সিদ্ধিলাভ করতে না পারার অবসাদে আত্মহত্যা করেছিলেন শ্যামাসঙ্গীতের অবিসংবাদিত গায়ক পান্নালাল ভট্টাচার্য

সিদ্ধিলাভ করতে না পারার অবসাদে আত্মহত্যা করেছিলেন শ্যামাসঙ্গীতের অবিসংবাদিত গায়ক পান্নালাল ভট্টাচার্য

অর্ধ শতাব্দী হয়ে গেলো তিনি নেই। তবু কালীপুজো এলে তিনি ভীষণভাবে জীবন্ত। বাংলা ছবির গায়ক হিসেবে জীবন শুরু করেও কেন চলে এলেন শ্যামাসঙ্গীতের দুনিয়ায়? খ্যাতি যখন মধ্য গগনে তখন কেনই বা অভিমানে দুনিয়া ছাড়লেন শ্যামাসঙ্গীতের অবিসংবাদিত গায়ক পান্নালাল ভট্টাচার্য !

কেটে গেছে কতো যুগ। তবু পান্নালাল আজো বহুমূল্য পান্নার মতোই উজ্জ্বল। খুব ইচ্ছে ছিল সিনেমার নেপথ্য গায়ক হবেন। আধুনিক গান গাইবেন। সেই মতো মেগাফোন কোম্পানিতে দুটো গানও রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু তখন বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগে রাজপাট শচীন দেব বর্মন, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জগন্ময় মিত্রদের। এদিকে পাঁচের দশকের পর ভক্তিগীতিতে নতুন শিল্পীর প্রয়োজন। যিনি কে মল্লিক, ভবানী দাস, মৃণালকান্তি ঘোষের যোগ্য উত্তরসূরী হবেন। দাদা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য নিয়ে গিয়েছিলেন এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানিতে। বলেছিলেন, আজ থেকে এখানে ভক্তিগীতির দায়িত্ব দিন পান্নাকে। ও কোম্পানির মুখ রাখবে। পান্নালাল তাঁর মেজদার কথাকে বেদবাক্য মানতেন। তাই আধুনিক, সিনেমার প্লেব্যাকের মোহ ত্যাগ করে অনায়াসে নিজের কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন মায়ের গান।

শাক্ত পরিবারে জন্ম। ঠাকুরদা ছিলেন পুরোহিত। তাই আজন্ম শরীরে ভক্তিরসের ধারা। এগারো ভাই-বোনের সবথেকে ছোট ছিলেন তিনি। যখন সাত মাসের গর্ভে তখনই মারা যান বাবা সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। মেজদা নিজের হাতে মানুষ করেছিলেন। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য তাই পান্নালালের কাছে বাবার সমান।

আরো পড়ুন:  কমল দাশগুপ্তের তত্ত্বাবধানেই ফিরোজা বেগম মাত্র ১২ বছর বয়সে প্রথম গান রেকর্ড করেন

১৮-১৯ বছর বয়সে বালিতে বারেন্দ্র পাড়ার মাঠে খেলতে খেলতে বল লেগেছিল চোখে। সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ডাক্তারবাবুর কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি বলেন মেডিকেল কলেজেই একমাত্র এর চিকিৎসা সম্ভব। তখনকার দিনে একেকটি ৪৫০ টাকা দামের মোট ২৫টি ইনজেকশন দেওয়ার পর চোখ তো বেঁচে গেল। কিন্তু চোখের মণি সামান্য সরে যায়। নেশা ছিল ফুটবলের, মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের খেলা থাকলে গানের অনুষ্ঠান বা রেকর্ডিং বাতিল করে দিতেন। একই সঙ্গে তাঁর ঘুড়ির নেশাও ছিলো প্রবল।

ভক্তিগীতি গাইতেন দাদা ধনঞ্জয়ের মতো করে। তাঁর ধারণায় মেজদার থেকেও ভালো ভক্তিগীতি কেউ গাইতেই পারে না! ওই কারণেই কোনও অনুষ্ঠানে গেলে আগে গান গেয়ে উঠে আসতেন। বলতেন, মেজদা থাকলে গাইতে পারব না। আর ধনঞ্জয় বলতেন, অসংখ্য শ্যামাসঙ্গীত গাওয়ার পরেও পান্নার মতো আমি ওরকম নাড়ি ছেঁড়া মা ডাক ডাকতে পারলাম কই?

আরো পড়ুন:  বাবা বিষ দেওয়া মিষ্টি খাইয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল তাঁকে,দুনিয়া সেই মেয়েকেই চিনল "বেগম আখতার" নামে

একবার পাড়ার অনুষ্ঠানে ধনঞ্জয় একঝাঁক শিল্পী নিয়ে গেছেন গান গাইতে। হঠাৎ ধবধবে সাদা চুল-দাড়ির এক বৃদ্ধ এসে সেই দলের মধ্যে কাকে যেন খুঁজছেন। তিনিই বিখ্যাত শ্যামাসঙ্গীত শিল্পী কে মল্লিক। সবাই তাঁকে প্রশ্ন করছেন, কাকে খুঁজছেন তিনি? উত্তরে সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, পান্নালালকে। তাঁর সামনে ওনাকে দাঁড় করাতেই কে মল্লিক নাকি জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘এমন ভাবে কী করে গান গাস তুই? কী করে এমন করে মাকে ডাকতে পারিস?’ সেদিন সবাই স্তব্ধ হয়ে দেখেছিলেন এক সাধক-গায়ক কীভাবে আরেক সাধক-গায়ককে, তাঁর যোগ্য উত্তরসূরীকে চোখের জলে বরণ করে নিচ্ছেন।

সঙ্গীত জগতের সফল শিল্পী হয়েও নিজের গান নিয়ে কখনো সন্তুষ্ট হতে পারেননি। একবারে ফাংশান শেষে শিল্পী বন্ধুদের সঙ্গে ট্রেনে করে ফিরছেন। হঠাতই বালি নামার একটু আগে তার মুখ লাল,চোখে জল। বলে উঠলেন, মাকে তুঁতে বেনারসী পরানো হয়েছে! কেউ বিশ্বাস করছেন না
ওনার কথা। শেষে বললেন, নেমে চল দেখে আসি। তার কথায় হইহই করে ট্রেন থেকে নেমে পড়লেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রীতি ঘোষের মতো শিল্পীরা। মন্দিরে গিয়ে দেখলেন, ভবতারিণী তুঁতে রঙের বেনারসী পরে সেজেছেন! সবাই মুখ চাওয়াচায়ি করেছিলেন দেখে। প্রতি কালীপুজোয় দক্ষিণেশ্বরে কালীপুজোর অনুষ্ঠান করার পর সেখানেই সারারাত কাটাতেন ।

আরো পড়ুন:  গান লিখেছিলেন নেতাজির জন্যে,আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের বিচার চলাকালীন চ্যারিটি শো করে অর্থসাহায্য করেছিলেন উত্তমকুমার

যত দিন গেছে এই তৃষ্ণা আরও বেড়েছে | আস্তে আস্তে সংসারী মানুষ টি সংসারের বন্ধন ছিঁড়েছেন। প্রায়ই গিয়ে শ্মশানে বসে থাকতেন। আর শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে মাকে ডাকতেন। তাঁকে একবার দেখার জন্য সেই আকুতিই ঝরে পড়েছে তাঁর প্রতিটি গানে। বেঁচে থাকতে ৩৬টি আধুনিক গান সমেত ১৮টি রেকর্ড, ৩টি বাংলা ছায়াছবির গান, এবং ৪০টি শ্যামাসঙ্গীতের রেকর্ড করেছেন।

এলো ১৯৬৬ সাল। ওই বছরেই ধনঞ্জয়ের সুরে গাইলেন ‘অপার সংসার নাহি পারাপার’। এটাই তার গাওয়া শেষ রেকর্ড। তারপর……..
মাত্র ৩৬ বছর বয়সে, দেবী দর্শন না করতে পারার অবসাদ ও অতৃপ্তি নিয়ে পান্নালাল চলে গেলেন মহাসিন্ধুর ওপারে।

‌-স্বপন সেন 

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।