১৫০ বছর আগে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় সাহিত্যচর্চা বাঙালি তরুণীর,২১ বছর বয়সে অকালপ্রয়াণে থেমেছিল সব

১৫০ বছর আগে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় সাহিত্যচর্চা বাঙালি তরুণীর,২১ বছর বয়সে অকালপ্রয়াণে থেমেছিল সব

পুরো দুটো শতক পিছিয়ে ১৮০০ সালের মাঝামাঝি সময়ের ফ্লাশব্যাকে চলুন, স্মৃতিপটে উঠে আসবে অল্পবয়সী এক সুন্দরী বাঙালি তরুণীর নাম ৷ বঙ্গ সমাজে সবে তখন পাশ্চাত্য শিক্ষা চুঁইয়ে চুঁইয়ে এসে পড়ছে গুটিকতক ব্যতিক্রমী মানুষের কাছে। পরিবর্তন হচ্ছে তাদের চিন্তা-চেতনা-মনন। কিন্তু সব কিছুই হচ্ছে পুরুষদের আবর্তে। সমাজের বাকি অর্ধেক আকাশ অর্থাৎ নারীর শিক্ষা আক্ষরিক অর্থে তখনও রাত্রির মত নিকষ অন্ধকার। ভাবা যায় সেই আঁধারেও বিদেশের মাটিতে ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় নিজের কলমে ফুল ফোটাচ্ছেন এক বাঙালি তরুণী ৷তিনিই প্রথম বাঙালি মহিলা যিনি ফরাসি ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই সমান দাপটের সঙ্গে লিখেছেন। অকালেই ঝরে যাওয়া সেই বাঙালি কবি-সাহিত্যিক হলেন তরু দত্ত৷ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনার জন্য বাঙালি হিসেবে মাইকেল মধুসূদন দত্ত যদি অগ্রণী পুরুষ হন,তাহলে নারীদের মধ্যে তিনি৷স্বল্পায়ু জীবনে যা কিছু করেছিলেন বিস্ময়ের উদ্রেক করে সাহিত্য অনুরাগী ও গবেষকদের।

তরু দত্ত অকালেই ঝরে যাওয়া শুকতারা৷।তাঁর জীবনের গল্প নিশ্চয়ই আমরা শুনবো,তবে আগে বলতেই হয় শিক্ষা সংস্কৃতিতে তাদের পারিবারিক ঐতিহ্যের কথা৷ একই সঙ্গে আইসিএস ও ব্যারিস্টার রমেশচন্দ্র দত্তের ঠাকুরদার নাম রসময় দত্ত৷৷সেই রমেশচন্দ্র,যিনি বই লেখার ডাক পেয়েছেন ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা’ থেকে৷ একদিকে তিনি যেমন ছিলেন ইংরেজদের ইংরেজ, আবার নিরন্তর বাঙালি৷ ব্রিটিশ সরকার কত পরিকল্পিত পদ্ধতিতে শোষন করেছে ভারতকে,তা তিনি লিখেছেন ‘Economic History of British India’ নামক বইয়ে৷ রসময় দত্তের নাতি বিখ্যাত লেখক সাংবাদিক,স্কলার রজনীপাম দত্ত যিনি অক্সফোর্ডে পড়ার সময় সোশালিস্ট সোসাইটি তৈরি করে রুশ বিপ্লবকে সমর্থন করেছিলেন৷ অনেকে হয়ত অবগত নন ব্রিটেনে এই দত্ত বাঙালিই ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য৷ রামবাগানের দত্ত পরিবার ও রসময় দত্তের কথা বলতে হচ্ছে কারণ অনেকে বলেন বঙ্গ সংস্কৃতির নীল রক্তের একচ্ছত্র আধিপত্য কেবল ঠাকুরবাড়ির একার নয়,সেই ঐতিহ্যের আর এক অংশীদার রামবাগান দত্ত বাড়ি ! নীলমণি দত্ত রামবাগান দত্ত বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা হলেও তাঁর বড় ছেলে রসময় পরিবারকে বিখ্যাত করেছেন৷তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি আদালতের প্রথম ভারতীয় বিচারপতি৷বাংলার নবজাগরনে অবদান রাখা সেই দত্ত পরিবারের সন্তান তরু দত্ত৷ পৃথিবীর প্রথম আলো তরু দত্ত দেখেছিলেন ৪ মার্চ, ১৮৫৬ ৷বাঙালির আর এক প্রিয় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মত তাঁর জীবনের আয়ু ছিল মাত্র ২১ বছর৷ মৃত্যুর আগে তিনি দেখে যেতে পারেননি তাঁর রচিত ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় ছাপা দুটো উপন্যাস ৷

আরো পড়ুন:  স্পষ্টবাদিতা থেকে এসেছিল তাঁর হুতোম প্যাঁচার নকশা লেখার অনুপ্রেরণা

রামবাগান দত্ত বাড়ির ছেলে রসময়ের পুত্র হলেন গোবিন্দচন্দ্র৷তিনি চমৎকার ইংরেজি কবিতা লিখতেন,তাঁর সহধর্মিনী ক্ষেত্রমণিও বাংলা ইংরেজি চমৎকার জানতেন, বলতেন৷তাদেরই কন্যা সন্তান তরু দত্ত৷বাবার সাহিত্যপ্রেম তথা কবিতা প্রীতিই সঞ্চারিত হয়েছিল তরু ও তাঁর ভাইবোনের মধ্যে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে একমাত্র ছেলের মৃত্যুর পরে গোবিন্দ দত্ত পাড়ি দিলেন ইউরোপের উদ্দেশ্যে | পরিবারের সঙ্গে ফ্রান্সে গেলেন তরু। ইউরোপে থাকার সময় ফরাসি সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে নিমগ্ন হয়ে পড়াশোনা করতে থাকেন। ফরাসি সাহিত্যে সদ্য তরুণী তরুর সাবলীলতা দেখে পরবর্তী কালে কবি-সমালোচক এডমন্ড গস লিখেছিলেন, ‘তরু ওয়াজ় আ বেটার ফ্রেঞ্চ দ্যান ইংলিশ স্কলার’। কেমব্রিজে অধ্যয়ন করেছেন ইংরেজি সাহিত্য,ফরাসি সাহিত্য৷ইউরোপিয়ান সাহিত্য-সংস্কৃতির মূল্যবোধের নির্যাস শুষে নিয়ে দেশে ফিরে চর্চা করেছেন সংস্কৃত ভাষা ও তার সাহিত্য৷জার্মান ভাষায়ও দখল ছিল বিরল প্রতিভার এই বাঙালি কন্যার৷স্বল্প দিনের জন্য পৃথিবীর অতিথি ছিলেন তরু দত্ত৷তারই মাঝে রেখে গিয়েছেন তাঁর প্রতিভার সাক্ষ্য৷ বিদেশ থেকে কলকাতায় ফিরে এসে বই আনতেন ফ্রান্স থেকে৷সেই সময়ে ফরাসি ভাষা থেকে দেড়শ কবিতা তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন৷সেই সংকলনের নাম দেওয়া হয় ‘A Sheaf gleaned in French Fields’ | প্রকাশিত হয় ১৮৭৬সালে।তরু দত্ত রচিত শ্রীমতি দ্যারভ্যারের দীনপুঞ্জি’ (Le Journal de Mademoiselle d’Arvers) কে বলা হয়, প্রথম ভারতীয় সাহিত্যিকের লেখা ফরাসি ভাষার উপন্যাস আর বিয়াঙ্কা, এক তরুণী স্প্যানিশ পরিচারিকার কাহিনী (Bianca, or the Young Spanish Maiden )কে বলা হয় ইংরেজিতে লেখা প্রথম ভারতীয় নারী সাহিত্যিকের সাহিত্য সৃষ্টি৷৷তাঁর মৃত্যুর পাঁচ বছর পরে প্রকাশিত হয়েছিল তরু দত্তের বিখ্যাত বই ‘Ancient Ballads and Legend of Hindustan’ ৷ প্রয়াণের দু’বছর পরে প্যারিস থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ফরাসি বই ‘La Joumal de Madmoisslle’ ৷তরু দত্তের চিঠির সংকলনও প্রকাশ পায়। বিদেশি বন্ধুদের লেখা চিঠি এবং বিদেশ থেকে দেশে আত্মীয়দের লেখা চিঠি আছে সেই চিঠির সংকলনে৷ চিঠিগুলো থেকে উনিশ শতকে মানুষের জীবনযাত্রা, প্রকৃতিপ্রেম, মানবচেতনা,সম্পর্কে তরু দত্তের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ মেলে৷ উনিশ শতকের একজন নারী যিনি বড় হয়ে ওঠার সময় পড়াশোনা করেছেন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মত দেশে তাঁর দেখার দৃষ্টিভঙ্গি একটু ভিন্ন হবে বলাই বাহুল্য৷

আরো পড়ুন:  কবিতা ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম প্রেম,যত কবিতা লিখেছেন তা সবই নীরার জন্য

১৮৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে তরু দত্ত তাঁর বান্ধবী মিস মেরি মার্টিনকে একটি চিঠিতে অকপটে কলকাতায় যুবরাজ-দর্শন সম্পর্কে নিজের স্বাধীন মতামত রাখতে কুন্ঠা বোধ করেননি৷ যুবরাজ সেই সময় কেমন সুপুরুষ ছিলেন সেই বর্ণনা আছে চিঠিতে৷প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আশ্চর্যের মেলন্ধন ঘটেছে তাঁর লেখনীতে৷ ৩০ আগস্ট ১৮৭৭ সালে অকালেই প্রয়াত হন বিরল প্রতিভাময়ী কবি-সাহিত্যিক তরু দত্ত৷তাঁর অকাল মৃত্যুর পরে আবিষ্কৃত হয় ফরাসি ভাষায় তাঁর রচিত উপন্যাস ‘লা জার্নাল’ ও ইংরেজিতে লেখা ‘বিয়াঙ্কা’র পাণ্ডুলিপি। খুঁজে পাওয়া যায় ‘এনসিয়েন্ট ব্যালাডস’ ও ‘লিজেন্ডস অব হিন্দুস্তান’ নামে দুটি বইয়ের পাণ্ডুলিপিও। তরুর বাবা গোবিন্দচন্দ্র সন্তানের অমর সৃষ্টির সব সাহিত্য কর্ম পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন৷ বইগুলো প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ‘লা জার্নাল’ অনুবাদ করে বসুমতি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ১৯৫৬ সালে বই আকারেও প্রকাশিত হয়। ভূমিকা লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র।তরু দত্ত প্রথম ভারতীয় বাঙালি যিনি মনেপ্রাণে ভারতীয় হয়েও সাহিত্য প্রতিভার মাধ্যমে এক হাতে ফরাসি অন্য হাতে ইংরেজি সাহিত্যকে ছুঁয়েছিলেন।সাহিত্যের মাধ্যমে মেলবন্ধন করেছেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আজ থেকে প্রায় ১৫০বছর আগেই৷সারা পৃথিবীর কবিতাপ্রেমী মানুষের কাছে এখনো প্রিয় তরু দত্তের বিখ্যাত কবিতা ‘আওয়ার ক্যাসুরিনা ট্রি’৷যিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন আমাদের কলকাতা শহরে,অথচ তাঁর খবর বোধহয় আমরা অনেকে ভুলে গিয়েছি৷

আরো পড়ুন:  বাংলা ভাষায় প্রথম বিজ্ঞান-নির্ভর সাহিত্যের সৃষ্টিকর্তা ছিলেন বিজ্ঞান-সাধক রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী

-অরুনাভ সেন
তথ্যঋণ রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়,সংবাদ প্রতিদিন

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।