সবটাই ছিল ‘না খাওয়ার’ বিরুদ্ধে একটা লড়াই : শ্রমজীবী লেখোয়াড় মনোরঞ্জন ব্যাপারী

সবটাই ছিল ‘না খাওয়ার’ বিরুদ্ধে একটা লড়াই : শ্রমজীবী লেখোয়াড় মনোরঞ্জন ব্যাপারী

সালটা ১৯৫৩, সবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে স্বাধীন হয়েছে দেশ। ওপার বাংলা থেকে শরণার্থী আসার ঢেউ তখনও বন্ধ হয়নি। এরকম সময়ে সুদূর বরিশাল থেকে এক নমঃশূদ্র পরিবার সীমান্ত পেরিয়ে পা রাখলো পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে। এদের সঙ্গে ছিল বছর তিনেকের একটা শিশু। কেনই বা বাবা মা দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ আর আম কাঁঠালের বাগান ছেড়ে পোঁটলা পুঁটলি নিয়ে রাতারাতি বেরিয়ে পড়লো, সে বোঝার ক্ষমতা টুকুও তার ছিলো না সেদিন। তাঁর অজান্তেই বদলে গেল দেশের নাম।

শেয়ালদা স্টেশনের প্লাটফর্মে কদিন কাটানোর পর হুকুম হলো বাঁকুড়া যেতে। দলবল নিয়ে সেখানকার রিফিউজি ক্যাম্পে মাসখানেক কাটানোর পর নির্দেশ এলো দন্ডকারণ্য যাবার। বেঁকে বসলো গৃহস্বামী, স্বভাবতই পরিবারের সবায়ের নাম কাটা গেল ক্যাম্প থেকে। এবার বেঁচে থাকার জন্য কঠিন লড়াই। লড়াই আশ্রয়ের জন্য, লড়াই পেটের ভাতের জন্য। এরমাঝে অসুস্থ হয়ে পড়লেন পরিবারের কর্তা, ব্যাস নিমেষে যেন মাথার ওপর থেকে বটগাছটি সরে গেল।

ভাইবোনের সাথে জীবন সংগ্রামে নামলো এবার ছেলেটাও। যে বয়সে স্কুলে যাবার কথা বা খেলার মাঠে যাবার কথা, সেই বয়সে ঢুকলো চায়ের দোকানে ফাইফরমাস খাটতে। কোনরকমে দুবেলা দুমুঠো ভাতের যোগাড় করতে হবে। অনাহারে চোখের সামনে দেখলো একদিন দিদিকে মরতে। হাল ছাড়লোনা সে, একটু ভালো থাকার জন্য ছুটে বেড়িয়েছে জলপাইগুড়ি থেকে লখনৌ, গৌহাটি থেকে বারানসী। কিন্তু আবার ফিরে এসেছে কলকাতা, জারি রেখেছে খিদের বিরুদ্ধে লড়াই।

আরো পড়ুন:  কবিগুরুর "মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চার" অনুপ্রেরণাতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন পাঞ্জাবি ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক

বেছে নিয়েছিল রিকশা চালকের পেশা, যাদবপুর স্টেশন চত্বর থেকেই শুরু হলো হাতেখড়ি। সেই সাথে পা রাখলো অপরাধ জগতে, হাতে উঠলো পেটো নানপুরিয়া। সত্তরের দশকে যখন বেনোজলে ভরে গেছিল নকশাল আন্দোলন, সেও ভেসে গেল ঐ স্রোতে। বদলে গেল জীবনের গতিপথ। পথের শেষ হলো জেলে এসে, শুরু হলো বন্দীজীবন। একদিক দিয়ে অবশ্য নিশ্চিত হলো সে, দুবেলা ভাত জোগাড় করার চিন্তা আর রইলো না। সেইসাথে সে কল্পনাও করতে পারেনি এখান থেকেই ঘুরে যাবে তাঁর জীবনের অভিমুখ।

জেলেই আলাপ হলো এক বৃদ্ধ বন্দীর সাথে। মানুষটি ছিলেন জ্ঞানী, বুঝেছিলেন কিশোরটির মধ্যে পদার্থ আছে। নিজেই শিক্ষক হয়ে থাকে লেখাপড়া শেখাতে লাগলেন। প্রথম প্রথম জেলখানার উঠোনটাই হলো শ্লেট, গাছের সরু ডাল হয়েছিল পেন্সিল। তাদের এই উদ্যম একদিন চোখে পড়ে গেল জেলারের, নিজেই তিনি ব্যাবস্থা করে দিলেন খাতা পেন্সিল আর বইয়ের। সেদিনের বন্দী কিশোর ডুবে গেল সরস্বতী আরাধনায়।

মেয়াদ শেষে বেরুলেন একদিন জেল থেকে। সেদিনের উচ্ছল কিশোর আজ পরিণত এক যুবক। পুরানো সাথী রিকশা কে অবলম্বন করেই বেঁচে থাকার চেষ্টা, বাকি সময় শুধু বই আর বই, সময় পেলেই ডুবে যেতেন তাদের পাতায়।

আরো পড়ুন:  প্রায় একশো বছর গোলবাড়ির কষা মাংসে মজে আছে বাঙালি

আশির দশকের গোড়ার দিক, একদিন তাঁর রিক্সায় সওয়ারী হলেন এক ভদ্রমহিলা। সাহস করে তাঁকে জিজ্ঞেন করলেন ‘জিজীবিষা’ শব্দের অর্থ। রিক্সাচালকের এহেন প্রশ্নে কৌতূহল জাগলো মহিলার। তিনি শব্দটির অর্থ বলেই থামলেন না, চললো কথাবার্তা। নিজের ম্যাগাজিনে ওই রিক্সাচালককে জীবনের গল্প লিখতে বললেন। দিলেন তাঁর নামাঙ্কিত কার্ড। যুবক হাতে নিয়ে দেখেন ওই ভদ্রমহিলা আর কেউ নন, স্বনামধন্য লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী। পরে স্মৃতিচারণায় বলেছেন, মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো তিনি শিক্ষিত এক রিক্সাচালকই রয়ে যেতেন। কিন্তু তাদের ওই সাক্ষাৎ সবকিছু বদলে দিল, নানা পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা বেরতে থাকলো। তাঁকে চিনতে শুরু করলো বাংলা। হু হু করে বাড়তে লাগলো তাঁর গুণগ্রাহীর সংখ্যা ।

এলো ১৯৭১, বাংলাদেশের বুকে শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। সেই সাথে এপার বাংলায় আবারো নেমে এলো উদ্বাস্তুদের ঢল। রাজনৈতিক অস্থিরতাও উঠলো চরমে। ঘরপোড়া মানুষটি উদ্বাস্তু এক আত্মীয় পরিবারের সাথে পাড়ি দিলেন মধ্যপ্রদেশ। জীবিকার জন্য জঙ্গলের কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করতেন। এখানেই তার সাক্ষাৎ হয় প্রবাদ প্রতিম শ্রমিক নেতা শঙ্কর গুহনিয়োগীর সাথে। বেছে নিলেন খনি শ্রমিকের পেশা, অনুপ্রাণিত হয়ে সামিল হন তাদের আন্দোলনে। বেশ কয়েকবছর ওখানে কাটিয়ে আবার কলকাতায় ফেরার, শুরু করলেন লেখালেখি। নিজের জীবন সংগ্রামের কাহিনী ফুটিয়ে তুললেন কলমের আঁচডে। ব্ইয়ের নাম, ‘ইতিবৃত্তে চন্ডাল জীবন’!

আরো পড়ুন:  বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত ছিলেন তাঁর আদর্শ,স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে রিভলভার পাচারও করতেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রথম প্রকাশেই বাজীমাত, হু হু করে কাটতি হতে লাগলো। নিজের লেখা নিয়ে বলেন এ শুধু সাহিত্য নয়, বেঁচে থাকার জন্য এক লড়াইয়ের কাহিনী। লড়াই খিদের বিরুদ্ধে, জাতপাতের বিরুদ্ধে, কঠোর জীবনের বিরুদ্ধে। বইটির জন্যে পেয়েছেন ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’ এবং জাতীয় স্তরের বিভিন্ন পুরস্কার। তাঁর একের পর এক লেখায় উঠে এসেছে বাংলার বুকে দলিত এবং নমশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষের কথা।

গতবছর দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যের সব থেকে ‘ওজনদার’ পুরস্কার, ভারতীয় মুদ্রায় ১৮ লক্ষ টাকার ডিএসসি প্রাইজের তালিকার লংলিস্টে জায়গা পেয়েছিল ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারীর ‘বাতাসে বারুদের গন্ধ’র ইংরেজি অনুবাদ ‘দেয়ার্স গানপাউডার ইন দি এয়ার’। ‘বাতাসে বারুদের গন্ধ’র অনুবাদ করেছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক অরুণাভ সিংহ।

লেখক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও তাঁর জীবন আর পাঁচজন সাহিত্যিকের মতো নয়। সত্তর বছর বয়সী মানুষটি মুকুন্দপুর হেলেন কেলার মূক ও বধির স্কুলের হোস্টেলে রাঁধুনির কাজ করেন। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী জানতে পেরে তাঁকে এক গ্রন্থাগারে লাইব্রেরিয়ান পদে নিয়োগ করেন। পাঠক নিশ্চয়ই বুঝেছেন কার কথা বলা হলো ? দেশের অন্যতম এক সেরা সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারী, যার গল্পের নায়ক তিনি নিজেই।যার নিজের কথায় ” সবটাই ছিল ‘না খাওয়ার’ বিরুদ্ধে একটা লড়াই । দলিত মানুষরা বলতে পারবে আমাগোও একজন লেখক আছে। ”

-স্বপন সেন

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।