তবের অজিত সেনও ছিলেন শরদিন্দুর সাহিত্যচর্চার প্রধান দোসর। হ্যাঁ এভাবেই দৈনন্দিন জীবন থেকেই উপাদান সংগ্রহ করে তাকে প্রাণবন্ত করে তুলতেন শরদিন্দু। লক্ষ্য করবেন, তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দাদার কীর্তি’র পটভূমিও কিন্তু সাঁওতাল পরগণার উঁচুনিচু লালমাটির ছোট শান্ত এক শহরের দুটি প্রতিবেশী পরিবার এবং যাদের মধ্যে একটি পরিবারের কর্তা ওকালতি পেশার সাথেই যুক্ত। শরদিন্দুর নিজের আবাল্য পরিচিত জায়গা ও তার মানুষজন !

আরো পড়ুন:  মহাদেব ভট্টাচার্য রাজা রামমোহন রায়ের পায়ে ধরে বললেন "আপনি পারবেন,মেয়েগুলোকে বাঁচান"

যাই হোক, বাংলায় সাহিত্যচর্চার প্রতি প্রথম আকর্ষণ জন্মায় পনেরো বছর বয়সে রমেশচন্দ্র দত্ত আর বঙ্কিমের রচনা পড়ে। সেই ঝোঁক ক্রমশ বিস্তৃত ডানা মেলতে শুরু করল ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর থেকে। লিখে ফেললেন ‘দাদার কীর্তি’ যদিও তা বহুদিন লোকচক্ষুর অন্তরালেই ছিল। কলেজে পড়ার সময়ে কুড়ি বছর বয়সে ১৯১৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হল তাঁর প্রথম গ্রন্থ; বাইশটি কবিতার সংকলন ‘যৌবন-স্মৃতি’। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চার আশা মিটল না। কারণ বাবার ইচ্ছে ছেলে উকিল হবে। অগত্যা স্নাতকের পর পাটনা গেলেন আইন পড়তে। এর মাঝে বিয়েও হল। পাত্রী বাবারই সহকর্মী আইনজীবীর কন্যা পারুল। আইন পড়া শেষে বছর কয়েক বাবার সহকারী হিসেবে আদালতে প্র্যাকটিসও করলেন শরদিন্দু কিন্তু যখন একেবারেই ওকালতিতে আর মন টিকল না; তখন ১৯২৯ সাল নাগাদ ছেড়ে দিলেন ওকালতি। নিজেকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দিলেন সাহিত্যচর্চায়।

তারপর চোদ্দ বছরের খরা কাটিয়ে ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হল গল্পসংকলন ‘জাতিস্মর’। নিজস্ব শৈলীর বৈশিষ্ট্যে শরদিন্দুর উথ্থান এবার শুরু হল। যদিও এর আগের বছরেই ১৯৩২-এ বাংলা সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ করেছে ব্যোমকেশ। প্রথম গল্প ‘পথের কাঁটা’। এরপর ‘সীমন্তহীরা’। এই দুটি গল্পের অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তার কারণেই ‘সত্যান্বেষী’ গল্পটির মাধ্যমে শরদিন্দু ব্যোমকেশ সিরিজকে প্রতিষ্ঠা দিলেন। আর বলা যায় নিজেরই অল্টার ইগো ব্যোমকেশের যাত্রাও শুরু করালেন সেইখান থেকে যেখান থেকে তাঁর সাহিত্যিক সত্ত্বাটিরও বিকাশ ঘটেছিল। হ্যারিসন রোডের মেসবাড়ি।

আরো পড়ুন:  নেটিভদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন,খ্রিষ্টানদের গোরস্থানে জায়গা হল না ডেভিড হেয়ারের

এদিকে ১৯৩৮ সালে মুম্বইয়ের বম্বে টকিজে চিত্রনাট্যকার রূপে কাজ শুরু করেন শরদিন্দু মূলত রোজগারের টানেই। চোদ্দ বছরে মুম্বই বাসের জীবনে একাধিক ছবির চিত্রনাট্য লেখেন তিনি। এমনকি মুম্বইয়ে তাঁর বাসস্থানে দিকপাল সব ব্যক্তিত্বদের জমায়েতে এক নতুন খেলার উদ্ভব করলেন শরদিন্দু – গানের লড়াই বা ‘অন্ত্যাক্ষরী’। তবে এই চিত্রনাট্যের কাজের জন্য মাঝে অবশ্য দশটি গল্পের পর ব্যোমকেশের আগমনে খানিক ছেদ ঘটেছিল তবে ১৯৫২ সালে চলচ্চিত্রের কাজ থেকে অবসর নেওয়ার বছরখানেক আগেই পাঠকের অনুরোধে পনেরো বছর পরে আবার ফিরে এল ব্যোমকেশ চিত্রচোরের রহস্য সমাধানের কারণে। সিনেমার কাজ থেকে ছুটি নিয়ে পুণেতেই ‘মিথিলা’ বাড়িতে জীবনের শেষ পর্যন্ত কাটিয়েছেন শরদিন্দু। লিখেছেন বত্রিশটি ব্যোমকেশ কাহিনী, একের পর এক অসামান্য ছোটগল্প, অনায়াস দক্ষতায় রচনা করেছেন একের পর এক ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস আর হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া গল্প- ‘কালের মন্দিরা’, ‘গৌড়মল্লার’, ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’, ‘কুমারসম্ভবের কবি’, ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘ’, ‘চুয়াচন্দন’, ‘শঙ্খকঙ্কন’। আবার তিনিই লিখছেন ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘বিষের ধোঁয়া’, কিংবা কিশোরদের জন্য সরল মনোগ্রাহী আঙ্গিকে সদাশিবের অভিযান। কোষ্ঠীবিচারে ছিল অসম্ভব পারদর্শীতা। নেশা ছিল প্ল্যানচেটের। সেইজন্যই বোধহয় বরদার কাহিনীগুলোতে কিংবা ‘সবুজ চশমা’ বা ‘শূন্য শুধু শূন্য নয়’-এর মতো গল্পগুলোতে অতিলৌকিকতার ছোঁয়া! তাঁর একাধিক গল্প নিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নির্মিত হয়েছে কালজয়ী সব সিনেমা। ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ উপন্যাসটির জন্য শরদিন্দু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার সম্মানে ভূষিত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে শরৎ স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করে।

আরো পড়ুন:  নিয়মিত পচা মাছ আনতেন,স্ত্রী জিজ্ঞেস করলে বলতেন না আনলে ওদের চলবে কী করে

তবে অমোঘ নিয়মে এল কালের ডাক। তাঁর চিরকালের সঙ্গী ব্যোমকেশের শেষ কাহিনী ‘বিশুপালবধ’ অসম্পূর্ণ রেখেই ১৯৭০ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অন্য তীরে পাড়ি দিলেন তিনি। বাংলা রহস্যরোমাঞ্চ সাহিত্য যাঁর হাত ধরে পরিণত হয়েছিল; কেবল থ্রিলারের গণ্ডি পেরিয়ে তুলে ধরেছিল সমকালীন সমাজমননকে; পরিমিতি বোধকেই যিনি স্টাইলের তকমা দিয়ে নিজস্ব লিখনশৈলীর সৃষ্টি করেছিলেন; আধুনিক সাহিত্যে তৎসম শব্দের সুনিপুণ প্রয়োগ ছিল যাঁর অনায়াস সাধ্য; যাঁর ইতিহাস চেতনায় সমন্বিত হয়েছিল দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনা; তিনিই তো শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর জাদুকাঠির ছোঁয়ায় বাঙালী রূদ্ধশ্বাসে আজও পড়ে ব্যোমকেশ; স্বাধীনতার ভোরে আদিম রিপু-র দহনবহ্ণিতে আজকের পাঠকের চোখও জ্বালা করে ওঠে; তুঙ্গভদ্রার তীরে বিজয়নগরে অর্জুনবর্মা আর বিদ্যুন্মালার মিলনে আমরা এখনো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। তাঁর কলমের এক আঁচড়ে ইতিহাস হয়ে ওঠে জীবন্ত; থ্রিলারের পরতে ছুঁয়ে যায় মানবিকতার স্পর্শ। তিনিই তো শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। এক এবং অদ্বিতীয়।

– শ্রেয়সী সেন
তথ্যসূত্র – উইকিপিডিয়া, আনন্দবাজার পত্রিকা (জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়,গৌতম চক্রবর্তী) , সব বাংলায়

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।