৪২ সিনেমায় অভিনয় দেখে জুতো ছুঁড়লেন দর্শক, বিকাশ বলেছিলেন,”আজ আমার অভিনয় সার্থক”

৪২ সিনেমায় অভিনয় দেখে জুতো ছুঁড়লেন দর্শক, বিকাশ বলেছিলেন,”আজ আমার অভিনয় সার্থক”

টিভি…. ইউটিউব…..নেটফ্লিকস্, বিনোদনের এখন কতো না মাধ্যম ! কিন্তু আমার মতো যাদের পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে জন্ম তাদের কৈশোরে বিনোদন বলতে ছিলো একটাই…. সিনেমা! স্কুল পালিয়ে বন্ধুদের সাথে ষাট পয়সার টিকিট কেটে হলে ঢোকার মজাই আলাদা। মফস্বলের হলগুলোতে তখন এসির বালাই নেই, সিনেমা শেষে বেরুতাম গেঞ্জি গায়ে দিয়ে। বছরে দুটো দিন আবার বিনে পয়সায় সিনেমা দেখা যেত, পনেরই আগস্ট আর ছাব্বিশে জানুয়ারি। স্রেফ স্কুল থেকে একটা টোকেন, ব্যাস কেল্লা ফতে!

তবে ঐদিন কোন মারকাটারি হিন্দি সিনেমা নয়, দেখানো হতো স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর কাহিনী। একটা সিনেমার কথা বেশ মনে আছে। স্বাধীনতা দিবসের সকালে দলবল নিয়ে বিনা পয়সায় ঢুকে বসে আছি চম্পা সিনেমা হলে। সাড়ে নটায় ছবি শুরু হলো।

পর্দা জুড়ে তেরঙা পতাকা। বুট দিয়ে পতাকা মাড়িয়ে, অসহযোগ আন্দোলনের নেতা অজয়কে বৃটিশ অফিসার মেজর ত্রিবেদী দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলছে, “দেখেছ? যাও হেঁটে এসো। Walk on it. হেঁটে এসো, যাও!”
চুপ করে দাঁড়িয়ে অজয়। কঠোর দৃষ্টিতে দাঁতে দাঁত চেপে মেজরের দৃঢ় উচ্চারণ, “You won’t! Alright! Then take it. Take it….”
মারের পর মার। বীভৎস মার। তারপর ঘাড় ধরে মেজর সেই স্বদেশী নেতাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল পতাকার কাছে। স্বদেশি আন্দোলনকারীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা মিশিয়ে মেজর দাঁত কিটমিট করে বলে উঠল, “Spit on it. I say, spit!”

আরো পড়ুন:  দুঃস্থ শিশুদের পাত পেড়ে ইলিশের স্বাদ উপভোগ করালেন অভিনেতা সোহম

আমার বয়সীদের নিশ্চয়ই মনে আছে?
ছবির নাম ’৪২’। উনিশশো বিয়াল্লিশের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের পটভূমিকায় এই ছবির পরিচালক ছিলেন হেমেন গুপ্ত, যিনি নিজে ছিলেন জেল-খাটা স্বাধীনতা সংগ্রামী। আর নিষ্ঠুর অফিসারের ভূমিকায়…..? বিকাশ রায় ।

১৯৫২ সালে মুক্তি পায় ছবিটি। প্রথম দিন ম্যাটিনি শো শেষ। কলেজের এক দঙ্গল ছেলে সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে মারমুখী হয়ে ছুটছে ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়োর দিকে। স্টুডিয়োর গেটে দারোয়ান। গেট বন্ধ। গেটের সামনে তুমুল গণ্ডগোল। গালিগালাজের ফোয়ারা ছুটছে। উত্তেজিত ছেলেদের দাবি, বিকাশ রায়কে তাঁদের হাতে তুলে দিতে হবে। তাঁরা বদলা চান। তুমুল চিৎকার, চেঁচামেচি শুনে বিকাশ রায় বাইরে বেরিয়ে এলে এক ছেলে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে বিকাশ রায়কে চটি ছুড়ে মারল। সেই চটি মাথায় নিয়ে বিকাশ বলেছিলেন, “আজ আমার অভিনয় সার্থক হল।”

নদীয়ার কল্যাণীর পরের স্টেশন মদনপুর। মদনপুর থেকে শিমুরালি যাওয়ার পথে অটোয় ৪ কিমি গেলেই বাংলা চলচ্চিত্র ও মঞ্চ জগতের অন্যতম কিংবদন্তি অভিনেতা বিকাশ রায়ের পৈতৃক বসতভিটা। প্রিয়নগর, দুর্লভপাড়া। এক সময়ে প্রাচুর্যে ভরপুর বিশালাকার বনেদি বাবুবাড়ি বাবুয়ানার ঘূর্ণিপাকে এখন নিশ্চিহ্নপ্রায়।

বিকাশ রায় ছিলেন ধনী ও বনেদি পরিবারের সন্তান। পারিবারিক আভিজাত্য যেন চুঁইয়ে পড়ত তাঁর আচার-আচরণ, অভিনয়ে। বড় হয়েছিলেন এক মুক্ত পরিবেশে। তাঁর পিতামহ ছিলেন প্রথম যুগের হিন্দু কলেজের ইংরাজি জানা, বড়লোক বাপের উড়নচণ্ডী ছেলে। বিকাশের জন্ম ১৬ই মে, ১৯১৬ সাল, কলকাতার ভবানীপুরে। পিতা যুগলকিশোর রায় ছিলেন কলকাতা চিড়িয়াখানার কর্মচারী। ভারতের বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় তাঁর জীবজন্তু সরবরাহের ব্যবসাও ছিল। যুগলকিশোরের দুই ছেলে। বড় ছেলে প্রকাশ বিলেতে গিয়ে এক মেমকে বিয়ে করেন। অকালে যক্ষ্মায় ভুগে মারা যান। ছোট ছেলে বিকাশ।

আরো পড়ুন:  শারীরিক শক্তি দিয়ে বাঘ সিংহকে বশ করতেন তিনি,বাঙালি মনে রাখেনি "ব্যাঘ্রবীর শ্যামাকান্ত"কে

মাত্র দশ বছর বয়সে মাকে হারান। কলকাতার মিত্র ইন্সটিটিউশন থেকে ১৯৩২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন ১৯৩৬ সালে। সিনেমা থিয়েটারের ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় ‘বেদুইন’ নামে একটা সাহিত্য পত্রিকাও প্রকাশ করতেন।

বি.এল (আইন) পাশ করেন ১৯৪১ সালে। কর্মজীবন শুরু হয় এক ব্যারিস্টারি ফার্মের জুনিয়র হিসাবে। মজার ব্যাপার, অভিনয় জগতে যিনি ব্যারিস্টারের ভূমিকায় বিভিন্ন চরিত্রে তুখোড় অভিনয় করে দর্শকদের অকুণ্ঠ প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন, সেই বিকাশ রায় বাস্তবে ওকালতি পেশায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। বিয়ে হয়েছিল মাত্র ২২ বছর বয়সে। এই সময় খুবই দুরবস্থার মধ্যে ভবানীপুরের ভাড়া বাড়িতে স্ত্রী কমলা ও দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে অতি কষ্টে দিনযাপন করছিলেন। ওকালতি ছেড়ে চাকরি নিলেন সরকারি সিভিল ডিফেন্স বিভাগে, হেড ক্লার্কের। সেখানেও থাকলেন না। মাত্র আশি টাকার মাস মাইনেতে চাকুরি নিলেন রেডিয়োর ঘোষকের।

আরো পড়ুন:  লিখেছেন বহু কালজয়ী বাংলা গান,প্রাপ্য সম্মান পাননি গীতিকার শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

সময়টা ১৯৪৬। অল ইন্ডিয়া রেডিয়োয় সামান্য অ্যানাউন্সারের চাকরি করছেন বিকাশ রায়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রায়ই মতভেদ লেগে থাকত। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বিকাশকে এক দিন বললেন, তুমি ফিল্মে যোগ দাও বিকাশ, তোমার হবে।

হঠাৎই সু্যোগ এল সিনেমায় অভিনয় করার। সেই সময় চিত্রনাট্যকার জ্যোতির্ময় রায়, বছর তিরিশের যুবক বিকাশ রায়কে নিয়ে গেলেন পরিচালক হেমেন গুপ্তের কাছে।
১৯৪৭ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি। মুক্তি পেল হেমেন গুপ্তের পরিচালিত ছবি ‘অভিযাত্রী’। রাধামোহন ভট্টাচার্য, নির্মলেন্দু লাহিড়ি, কমল মিত্র, শম্ভু মিত্র, বিনতা রায়ের মতো বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে বাংলার দর্শক প্রথম পরিচয় পেল অভিনেতা বিকাশ রায়ের।

সিনেমার পাশাপাশি দাপটের সাথে অভিনয় করেছেন মঞ্চে। বারোশ রজনীর বেশি অভিনীত হয়েছিল ‘নহবত’। স্বাক্ষর রেখেছেন শ্রুতি নাটকেও। আকাশবাণী তে তৃপ্তি মিত্রর সাথে শুকসারী নাটকের কথা আজও অনেকের স্মৃতির মণিকোঠায়। পরিচালনা করেছেন মরুতীর্থ হিংলাজ, দেবতার গ্রাস, কেরি সাহেবের মুন্সীর মতো সফল চলচ্চিত্রের। ১৬ই এপ্রিল ১৯৮৭ জীবনের রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন এই প্রতিভাবান অভিনেতা।

-স্বপন সেন
তথ্য সৌজন্যে: আনন্দবাজার পত্রিকা

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।