সিটি কলেজের ছাত্রনেতারা প্রতিশ্রুতি দিতেন, ‘বাংলা ক্লাসে নারায়ণবাবুকে এনে দেব’

সিটি কলেজের ছাত্রনেতারা প্রতিশ্রুতি দিতেন, ‘বাংলা ক্লাসে নারায়ণবাবুকে এনে দেব’

অনেক পুরোনো দিনের কথা | কলকাতার সিটি কলেজে মঞ্চস্থ হল এক নাটক | নাম ‘রামমোহন’ | নাটকটি লিখেছিলেন সিটি কলেজের এক অধ্যাপক | সেই নাটকে অভিনয় করে বিশ্ববিদ্যালয় নাটক প্রতিযোগিতার সেরার শিরোপা পেলেন সিটি কলেজেরই এক ছাত্র | পরের দিন ছাত্রটি গেলেন সেই অধ্যাপকের কাছে | মাস্টারমশাই প্রিয় ছাত্রটিকে আশীর্বাদ করে বললেন, ‘দেখবে, তুমি একদিন অনেক বড় অভিনেতা হবে— অনেক বড়— আর তখন আমি বসে বসে তোমার জীবনী লিখব।’ সেদিনের সেই ছাত্রটি পরবর্তীতে সত্যিই হয়ে উঠলেন বড় অভিনেতা | ছাত্রটি ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর শিক্ষকটি ছিলেন ‘স্যার’ তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ওরফে ‘টি.এন.জি’। অবশ্য বাঙালির কাছে তিনি সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় |

মাস্টারমশাই হিসেবে অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় | তাঁর ক্লাসে হাজির হত বিভিন্ন বর্ষের পড়ুয়ারা | এমনকি হাজির হতেন বিজ্ঞান বিভাগের পড়ুয়ারাও | পড়ুয়াদের অনেকে বসার জায়গা হত না | কেউ দেওয়ালে, কেউ বা অন্যের পিঠে খাতা রেখে ‘নোট’ নিত | এমনই এক দিনের স্পেশ্যাল ক্লাসে উপস্থিত হয়েছিলেন তিনশো পড়ুয়া | নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, ‘আগে জানলে তো রিপোর্টারদের একটা খবর দিতাম, ছবি নিয়ে যেত।’

আরো পড়ুন:  মেয়ে হয়ে জন্মানোর অপরাধে মুখ দেখতে চাননি বাবা,রাজ্যের প্রথম 'পিঙ্ক ক্যাব ওনার' মানসী মৃধা অনুপ্রেরণার আরেক নাম

ক্লাসে বই নিয়ে পড়াতেন না নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় | অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি ছিল | দেশ-বিদেশের নানা সাহিত্য থেকে অবলীলায় অজস্র উদ্ধৃতি দিতেন | পাতার পর পাতা মুখস্থ বলতেন | ১৯৩৩ -এ তিনি ম্যাট্রিকুলেশনে বাংলায় পেয়েছিলেন ৮৪ শতাংশ নম্বর ৷ ১৯৪১ সালে রেকর্ড নম্বর পেয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান | এরপরই শুরু করেন অধ্যাপনা | প্রথমে জলপাইগুড়ির আনন্দচন্দ্র কলেজে পড়াতেন | এরপর কলকাতার সিটি কলেজে দশ বছর অধ্যাপনা করেন | এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন ১৪ বছর | শঙ্খ ঘোষ ,অলোক রায়,সুধীর চক্রবর্তী,অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,অমিতাভ দাশগুপ্ত, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সকলেই ছিলেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছাত্র | নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় অধ্যাপক হিসেবে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে সিটি কলেজের ছাত্রনেতারা পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি দিতেন, ‘বাংলা ক্লাসে নারায়ণবাবুকে এনে দেব।’

আরো পড়ুন:  রাস্তার অবলা জীবদের জন্য নিজের বাড়ি দান করেছেন বর্ধমানের তৃপ্তি চক্রবর্তী

ছাত্রছাত্রীদের উপর কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতেন না নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় | একবার তিনি ক্লাসে পড়াচ্ছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অগ্রদানী’ গল্পটি । কেউ বই আনেনি | মাথা চুলকে তিনি ছাত্রদের বললেন, “দেখি, মনে করতে পারি কিনা” | তারপর যতিচিহ্ন সহ সমস্ত গল্পটিই তিনি স্পষ্ট উচ্চারণে হুবহু বলে গেলেন |

তিনি যখন পড়াতেন, ছাত্রছাত্রীরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। পড়ানোর সময়ে ছাত্রছাত্রীদের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতেন না। তাদের নিজস্ব মতামত তৈরি করার সুযোগ দিতেন। তাঁর স্মৃতিশক্তিও ছিল অবিশ্বাস্য। একবার তিনি পড়াচ্ছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অগ্রদানী’ গল্পটি। সেদিন কোনো পড়ুয়া ক্লাসে বই আনেনি। মাথা চুলকে তিনি ছাত্রদের বললেন, “দেখি, মনে করতে পারি কিনা”। তারপর সব যতিচিহ্ন সহ সমস্ত গল্পটিই তিনি স্পষ্ট উচ্চারণে হুবহু বলে গেলেন। ছাত্ররা তো হতবাক।

আরো পড়ুন:  অনেক হয়েছে,মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই কবিতা লেখা ছেড়ে দিলেন সমর সেন

ছাত্রদের প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় | বহু গরীব ছাত্রের পরীক্ষার ফি নিজে দিয়েছেন | একবার সিটি কলেজে নাইট শিফট চলাকালীন কলেজের মেন ইলেকট্রিক সুইচে আগুন লেগে যায়।কলেজ থেকে বাইরে বেরোনোর জন্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় | নারায়ণবাবু নিজে কলেজের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে পড়ুয়ারা যাতে নির্বিঘ্নে বেরোতে পারে তা সুনিশ্চিত করেন,সবশেষে তিনি কলেজ থেকে বেরিয়ে আসেন |

বাড়িতে বসে লিখতেন বিছানায় আধশোয়া হয়ে,বুকের নীচে বালিশ রেখে জার্মান মঁ ব্লাঁ, পেলিকান বা শেফার্ড পেন নিয়ে লেখালেখি করতেন তিনি | সঙ্গে চা আর অবিরাম গোল্ড ফ্লেক সিগারেট | মাত্র ৫২ বছর বেঁচেছিলেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় | শেষযাত্রায় হাজির হয়েছিলেন অগণিত ছাত্রছাত্রী | তাদের কাছে তিনি শুধু সাহিত্যিক ছিলেন না,ছিলেন প্রিয় টি.এন.জি স্যার |

তথ্য : নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় মাস্টারমশাই, কোরক (নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সংখ্যা)

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।