হাস্যরসের আড়ালে অভিনীত হল ইংরেজদের অত্যাচারের স্বরূপ,গ্রেফতার হলেন অমৃতলাল বসু

হাস্যরসের আড়ালে অভিনীত হল ইংরেজদের অত্যাচারের স্বরূপ,গ্রেফতার হলেন অমৃতলাল বসু

১৮৭৬ সালে বলবৎ হয়েছিল নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন। তার পশ্চাতে প্রত্যক্ষ কারণ ছিল ঐ বছরেই ফেব্রুয়ারী মাসে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে মঞ্চস্থ হওয়া ‘গজদানন্দ ও যুবরাজ’। আর ঐ নাটকে অভিনয় করার কারণে পুলিশ গ্রেফতার করে নাট্যাভিনেতা, নাট্যনির্দেশক তথা গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের ম্যানেজার অমৃতলাল বসুকে।হইহই পড়ে যায় বাংলা জুড়ে। কি এমন ছিল ঐ প্রহসনে যে রঙ্গালয়ের ম্যানেজারকে কয়েদ করতে হল? আসলে হাস্যরসের আড়ালে যে অভিনীত হয়েছিল ইংরেজদের শোষক-স্বরূপ। প্রিন্স অব ওয়েলসের কলকাতায় আগমন, উকিল জগদানন্দের বাড়িতে অবস্থান এবং একজন রাজভক্তের চাটুকারিতাকে ব্যঙ্গ করে এই প্রহসন রচনার সাহস দেখিয়েছিলেন উপেন্দ্রনাথ দাস আর তা মঞ্চস্থ করার এবং অভিনয় করার স্পর্ধা করেছিলেন অমৃতলাল বসু, ভারতীয় নাটকের ইতিহাসে যাঁর প্রসিদ্ধি ‘রসরাজ’ রূপে।

এককালে যে পুলিশ বিভাগের কর্মচারী ছিলেন, সেই পুলিশের হাতেই বন্দি হলেন রসরাজ। তবে তাঁর এই যাত্রাপথ ছিল বর্ণময়। ১৮৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাটে তাঁর জন্ম। কলকাতার জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে ১৮৬৯ খ্রীষ্টাব্দে এন্ট্রান্স পাস করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। দুবছর ডাক্তারি পড়ার পর কাশী গিয়ে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা প্রণালী শিখলেন এবং কলকাতায় কিছুদিন এর চর্চাও করেন। এ ছাড়া তিনি কিছুকাল স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তারপর ভালো না লাগায় পোর্টব্লেয়ারে সরকারি চিকিৎসকের চাকরি নিয়ে চলে যান। সেখানেও কিছুদিন পর মন না টেকায় কলকাতায় ফিরে এসে পুলিশ বিভাগে যোগ দেন। কিন্তু আসল আকর্ষণ তাঁর ছিল থিয়েটারের প্রতি। সেই কারণেই কোনো পেশায় স্থায়ী হতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি নাটক রচনা ও অভিনয়ে মনোনিবেশ করেন এবং কালক্রমে হয়ে উঠলেন উনিশ শতকের বাংলা রঙ্গালয়ের একজন সফল অভিনেতা, দক্ষ মঞ্চাধ্যক্ষ, খ্যাতনামা নাট্যকার ও গীতিকার।

আরো পড়ুন:  মৃত সন্তানের দেহের সামনে দাঁড়িয়েও কবিগুরুর গানের শুদ্ধতাকে নষ্ট হতে দেননি সুবিনয় রায়

অমৃতলাল বসুর মঞ্চে প্রথম অবতরণ হয় দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটকের মধ্য দিয়ে। সমকালীন অপর এক প্রখ্যাত নাট্যবিশারদ অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফির আনুকূল্যে ১৮৭২ সালে ন্যাশনাল থিয়েটারে মঞ্চস্থ নীলদর্পণ নাটকে সৈরিন্ধ্রীর ভূমিকায় প্রথম অভিনয় করেন অমৃতলাল। কালক্রমে নাট্য সম্রাট গিরিশচন্দ্র ঘোষের সঙ্গেও অমৃতলাল বসুর পরিচয় হয়। সেই পরিচয় গড়ায় ঘনিষ্ঠতায়। গিরিশ ঘোষের বদান্যতাতেই অমৃতলাল ১৮৭৫ সালে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের ম্যানেজার পদে নিযুক্ত হলেন। প্রায় তেরো বছর অমৃতলাল এই দায়িত্ব সামলেছিলেন। ১৮৮৮ সালে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার ভেঙে যাওয়ার পর যোগ দিলেন স্টার থিয়েটারে এবং দীর্ঘ ২৫ বছর এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আরো পড়ুন:  বাংলা গানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অভিনব উদ্যোগ দশ গিটারিস্টের

বাংলা সাহিত্যের নাটক ও অভিনয় জগতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন অমৃতলাল। প্রহসন ও ব্যঙ্গ রচনাতেই তাঁর কলম ছিল অধিক সার্থক ও বাঙ্ময়। সমকালের নাগরিক ও গ্রামীণ সমাজের নানা দিক নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক নাটক রচনা করেছিলেন। এর জন্য যেমন সমাজের এক শ্রেণির প্রশংসা পেয়েছিলেন তেমনি অপর শ্রেণির নিন্দারও ভাগী হয়েছিলেন। রঙ্গ-ব্যঙ্গমূলক নাটক রচনা ও তাতে মঞ্চমাতানো অভিনয়ের গুণেই বাংলার সুধীসমাজ তাঁকে ভূষিত করেছিলেন ‘রসরাজ’ উপাধিতে। নাটক, প্রহসন ও নকশা মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ। সেগুলির মধ্যে ‘তিলতর্পণ’, ‘বিবাহ বিভ্রাট’, ‘তরুবালা’, ‘কালাপানি’, ‘বাবু’, ‘বিমাতা’, ‘আদর্শ বন্ধু’, ‘অবতার’, ‘চোরের উপর বাটপাড়ি’ ইত্যাদি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তবে নাটক ছাড়াও গল্প-কবিতা-উপন্যাস রচনাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। প্রথম দিকে কবির লড়াইয়ের কবিতা ও হাফ-আখড়াই গান লিখেও তিনি জনপ্রিয় হয়েছিলেন। ‘পুরাতন প্রসঙ্গ’, ‘পুরাতন পঞ্জিকা’ ও ‘ভুবনমোহন নিয়োগী’ নামে তাঁর তিনটি আত্মস্মৃতিমূলক রচনাও পাওয়া যায়।

আরো পড়ুন:  মানতে পারেননি দেশভাগ,বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে তথ্যচিত্রও বানিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক

থিয়েটারের জগতের বাইরেও অমৃতলালের পদচারণা ঘটেছিল আরও বিস্তৃত ভূমিতে। স্যার সুরেন্দ্রনাথের সহকর্মীরূপে, স্বদেশী যুগের কর্মী এবং বাগ্মী হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন। শ্যামবাজার অ্যাংলো-ভার্নাকুলার স্কুলের সেক্রেটারি, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহসভাপতি এবং কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির সভ্য ছিলেন অমৃতলাল। তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘জগত্তারিণী’ পদকে সম্মানিত করে। ১৯২৯ সালের ২ জুলাই মহান নাট্যকার অমৃতলালের জীবনাবসান হয়। পরাধীন বাঙালীকে অনাবিল হাস্যরসে সিক্ত করার মাধ্যমেই জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন রসরাজ অমৃতলাল। ‘গজদানন্দ ও যুবরাজ’-এর আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা এবং তার প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ আইন জারি তাঁর সফলতারই পরিচায়ক।

-শ্রেয়সী সেন

তথ্যসূত্র – উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।