”Father of Indian Journalism” সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়

”Father of Indian Journalism”  সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়

এক সময় ভারতে তিন জন শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হত৷ ট্রিবিউন-এর কালীনাথ রায়, লীডার-এর সি ওয়াই চিন্তামণি এবং মডার্ন রিভিউ-এর রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। প্রসঙ্গত, বিংশ শতকের শুরুতে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের চেষ্টাতেই বাঙালির আত্মপরিচয় খোঁজার প্রয়াস শুরু হয়, কিন্তু বাংলার বাইরে; রামানন্দের সম্পাদিত ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়৷ কিন্তু সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একঝলকে দেখে নিই কে ছিলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়।

বাঁকুড়ার পাঠকপাড়া গ্রামে 1865 খ্রীষ্টাব্দের 29শে মে তাঁর জন্ম। শ্রীনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং হরসুন্দরী দেবীর তৃতীয় সন্তান রামানন্দ 1883 খ্রীষ্টাব্দে বাঁকুড়া জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে কলকাতায় এলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। 1885-তে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে এফ.এ পাশ করে ইংরেজি নিয়ে ভর্তি হলেন সিটি কলেজে। সেখান থেকেই 1888-তে বি.এ-তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে অর্জন করলেন মাসিক পঞ্চাশ টাকা বৃত্তির রিপন স্কলারশিপ। ঐ সময়েই রামানন্দের পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন সিটি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক তথা ব্রাহ্ম সমাজ-সংস্কারক হেরম্বচন্দ্র মৈত্র তাঁকে ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র ‘Indian Messenger’-এর সহযোগী সম্পাদকের পদ গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। এই পত্রিকাটির হাত ধরেই রামানন্দের সাংবাদিক সত্ত্বার বিকাশ ঘটতে শুরু করল। একই সঙ্গে 1890-তে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ইংরেজিতে এম.এ পাশ করেন।

1893-তে রামানন্দ সিটি কলেজে প্রভাষক বা লেকচারারের পদে যোগ দিলেন। ঐ বছরই জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে যৌথভাবে শিবনাথ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় রামানন্দ চট্যোপাধ্যায়ের হাতে জন্ম নিল শিশুদের জন্য একটি পত্রিকা – ‘মুকুল’। কিন্তু দুবছরের মধ্যেই কলকাতা ছাড়লেন রামানন্দ। এলাহাবাদের একটি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে চলে গেলেন সেখানে। কিন্তু বাংলায় লেখালেখি ছিল অব্যাহত। 1897-তে প্রধান সম্পাদক রূপে যোগ দিলেন বাংলা সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রদীপ’-এ। তবে কিছুদিনের মধ্যেই মতান্তরের কারণে ঐ পত্রিকার সংস্পর্শ ত্যাগ করে এলাহাবাদ থেকেই স্বতন্ত্র ভাবে প্রকাশ করলেন ‘প্রবাসী’ পত্রিকা। সালটা 1901। প্রবাসীর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কারণে ছয়বছর পর 1907-এ মডার্ন রিভিউ নামে ইংরেজিতে আরও একটি পত্রিকার উদ্বোধন করলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। এছাড়াও ‘বিশাল ভারত’ নামে একটি হিন্দি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

আরো পড়ুন:  দেশের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বর্ধমানের এই বঙ্গসন্তান

বস্তুতঃ, সর্বভারতীয় প্রেক্ষিতে যে বাংলা প্রবাসী-র চেয়ে ইংরেজি মডার্ন রিভিউ-ই বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল, তা খুব স্বাভাবিক ৷ কিন্তু বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি এমনকী বাংলার ভৌগোলিক মানচিত্র থেকেও বেরিয়ে গিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সাময়িকপত্র প্রকাশের প্রথম চেষ্টাটা প্রবাসী-তেই ছিল৷ উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল প্রথম সংখ্যা থেকেই৷ রামানন্দ নিজে দীর্ঘ সচিত্র প্রবন্ধ লিখেছিলেন, ‘অজণ্টা গুহা চিত্রাবলী’৷ অজন্তা নিয়ে প্রবন্ধ বাংলা ভাষায় সম্ভবত সেই প্রথম৷ ‘প্রবাসী’ যে কবিতা-গল্প-উপন্যাস-নকশায় ভরা আরও একটা বাংলা পত্রিকামাত্র নয় তার প্রমাণ ছিল প্রথম বর্ষের সূচিতেই৷ জীববিদ্যা, শর্করা বিজ্ঞান, জগদীশচন্দ্র বসুর আবিষ্কার, জাপান ভ্রমণ, ফতেপুর সিক্রি, হিন্দি পরিভাষা, হিন্দু, গ্রিক ও রোমান, মেয়েলি সাহিত্য ও বার-ব্রত— বাঙালির মননচর্চার নানা দিক প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন রামানন্দ, বিংশ শতকের সেই প্রথম বছরেই৷ প্রচ্ছদেও ভারতীয়ত্বের একটা বার্তা ছিল— মঠ-মন্দির, চৈত্য-বিহার, তাজমহল-মিনার, অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির, তখনকার ব্রহ্মদেশের প্যাগোডার ছবি দিয়ে কোলাজ করে তৈরি হয়েছিল প্রচ্ছদ৷

আরো পড়ুন:  অর্থাভাবে ঠাঁই হয়েছে মেমারি স্টেশনে,মাত্র ৫০ টাকায় পোর্ট্রেট এঁকে জীবনযুদ্ধের লড়াই লড়ছেন চিত্রশিল্পী শিবহরি দে

বাঙালিকে প্রথমে ‘ভারতীয়’ ভাবার ও ভাবানোর এই মানসিকতা ধারাবাহিক ভাবে প্রবাসী এবং পরে মডার্ন রিভিউ-তে প্রবল ভাবে বজায় রেখেছিলেন রামানন্দ ৷ তবে রামানন্দের ভারতবর্ষ মোটেই এলিটের ভারত ছিল না ৷ ভারতীয় নানা ভাষার সাহিত্যের অনুবাদ যেমন প্রকাশিত হত, পাশাপাশি চাকমা, নাগা, খাসিয়া, কোল প্রভৃতি আদিবাসীদের জীবনসমস্যাও আলোচিত হত৷ কোনও সঙ্কীর্ণ, কুণ্ঠিত বাঙালিয়ানার স্থান ছিল না ৷ নির্বিচারে বিদেশি-বর্জনের যুগেও নিয়মিত রাফায়েল, বিসোঁ, হফম্যান প্রমুখ ইউরোপীয় শিল্পীদের বিশ্বখ্যাত ছবিগুলির পাশাপাশি রাজা রবিবর্মা, গণপত কাশীনাথ ক্ষাত্রে, মহাদেব বিশ্বনাথ ধুরন্ধর, অবনীন্দ্রনাথ-গগনেন্দ্রনাথের বিখ্যাত ছবিগুলির প্রতিরূপ ছেপে গিয়েছেন রামানন্দ ৷ সমালোচনার উত্তরে জানিয়েছিলেন, শিল্পের কোনও দেশ বা জাতিবিচার তাঁর কাছে নে ই৷ রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষকে যে উপন্যাসে সবচেয়ে স্পষ্ট করে পাওয়া যায় সেই ‘গোরা’-ও প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল প্রবাসী-তেই; বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলন তথা স্বদেশীর সেই আগুনের মধ্যে (1907)।


বোঝাই যায়, তিনি ছিলেন উল্টোপথের পথিক৷ কূপমণ্ডূকতা থেকে মুক্তির সাধনাতেই তিনি অন্য রকম বাঙালি৷ তাঁর সেই অনন্য মুক্তিচিন্তার সাহসের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটল যখন 1906 খ্রিস্টাব্দে প্রবাসী-তে ”স্বদেশী প্রসঙ্গ” প্রবন্ধে , ”কেহ যদি জিজ্ঞাসা করে, এ বৎসর আমাদের দেশে সর্ব্বপ্রধান স্বদেশী ঘটনা কি ঘটিয়াছে, তাহা হইলে আমরা কি উত্তর দিব? চুড়ি ভাঙ্গা নয়, বিলাতী কাপড় পোড়ানো নয়, জাতীয় দলের সহিত মোকদ্দমায় পূর্ব্ববঙ্গের গবর্ণমেণ্টের পরাজয়ও নয়, এমন কি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়াদি স্থাপনও নয়, সর্ব্বপ্রধান স্বদেশী ঘটনা বিজ্ঞানাচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসুর উদ্ভিদের সাড়া (Plant Response) নামক গ্রন্থ প্রকাশ ৷”

আরো পড়ুন:  অসুস্থ কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রীকে সুস্থ করলেন ডাক্তার বিধান রায়, ফি হিসেবে চাইলেন "দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা"

রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে সংবাদপত্রের প্রধান ভূমিকা ছিল বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন চিন্তাশীল মানুষের মূল্যবান মতামতকে সরল বোধগম্য ভাষায় এমনভাবে সর্বসমক্ষে উপস্থাপন করা যাতে একজন স্বল্পশিক্ষিত মানুষও তা অনুধাবন করতে পারেন। অথচ সাংবাদিক হবেন সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ। জাতিগত আবেগের সাথে সাংবাদিকের লেখনীতে মিশে থাকবে আন্তর্জাতিক চেতনা। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি বাঙালী তথা ভারতবাসীর চেতনাকে জাগ্রত করার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর লেখনীতে তুলে ধরতেন পৃথিবীর অন্যত্র ঘটে চলা শ্রমিক আন্দোলনের ইতিবৃত্ত।

পত্রিকার সম্পাদনা ছাড়াও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় বেশ কিছু বাংলা ও ইংরেজি গ্রন্থও রচনা করেন। তার মধ্যে 1917 সালে রচিত ‘Towards Home Rule’ গ্রন্থটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা সাহিত্যের যে আন্দোলন সঙ্ঘটিত হয়েছিল, তার পশ্চাতে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকা ছিল দৃঢ়মূল। 1926 খ্রিষ্টাব্দে জেনিভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে তিনি ভারতবর্ষের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও ছিল তাঁর বিশেষ ঘনিষ্ঠতা। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তিনি বিশ্বভারতী আশ্রমিক সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। 1943 খ্রীষ্টাব্দের 30শে সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।

বাঙালীকে তিনি জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন এক অন্যতর সত্যের আলোকে; কূপমণ্ডুকতার অন্ধকার থেকে বাঙালীকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছিলেন এই বিবিধ-পথগামী কর্মবীর বাঙালী।

-শ্রেয়সী সেন

-তথ্যসূত্র – আনন্দবাজার পত্রিকা ও উইকিপিডিয়া

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।