“শশীবাবু”র অভিনয়ে মুগ্ধ মানিকবাবু,প্রাপ্য সম্মান পাননি মহানায়ক উত্তমকুমারের মাস্টারমশাই সন্তোষ সিংহ

“শশীবাবু”র অভিনয়ে মুগ্ধ মানিকবাবু,প্রাপ্য সম্মান পাননি মহানায়ক উত্তমকুমারের মাস্টারমশাই সন্তোষ সিংহ

(লেখক – পবিত্র মুখোপাধ্যায়)

“বাদুড় বলে , ওরে ও ভাই সজারু
আজকে রাতে দেখবে একটা মজারু
আজকে হেথায় চামচিকে আর পেঁচারা
আসবে সবাই , মরবে ইঁদুর বেচারা |”

মনে পড়ে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ ‘ ছবিতে সুকুমার রায়ের ‘হযবরল ‘ কবিতার এই অংশটিকে ? ফেলুদার গলায় চমৎকার মানানসই এই কবিতার শেষে ঘটেছিল এই ছবির একমাত্র মৃত্যু দৃশ্য | ছুরির আঘাতে মৃত্যু হয়েছিল এক নিরীহ পটুয়ার | অন্ধকার গলির মুখে টলতে টলতে তাঁর মুখ থেকে বেরিয়েছিল দুটি শব্দ , ‘ সিং ۔সিং ۔۔۔|

মাত্র কয়েকটি সংলাপ | আর তাতেই তিনি ‘অমর’ | ষষ্ঠীর সকালে অনেক বাঙালির মনে ভেসে ওঠে তাঁর মুখ |
মনে পড়ছে নিশ্চয়ই সেই দৃশ্য ——
বেনারসে ঘোষাল বাড়ি |

ফেলুদা : রং করা কবে শুরু হয়েছে ?
বিকাশ : কবে থেকে শুরু হয়েছে রং করা শশীবাবু ?
শশীবাবু : শনিবার থেকে |
ফেলুদা : ভদ্রলোক এখানেই থাকেন ?
বিকাশ : না , উনি আসেন সেই গনেশ মহল্লা থেকে |
ফেলুদা : পরশু তো ষষ্ঠী | আপনার কাজ পরশুর মধ্যে শেষ হয়ে যাবে ?
শশীবাবু : (সাপের গায়ে রং লাগাতে লাগাতে ) হ্যাঁ হ্যাঁ , তা হয়ে যাবে |

স্বয়ং শিশিরকুমার ভাদুড়ী তাঁর নাট্য শিক্ষাদানের প্রয়োজনে নিজের অনুপস্থিতিতে ডেকে নিতেন এই মানুষটিকে | নাটকের দল খুলেছিলেন দু’বার | সাফল্য আসেনি | একবার তুলসী চক্রবর্তীর সঙ্গে ‘রূপমহল ‘ থিয়েটারে এবং অন্যবার দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে চিৎপুরে ‘ রংমহল’-এ | একাডেমি অব ডান্স ড্রামা এন্ড মিউজিকের নাট্যশিক্ষক মানুষটির প্রথম ছবিতে কাজ নির্বাক ছবি ‘সুদামা’ -য় | খুব আক্ষেপ করতেন মানিকবাবুর সাথে কাজ করতে না পারার জন্য |

আরো পড়ুন:  আইসোলেশন কি, তা প্রথম বুঝিয়েছিলেন একজন বাঙালী !

কিন্তু আক্ষেপ আর রইল না | সুযোগ এল কিন্তু তখন আর শরীর সঙ্গ দিচ্ছে না | আচমকাই একদিন হাজির মানিকবাবুর ইউনিটের অন্যতম সদস্য ভানু ঘোষ | অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলেছিলেন , ‘ মানিকদা , আপনাকে স্টুডিওতে যাবার জন্য অনুরোধ করেছেন | আপনি কী আমার সাথে যেতে পারবেন ?”

সন্তোষবাবু ফেরাতে পারলেন না মানিক-স্পর্শের আহ্বান | অশক্ত শরীর নিয়েও ভানুবাবুর সঙ্গে চললেন নিউ থিয়েটার্সের ১ নম্বর স্টুডিওতে যেখানে মানিকবাবু অধীর আগ্রহে তাঁর অপেক্ষায় রয়েছেন | স্টুডিওতে যখন পৌঁছালেন তখন মানিকবাবুর দলবল ব্যস্ত উদর পূরণে |
ভানুবাবু বলেছিলেন , ‘মানিকদা এখন লাঞ্চ-ব্রেক দিয়েছেন | আপনারা কী খাবেন বলুন , এখানেই আনিয়ে দিচ্ছি |”
অমায়িক মানুষটি বলেছিলেন , ‘ আমি স্টুডিওর ক্যান্টিনে গিয়ে খাব | ওখানেই তো চিরটাকাল খেয়ে এসেছি |’

খাওয়ার পালা সাঙ্গ হলে মুখোমুখি দুই নক্ষত্র | মানিকবাবু বলেছিলেন , ‘ আমি যে ছবিটা করছি , সেটা আমারই লেখা ফেলু -সিরিজের একটা গল্প — জয় বাবা ফেলুনাথ |ওতে একজন পটুয়ার রোল রয়েছে যেটায় আমি গোবিন্দ চক্রবর্তীকে নিয়েছিলাম কিন্তু গোবিন্দবাবু এক লাইন ডায়ালগও মনে রাখতে পারছিলেন না | আপনার যদি আপত্তি না থাকে আপনি কি ওই রোলটা করে দেবেন ?’

আরো পড়ুন:  দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটক দেখে রাগে মঞ্চে জুতো ছুঁড়ে মেরেছিলেন বিদ্যাসাগর

সন্তোষবাবু বলেছিলেন , ‘ আমার শারীরিক ক্ষমতা অনেক কমে গেছে | তবু আপনি যখন বলছেন , তখন আমি একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি |’

সন্তোষবাবুর অভিনয় প্রতিভা নিয়ে নিশ্চিত মানিকবাবু সঙ্গে সঙ্গেই মেক -আপ আর্টিস্ট অনন্ত দাশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলেন | সন্তোষবাবুর হাতে তুলে দিলেন স্ক্রিপ্ট |

প্রথমদিন কোন সংলাপ ছিল না | অর্ধসমাপ্ত একটা দুর্গামূর্তি | তার সামনে দাঁড়িয়ে অশক্ত শরীরে সন্তোষবাবু ওরফে শশী পাল মাতৃ প্রতিমার সম্পূর্ণ রূপদানে ব্যস্ত | নামের প্রতি সুবিচার করে একটা শটেই ক্যামেরাবন্দি হল দৃশ্যটি |

এই দৃশ্য গ্রহণের সময় টুলের উপর সন্তোষবাবুকে ধরে তুলে দেওয়া হয়েছিল আবার শট শেষে ধরাধরি করে নামাতে হয়েছিল | অথচ পর্দায় অসুস্থতার নামমাত্র ছাপ ছিল না | সাধে কী আর মহানায়ক ‘উত্তমকুমারের চলচ্চিত্র গুরু’ বলা হয় |

এবার আসি পর্দার আড়ালের কথায় ——
শারীরিক অসুস্থতার জন্য সন্তোষবাবুর পক্ষে বেনারসে যাওয়া সম্ভব হয়নি | কলকাতাতেই বানানো হয়েছিল বেনারসের বাঙালিটোলার গলির আদলে একটা আস্ত গলিসহ ছবির সেট |

আচ্ছা , আপনারা পর্দায় দেখেছেন তো মৃত্যু দৃশ্য | একবারের জন্যও কী মনে হয় ওটা ইনডোরে শুটিং !
আসলে এ সবই শিল্প নির্দেশক অশোক বসু-র হাতের কারসাজি |

আরো পড়ুন:  বিশ্বভারতীর "আকবরী মোহর"-কে কবিগুরু নিজেই রবীন্দ্রসংগীতের তালিম দিয়েছিলেন

অভিনয়ের স্বল্প পরিসরেও চমৎকার অভিনয় করা শশী পাল ওরফে সন্তোষ সিংহ মানিকবাবুকে বলেছিলেন , ‘ আপনি যেরকম চেয়েছিলেন আমি সেটা ঠিকঠাক করতে পেরেছি তো ?”

সন্তোষবাবুর নিখুঁত অভিনয়ে আপ্লুত মানিকবাবু বলেছিলেন, ‘ কী বলছেন দাদা ! আমি যা চেয়েছি , আপনি তার চেয়েও অনেক ভালো করেছেন |”

দুর্ভাগ্য আমাদের | এমন এক হীরক খণ্ডের ‘দ্যুতি’ চিনতে পারলাম কই ?

অবাক হচ্ছেন নিশ্চয়ই ? কেন এই আক্ষেপ প্রকাশ !
চলুন শোনা যাক সেই ঘটনা ——

‘মিনার’ প্রেক্ষাগৃহে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘নকল সোনা ‘-র প্রদর্শন চলছে | আচমকাই হলের মধ্যে উঠল আওয়াজ , ‘ নে নে বুড়ো ধন্য হয়ে গেলি | গুরু তোর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল | ‘ ওই ছবির একটি দৃশ্যে মহানায়ক উত্তমকুমার সন্তোষবাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিলেন আর তারই পরিপ্রেক্ষিতে এই অবজ্ঞা সুলভ উক্তি |

কিন্তু সত্যিই কি অবজ্ঞা করা যায় সন্তোষবাবুকে ! বাস্তবে ইনিই তো ছিলেন মহানায়কের মাস্টার মহাশয় | উত্তমকুমারকে শিখিয়েছিলেন ৫৬ রকমের ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন | উত্তমকুমার তখন রীতিমত ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল ‘| এম পি পিকচার্সে মাসিক চারশো টাকার চুক্তিতে যোগদান করতে এলেন | এম পি পিকচার্সের অভিনয় শিক্ষক সন্তোষবাবু মহানায়ককে তৈরি করেছিলেন তিল তিল করে |

লেখক – পবিত্র মুখোপাধ্যায়

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।