স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামী হওয়ার,কলকাতার বিভিন্ন ক্লাবে ভাড়ায় ফুটবলও খেলতেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়

স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামী হওয়ার,কলকাতার বিভিন্ন ক্লাবে ভাড়ায় ফুটবলও খেলতেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটবেলায় ভালোবাসতেন খেলাধুলা | বক্সিং, লাঠিখেলা, ছোরাখেলা, জিমন্যাস্টিক সবেতেই ছিলেন পারদর্শী | তবে ফুটবলটা একটু বেশী ভালবাসতেন | কলকাতার বিভিন্ন ক্লাব তাঁকে ভাড়া করে নিয়ে যেত পাড়ার ফুটবল টুর্নামেন্টের জন্যে | ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার তিনিই পেতেন | একবার এরকমই এক টুর্নামেন্টে তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন স্বয়ং গোষ্ঠ পাল | বন্ধুরা ধরেই নিয়েছিলেন বড় হয়ে ময়দান কাঁপাবেন তিনি | দেশে তখন ব্রিটিশরাজ | কলকাতা হয়ে উঠেছে বিপ্লবীদের অন্যতম ঘাঁটি | তিনিও তখন স্বাধীনতার সৈনিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন | পাশাপাশি চলছে নাটক | একদিন হঠাৎ সব ছেড়ে চলে গেলেন পাঞ্জাবে | লক্ষ্য আর্মি অফিসার হবেন | কিন্তু বাবার আপত্তিতে ফিরে এলেন | কয়েকমাস পরে এয়ারফোর্সে যোগ দিতে গেলেন দিল্লি | কাছ থেকে দেখলেন ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে দমন করতে সাধারণ মানুষদের উপর ব্রিটিশদের অত্যাচার | ঠিক করলেন যারা দেশের মানুষের উপর এত অত্যাচার করছেন তাদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে যাবেন না | ফিরে এলেন কলকাতায় | শুরু করলেন অভিনয় | বাকিটা ইতিহাস |

আরো পড়ুন:  সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন ‘বাউল সম্রাট’ লালন

তিনি কালী বন্দ্যোপাধ্যায় | তাঁর নাম বললেই মনে আসে বরযাত্রী,লৌহকপাট,পরশপাথর,বাড়ি থেকে পালিয়ে,হাঁসুলীবাঁকের উপকথা ইত্যাদি চলচ্চিত্রের কথা | কেউ কি ভুলতে পারে নীল আকাশের নীচের ওয়াংলুর কথা কিংবা অযান্ত্রিকের বিমলের কথা | কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯২০ সালের ২০ নভেম্বর কলকাতার কালীঘাটে | বাবা মণীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন আইনজীবী | মা ভবানীদেবী | কালী লন্ডন মিশনারিতে প্রাথমিক এবং সত্যভামা ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন | পড়তেন রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) | কিন্তু পড়াশোনার থেকে খেলাধুলাই ছিল কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পছন্দের | কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনে বড়দা নরেন বন্দ্যোপাধ্যায় আর মেজদা রমেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব ছিল খুব বেশী | বড়দাকে দেখেই তিনি খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট হন আর মেজদা তাকে দিয়েছিলেন রাজনৈতিক দীক্ষা | পাশাপাশি করতেন নাটকে অভিনয় | ‘কেদার রায়’ নাটকে কার্ভালো-র চরিত্রে অভিনয় করে পুরস্কার পেলেন | পরই বন্ধুদের মধ্যে তাঁর নাম হয়ে গেল, ‘কার্ভালো কালী’ |

আরো পড়ুন:  ভারতীয় সঙ্গীত আধ্যাত্মিকতার উপর ভিত্তি করে তৈরী,ধর্মের উপর ভিত্তি করে নয়, বলেছিলেন নিখিল রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

সেনাবাহিনীর চাকরির স্বপ্নকে ছেড়ে দিল্লি থেকে কলকাতায় ফিরে নিজেই নাটকের দল বানালেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায় | মিনার্ভা থিয়েটারে আবার অভিনীত হল ‘কেদার রায়’ নাটক | কার্ভালো চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পেলেন দর্শকদের | সেই সূত্রেই আলাপ হল মহেন্দ্র গুপ্তর সঙ্গে | মহেন্দ্র গুপ্তর পরিচালনায় অভিনয় করলেন কিছু নাটকে | এসময়েই যুক্ত হয়ে পড়েন গণনাট্য সংঘের সঙ্গে | পাশাপাশি রাজনীতিও করতেন | ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যও ছিলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায় | আই পি টি এ-তে যোগ দিয়েছিলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায় | ক্রমশঃ ‘নয়ানপুর’, ‘সংকেত’, ‘ভাঙাবন্দর’, ‘বিসর্জন’ ‘দলিল’ নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের নিজের জাত চেনাতে লাগলেন তিনি |

১৯৪৭ সালে বর্মার পথে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম চলচ্চিত্র | তবে ১৯৫২ সাল থেকেই বাংলা চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করতে শুরু করেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায় | প্রথমবার নজর কাড়েন বরযাত্রী সিনেমায় ‘গনশা’র চরিত্রে অভিনয় করে | নীল আকাশের নিচে, অযান্ত্রিক, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, বাদশা, ডাকহরকরা, পরশপাথর, বাড়ী থেকে পালিয়ে, পুতুল নাচের ইতিকথা, নাগরিক ইত্যাদি ছবিতে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি | পরবর্তী কালে দাদার কীর্তি, গুরুদক্ষিণা ইত্যাদি বাণিজ্যিক ছবিতেও দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায় | কাজ করেছেন সত্যজিৎ রায়, তপন সিনহা, ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গেও |

আরো পড়ুন:  উদয়ন পন্ডিতদের মৃত্যু নেই...ছবিতে স্মরণ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে

প্রায় দেড়শো ছবিতে কাজ করেছেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায় । নাটক করেছেন একত্রিশটি । ১৯৫৬ সাল থেকে সংকটকাল কাটিয়ে কালীবাবু স্থিতু হন বাংলা নাটক ও সিনেমার নির্ভরযোগ্য চরিত্রাভিনেতা হিসেবে। কালী বন্দ্যোপাধ্যায় সব মিলিয়ে প্রায় দেড়শো ছবিতে কাজ করেছেন। নাটক করেছেন একত্রিশটি | তপন সিংহর অভিমত, “দুঃখ এটাই যে, ওঁকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারল না টালিগঞ্জ।”

অনেক সিনেমায় পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায় | আসলে কালের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন তিনি | ১৯৯৩ সালের ৫ জুলাই প্রয়াত হন কালী বন্দ্যোপাধ্যায় |

তথ্য : আনন্দবাজার পত্রিকা (সুদেষ্ণা বসু),উইকিপিডিয়া

Avik mondal

Avik mondal

Related post

Leave a Reply

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।