কাছ থেকে দেখেছিলেন দেশভাগের যন্ত্রণা,সেই অভিজ্ঞতা থেকেই শক্তিপদ রাজগুরু লিখেছিলেন “মেঘে ঢাকা তারা”

কাছ থেকে দেখেছিলেন দেশভাগের যন্ত্রণা,সেই অভিজ্ঞতা থেকেই শক্তিপদ রাজগুরু লিখেছিলেন “মেঘে ঢাকা তারা”

উত্তম কুমারের ‘অমানুষ’ দেখেননি এমন বাঙালি বোধহয় খুব কমই আছেন। এর একটা হিন্দি ভার্সন হয়েছিল, নাম ‘বরসাত কী এক রাত’। পরিচালক শক্তি সামন্ত । ওনার পরিচালনায় মিঠুন চক্রবর্তীর আরেক সিনেমা ‘অন্যায় অবিচারও’ দর্শকদের ভাল লেগেছিল। একইরকম হিট ছিল অনুসন্ধান সিনেমাটিও। না, সিনেমা নিয়ে আলোচনার জন্য এ লেখা নয়। এইসব জনপ্রিয় সিনেমার নেপথ্য মানুষটাকে নিয়েই এই প্রতিবেদন।

অনেকেই হয়তো জানেন, অমানুষ, অনুসন্ধান সহ অনেক বাংলা সিনেমার কাহিনীকার ছিলেন সাহিত্যিক শক্তিপদ রাজগুরু। তবে বিপুল জনপ্রিয় হলেও বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে কোনও যুগান্তকারী স্থান পাননি তিনি। তবু তাঁর গল্প এত মানুষের ভাল লাগে, তুমুল জনপ্রিয় হয় তাঁর গল্প থেকে তৈরি সিনেমা…. এর কারন হল, জীবনকে, জীবনের খুব কাছে থেকে দেখেছেন শক্তিপদ রাজগুরু। তাঁর রচিত গল্পের অনুপ্রেরণাও আসে এই জীবন থেকেই। শক্তি সামন্তের ‘অমানুষ’ ছিল শক্তিপদ রাজগুরুর সুন্দরবনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এক কাহিনী। তাঁর ‘নয়া বসত’ উপন্যাসের কাহিনী ঘিরে তৈরি হয়েছিল এ ছবি। এই গল্প লেখার আগে সুন্দরবন অঞ্চলে একটানা ঘুরেছিলেন তিনি। এছাড়া উত্তরবঙ্গের কালিঝোরা অরণ্য অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন ‘অনুসন্ধান’ ছবির কাহিনী।

আরো পড়ুন:  বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মহাভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ অনুবাদক কাশীরাম দাস

১৯২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাঁকুড়ার গোপবন্দি গ্রামে জন্ম শক্তিপদ রাজগুরুর। স্কুলজীবন কাটে মুর্শিদাবাদের পাঁচথুপি টি এন ইনস্টিটিউশনাল স্কুলে। বাড়িতে ছিল সাহিত্যের আবহাওয়া। শক্তিপদর স্মৃতিশক্তি ছোট থেকেই ছিল বেশ ভাল। ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ কবিতাও মুখস্থ বলে যেতে পারতেন গড়গড় করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন তিনি।

বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। সারা জীবনে ১০০টির বেশি উপন্যাস লিখেছেন এই সাহিত্যিক। ১৯৪৫ সালে দেশভাগের প্রেক্ষাপটে উদ্বাস্তু জীবনের উপর ভিত্তি করে লেখা প্রথম উপন্যাস ‘দিনগুলি মোর’ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাঠকমহলে জনপ্রিয়তা লাভ করেন শক্তিপদবাবু।তাঁর একাধিক উপন্যাস ও গল্প অবলম্বন করে একাধিক সিনেমা হলেও কালজয়ী হল ‘মেঘে ঢাকা তারা’। এই সিনেমার জন্য পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে তিনিও বাঙালির কাছে, বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবেন। শক্তিপদ রাজগুরু চাকরি করতেন কলকাতার জেনারেল পোস্টঅফিসে। কলকাতার সিঁথির মোড়ের কাছে রায়পাড়া বাই লেনে ছিল অফিস। তাঁর অফিসেই একদিন দেখা করতে আসেন খোদ ঋত্বিক ঘটক। জানান, শক্তিপদবাবুর ‘চেনামুখ’ কাহিনী থেকে সিনেমা বানাতে চান। বড় গল্প চেনামুখ তখন প্রসাদ পত্রিকায় বেরিয়েছিল। চেনামুখ-এর উপন্যাস-রূপ প্রকাশিত হয় ডিএম লাইব্রেরি থেকে, ‘মেঘে ঢাকা তারা’ নামে। উপন্যাসটি নিয়ে সিনেমা হওয়ার পর তা হয়ে যায় অবিস্মরণীয় এক ক্ল্যাসিক।

আরো পড়ুন:  সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক শংকর

অদ্ভুত কী জানেন, মেঘে ঢাকা তারা দেখার পর অনেকেরই মনে হতে পারে ছবির কাহিনীকার শক্তিপদ রাজগুরু হয়তো ওপার বাংলার মানুষ। কিন্তু বাস্তবে তা সত্যি নয়। তিনি আদ্যন্ত এপার বাংলার মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের আদি বাসিন্দা। সাত পুরুষের ভিটে ছিল বাঁকুড়ায়। কিন্তু বাবা চাকরি করতেন ‘পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফস’-এ৷ তাই শৈশব-কৈশোরটা তাঁর নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরেই কেটেছে। বাবা যখন মারা গেলেন, তখন দারুণ দুঃখ আর দুর্দশার মধ্যে কাটল বেশ কিছু দিন। তখনও তিনি বুঝেছিলেন শিকড় হারানোর যন্ত্রণা। তাই তো স্বাধীনতার পরে দেশভাগের ফলে মানুষ যখন ওপার থেকে এখানে এল সব হারিয়ে তখন ওই সব হারানোর যন্ত্রণার জায়গাটা যেন শক্তিপদবাবুর খুবই আপন মনে হতে লাগল। আর তাই হয়তো ‘মেঘে ঢাকা তারা’র মত ওমন যুগান্তরকারী লেখা তাঁর হাত থেকে বেরিয়েছিল।

আরো পড়ুন:  "মেমসাহেব"কে ছেড়ে চিরঘুমের দেশে চলে গেলেন সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্য

শুধু বড়দের জন্য নয়, ছোটদের জন্য তৈরি করেছেন ‘পটলা’ চরিত্র। এক সময় সম্পাদনা করেছেন ‘উল্টোরথ’ এবং ‘সিনেমাজগৎ’ পত্রিকা। বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছেন। বেশ কিছু বই তাঁর অন্য ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। নিজেও শিখেছিলেন মালয়ালি, তামিল, তেলুগু আর ওড়িয়া ভাষা। বাংলা সাহিত্যকে দুই হাত উপুড় করে দিয়েছেন। কিন্তু সেই তুলনায় প্রাপ্তির ভাঁড়ার ততটাও ভরেনি শক্তিপদ রাজগুরুর। এই আক্ষেপ থাকবেই।

Piyali Banerjee

Piyali Banerjee

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।