দুর্ঘটনায় বুকে এসে লাগল গাড়ির স্টিয়ারিং,ঘটনাস্থলেই মারা গেলেন ছবি বিশ্বাস

দুর্ঘটনায় বুকে এসে লাগল গাড়ির স্টিয়ারিং,ঘটনাস্থলেই মারা গেলেন ছবি বিশ্বাস

‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিতে অভিনয় করানোর জন্যে সত্যজিৎ রায় কথা বলতে গেলেন | তিনি চিত্রনাট্য পড়ে বেশ খুশি হলেন | রাজিও হয়ে গেলেন তিনি | কিন্তু যেই শুনলেন শুটিংয়ের জন্যে দীর্ঘদিন আউটডোরে থাকতে হবে সঙ্গে সঙ্গে বেঁকে বসলেন | সত্যজিৎ রায়কে তিনি বললেন সোম থেকে বুধ আউটডোরে শুটিং ঠিক আছে কিন্তু বৃহস্পতিবার আমাকে কলকাতা ফিরতেই হবে কারণ প্রত্যেক সপ্তাহে বৃহস্পতিবার থেকে রবিবার আমার থিয়েটার আছে | সত্যজিৎ রায় বললেন এটা অসম্ভব | সঙ্গে সঙ্গে তিনিও বলে দিলেন ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিতে অভিনয় করা তার পক্ষে অসম্ভব | সত্যজিৎ রায় ফিরে গেলেন | এরপর তিনি পরের দিন গিয়ে থিয়েটারের সবাইকে বললেন এই কথা | সবাই শুনে অবাক | থিয়েটারের অভিনেতারাই তাকে বোঝালেন আপনি কাকে না বললেন জানেন? থিয়েটার আসবে যাবে কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় অভিনয়টা ইতিহাসে থেকে যাবে | শেষে তিনি আবার গেলেন সত্যজিৎ রায়ের কাছে | ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিতে অভিনয় করতে সম্মতি জানালেন | আর বাকিটা ইতিহাস | শুটিংয়ের সময় সত্যজিৎ রায় দেখেছিলেন পাতার পর পাতা সংলাপ তার ঠোঁটস্থ | সত্যজিৎ রায়ের সাথে তিনি ‘জলসাঘর’, ‘দেবী’,‘পরশপাথর’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন | স্বয়ং সত্যজিত্ রায় পরে বলেছিলেন, “ছবিবাবু না থাকলে ‘জলসাঘর’-এর মতো চিত্ররূপ দেওয়া সম্ভব হত কিনা জানি না। বোধ হয় না। এক দিকে বিশ্বম্ভর রায়ের দম্ভ ও অবিমৃষ্যকারিতা, অন্য দিকে তাঁর পুত্রবাৎসল্য ও সঙ্গীতপ্রিয়তা এবং সব শেষে তাঁর পতনের ট্র্যাজেডি— একাধারে সবগুলির অভিব্যক্তি একমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল।”

আরো পড়ুন:  অন্তর্দৃষ্টি দিয়েই সুরসাধনা করতেন তিনি,পঙ্কজকুমার মল্লিকের কথায় ''সে যুগের শ্রেষ্ঠ পুরুষ গায়ক কৃষ্ণচন্দ্র দে''

তিনি কিংবদন্তি ছবি বিশ্বাস | তার জন্ম ১৯০০ সালের ১৩ জুলাই বারাসতের জাগুলিয়ায় দে বিশ্বাস জমিদারি পরিবারে | বাবা ভূপতিনাথ দে বিশ্বাসের চার ছেলের মধ্যে সবথেকে ছোট ছিলেন তিনি | তার আসল নাম শচীন্দ্রনাথ | কিন্তু তার মা তাকে ডাকতেন ‘ছবি’ বলে | সেই থেকে তিনি হয়ে গেলেন ছবি বিশ্বাস | ছোট থেকেই অভিনয় ছিল তার ধ্যানজ্ঞান | অভিনয় করতেন থিয়েটারে | মন্মথ রায়ের ‘মীরকাশিম’ নাটকে ছবি বিশ্বাস নাম ভূমিকায় অভিনয় করে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন। সিনেমায় অভিনয় শুরু করেন একটু পরের দিকে | ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে অন্নপূর্ণার মন্দির চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় করেন।কিন্তু সেই ছবিতে বেশী দাগ কাটতে পারেননি | ১৯৪১ সালের ১৮ জানুয়ারী মুক্তি পেয়েছিল দেবকী বসুর ‘নর্তকী’। সেই সিনেমায় সন্ন্যাসীর চরিত্রে তার অভিনয় মুগ্ধ করেছিল সকলকে | আর ফিরে তাকাতে হয়নি | অভিনয় করেছিলেন প্রায় ২৬২ টি চলচ্চিত্রে | সেই মানুষটাই আবার মেক আপ করতে পছন্দ করতেন না | অভিনয়ের জন্যে গোঁফ লাগালে কিছুক্ষন অভিনয়ের পরই খুলে ফেলতেন এবং আবার কিছুক্ষন পর আঁঠা দিয়ে লাগিয়ে নিতেন | তপন সিংহের পরিচালনায় কাবুলিওয়ালা সিনেমায় তার অভিনয়ে আজও মুগ্ধ করে সকলকে | প্রতিকার (১৯৪৪) এবং যার যেথা ঘর (১৯৪৯) ছবি দুটির পরিচালক ছিলেন তিনি |

আরো পড়ুন:  সারাদিন অভিনয় করার পর সারা রাত ধরে রাস্তায় রাস্তায় গণনাট্য আন্দোলনের পোস্টার মারতেন "সর্বজয়া"

“ক্যান আই টক টু রিনা ব্রাউন?”
“লেকিন খোঁকি তুমি শ্বশুরবাড়ি যাবে না, হামাকে ছেড়ে কোত্থাও যাবে না।”
“দাও, ফিরিয়ে দাও, ফিরিয়ে দাও আমার সেই বারোটা বচ্ছর।”
“সুদখোরের টাকায় আমার একমাত্র ছেলের উপনয়ন হতে পারে না তারাপ্রসন্ন।”
“কোনটা ছেড়ে কোনটা মনে রাখব? ওর বিশেষত্বটা কী?”

সপ্তপদী, কাবুলিওয়ালা, সবার উপরে, জলসাঘর, কাঞ্চনজঙ্ঘা— বাঙালির আজও এইসব ছবির সংলাপ মনে আছে কেবল ছবি বিশ্বাসের অভিনয়ের গুণে।

অভিনয়কে কোনোদিনও শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের পেশা বলে মানতেন না | তখন তিনি অভিনয়ে জগতে বেশ প্রতিষ্ঠিত | অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ঠিক করলেন ‘কালো বউ’ সিনেমা করবেন | খুব ইচ্ছা ছবি বিশ্বাসকে অভিনয় করানোর | কিন্তু ছবিবাবুর পারিশ্রমিক তখন দিনে পাঁচশো টাকা | অত টাকা দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের | শেষমেশ প্রতিদিন আড়াইশো টাকা নিয়ে ওই সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন ছবি বিশ্বাস | স্টুডিওর কর্মীরা কম বেতন পান এই অভিযোগ শুনে তাদের সঙ্গে একসাথে ধর্মঘটও করেছিলেন |

আরো পড়ুন:  হাওড়া স্টেশনে বসে সিগারেটের প্যাকেটের পিছনে ‘কফি হাউজ’ গানের শেষ লাইনগুলি লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার

দিনটা ছিল ১৯৬২-র ১১ জুন | অ্যাম্বাসাডরে চেপে যাচ্ছিলেন জাগুলিয়ার বাড়ি। ড্রাইভার প্রথমে গাড়ি চালাচ্ছিল | কিন্তু শ্যামবাজারে আসার পর নিজেই হাতে নেন গাড়ির স্টিয়ারিং | মধ্যমগ্রামের কাছে গঙ্গানগরে যশোর রোডে উলটো দিক থেকে আসা ভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় সেই গাড়ির | সাদা অ্যাম্বাসাডরটা তুবড়ে গিয়েছিল | বুকে এসে লাগল গাড়ির স্টিয়ারিং ,ঘটনাস্থলেই মারা যান ছবি বিশ্বাস | দেহ আনা হয়েছিল আর জি করে | লোকে লোকারণ্য ছিল সেদিন আর জি কর হাসপাতাল। মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় ঘোষণা করলেন, ‘‘ছবি বিশ্বাসের পোস্টমর্টেম হবে না।’’

মাত্র বাষট্টি বছরের জীবন। ১৯০০ সালে জন্ম নেওয়া মানুষটি বাংলা ছবিকে হাত ধরে পৌঁছে দিয়েছেন আধুনিকতার আঙিনায়, বললে ভুল হবে কি? আর মঞ্চের ছবি বিশ্বাসও তো শুধু পটে নয়, ইতিহাসেও লেখা |

– অভীক মণ্ডল

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।