বরিশালের মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন তিনি,বাঙালি মনে রাখেনি অশ্বিনীকুমার দত্তকে

বরিশালের মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন তিনি,বাঙালি মনে রাখেনি অশ্বিনীকুমার দত্তকে

১৯০৫ সালের অক্টোবর মাস | তখন বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা করেছে ব্রিটিশরা | বরিশালের টাউন হলে সেদিন বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে এক ভাষণ রাখেন বরিশালের এক নেতা | তিনি বলেন, “আমরা যে সব বক্তৃতা করে বেড়াচ্ছি, যদি কেউ তা যাত্রাপালা আকারে গ্রামে গ্রামে প্রচার করে, তাহলে তা আমাদের এরূপ সভা বা বক্তৃতার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হবে” | সেদিন সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন এক কবি | তিনি সেই বক্তৃতা শুনে উদ্বুদ্ধ হলেন | লিখে ফেললেন যাত্রাপালা ‘মাতৃপূঁজা’ | উদ্দেশ্য একটাই বঙ্গভঙ্গ রদ করা এবং দেশের স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করা | সেদিনের সেই কবি ছিলেন মুকুন্দ দাস আর সেই নেতা ছিলেন বরিশালের মুকুটহীন সম্রাট অশ্বিনীকুমার দত্ত | বাউণ্ডুলে স্বভাবের মুকুন্দদাসকে অশ্বিনীকুমার দত্ত দিনের পর দিন বাড়িতে ডেকে এনে আদর, স্নেহ ও ভালবাসা দিয়ে এক নতুন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন | এই কারণেই মুকুন্দদাস একসময় চারণ কবি মুকুন্দদাস হতে পেরেছিলেন।

আরো পড়ুন:  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে গর্জে উঠেছিল বীণা দাসের রিভলভার

অশ্বিনীকুমার দত্ত ১৮৫৬ সালের ২৫ জানুয়ারী বরিশালের গৌরনদীর বাটাজোর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন সাব-জজ ব্রজমোহন দত্ত। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ এ পাশ করেন ও ১৮৭৯ সালে এলাহাবাদ থেকে মাত্র ২৩ বছর বয়সে আইন (বি.এল) পাশ করেন তিনি। ওই বছর তিনি শ্রীরামপুরের চাতরা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

অশ্বিনীকুমার দত্ত ছাত্রদের নৈতিক চরিত্র গঠন করে দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত করেন। তিনি বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের নিয়ে Little Brothers of the poor (দরিদ্র বান্ধব সমিতি), Band of Hope (আশ্বাসী সম্প্রদায়), Band of Mercy (কৃপালু সম্প্রদায়), Friendly Union(বান্ধব সমিতি) গঠন করেন। এই সংগঠনগুলো গ্রামে শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় | ফলও পাওয়া যায় হাতেনাতে | ১৯০০ সালে বরিশালে গ্রাজুয়েটের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫০ জন।

আরো পড়ুন:  পার্লামেন্ট হাউসে বোমাবর্ষণে ভগৎ সিং-এর সঙ্গী ছিলেন,বটুকেশ্বর দত্তের শেষ জীবন কেটেছিল তীব্র অর্থকষ্টে

গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্যে অশ্বিনীকুমার দত্তর পৃষ্ঠপোষকতায় বিকাশ, স্বদেশী, বরিশাল, বরিশাল হিতৈষী প্রভৃতি পত্রিকা প্রকাশিত হয় | অশ্বিনীকুমারের একান্ত চেষ্টায় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয় | তিনি বরিশাল পৌরসভা ও লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন | ফজলুল হককে তিনি পৌরসভা ও জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত করেন | ১৮৮০ সালে বরিশালে এসে তিনি ওকালতি পেশা শুরু করেন। ৯ বছর ওকালতি করেন তিনি। কিন্তু এই পেশায় কোর্টে অনেক সময় মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয় বলে ১৮৮৯ সালে তিনি ওকালতি পেশা ছেড়ে দেন।

বরিশাল শহরে নিজের দান করা এলাকায় পিতার নামে ব্রজমোহন বিদ্যালয় ও ব্রজমোহন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন অশ্বিনীকুমার দত্ত। গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে কুড়ি বছর বিনা বেতনে কলেজে শিক্ষাদান করেছেন। তিনি বরিশাল শহরে স্ত্রী শিক্ষার্থে একটি বালিকা বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধী বরিশালে এলে অশ্বিনীকুমার দত্তকে জেলার অদ্বিতীয় নেতা হিসেবে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন | বাংলা বিভক্তির প্রতিবাদে অশ্বিনী কুমারের নেতৃত্বে বরিশালে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। বরিশালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন যতটা তীব্র আকার ধারণ করেছিল বাংলার আর কোথাও তার নজির নেই | বরিশালের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন বরিশালের মুকুটহীন সম্রাট |

আরো পড়ুন:  স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়ে জীবনের তেইশ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন এই বঙ্গসন্তান

স্বদেশ বান্ধব সমিতির স্বেচ্ছাসেবকদের সাহায্যে বরিশালকে স্বদেশী আন্দোলনের একটি শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্ত। জেলার সর্বত্র এর ১৬০ টিরও বেশি শাখা ছিল এই সমিতির। ব্রিটিশ পুলিশ তাকে বরিশালে গ্রেপ্তার করে ও ১৯০৮ সালে তার সমিতি নিষিদ্ধ করে। তাকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত লক্ষ্মৌ জেলে বন্দি রাখা হয় | ১৯২২ সালে তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯২৩ সালের ৭ নভেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন বরিশালের মুকুটহীন সম্রাট অশ্বিনীকুমার দত্ত |

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।