ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত,বাঙালির নিজস্ব ঝরনা কলম ও ব্রিটিশ যুগের এক “গুপ্ত” সাম্রাজ্য

ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত,বাঙালির নিজস্ব ঝরনা কলম ও ব্রিটিশ যুগের এক “গুপ্ত” সাম্রাজ্য

বাঙালির দ্বারা আর যাই হোক ব্যবসা হয় না …!
এরকম stereotype কথা বলার আগে একটু ভাবুন । নিজের আলস্য আর কাজ না করার ইচ্ছেকে ঢাকার অপচেষ্টা কিছু বাঙালি করে বলেই,আজ রাজ্যের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ অবাঙালিদের হাতে। অবাঙালিরা ব্যবসা করুক ক্ষতি নেই, কিন্তু আমাদের রাজ্যের অর্থনীতির রাশ আমাদের হাতেই রাখতে হবে। তাহলেই আমাদের নিজভূমে পরবাসী হবার পরিস্থিতি হওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কেটে যাবে। আর সেটা হবে যদি আরও বেশি সফল বাঙালি ব্যবসায়ী তৈরি হয়। ভবিষ্যত কর্মসংস্থানের জন্য বাঙালিকেই পুঁজি হাতে আরও বেশি করে ব্যবসায় নামতে হবে। বাঙালি ব্যবসা পারে না এমনটা কিন্তু নয়…….

দ্বারকানাথ ঠাকুর, মতিলাল শীল এদের কথা আমরা অনেকেই জানি,কিন্তু এই ভদ্রলোকটি কথা বোধহয় আমরা অনেকেই সেভাবে জানি না | ব্যবসার সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক সেই আদিকালের। ইতিহাসের নানা অধ্যায়ে আমাদের চোখে পড়েছে বাঙালির ব্যবসা প্রীতি । ব্রিটিশ ভারতেও বাঙালির স্বদেশী শিল্পোদ্যোগ জানলে যেমন গর্বিত মনে হয় বাংলায় কথা বলা মানুষদের,তেমনই তাদের নিষ্ঠা,দেশপ্রেমকে কুর্নিশ করতে হয় বারে বারে ৷ এমনই এক শিল্পোদ্যোগী মানুষ ছিলেন ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত ৷

স্বদেশী চেতনায় অনুপ্রানিত,আবার পারিবারিক ঐতিহ্যে ছিল উচ্চশিক্ষা,পেশাদারিত্ব এবং পেশার প্রতি ভালবাসার। এরকম উদাহরণ শুনলে বোধহয় আমাদের সবার আড্রিনালিন গ্রন্থিকে কিছুটা হলেও অসহিষ্ণু করে তোলে ! যাই হোক ফিরি আসল গল্পে ৷ ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত ,যিনি বেশি পরিচিত ছিলেন এফ.এন.গুপ্ত নামেই ৷ মানুষটা একই সঙ্গে ছিলেন দেশপ্রেমিক এবং শিল্পপতি।পরাধীন ভারত তথা বাংলায়, সম্পূর্ণ দেশীয় কারিগরিতে ফাউন্টেন পেন,অর্থাৎ ঝরনা কলম তৈরি করতেন।এরই সাথে তাঁর প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত পণ্যের তালিকায় ছিল,পেন্সিল,ফাউন্টেন পেনের নিব, কালি ৷ কলকাতার বর্ধিষ্ণু,উদার ও শিক্ষিত গুপ্ত পরিবারে মানুষটার জন্ম ৷ বাবা গোপালচন্দ্র গুপ্ত নিজেও শিল্পপতি,কিন্তু তাঁর পিতামহ ডাঃ দ্বারকানাথ গুপ্ত ছিলেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের ডাক্তারির ছাত্র ৷ তিনি মধুসূদন গুপ্তের সহকারী ছিলেন, যে মধুসূদন দত্ত ১৮৩৬ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ করে গড়েছিলেন ইতিহাস,ভেঙে দিয়ে দিয়েছিলেন সমাজের অনেক সংস্কার,হয়ে উঠেছিলেন নিজেই ইতিহাস ৷

আরো পড়ুন:  'চা পানের উপকারিতা' – ব্রিটিশ আমলের বিজ্ঞাপন আজও রয়ে গেছে দমদম স্টেশনে

সাল ১৯০৫, ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত “এফ এন গুপ্ত এন্ড কোম্পানি” নামের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করলেন ৷ যে সংস্থা পরাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথম কলম নির্মাণকারী সংস্থা। শুরুর দিকে ৫ নম্বর,মিডলটন স্ট্রিটের এই প্রতিষ্ঠানটি বেশ সাধারন ভাবেই চলছিল ৷ যদিও মানুষটার নিষ্ঠা ও দক্ষতা,পেশাদারিত্ব খুব দ্রুতই তাঁকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিল ৷ আইসি এস অফিসার কেসি দে এবং তৎকালীন চট্টগ্রামের কমিশনার এবং শ্রী এম. জে. কগসওয়েল,যিনি ভারত সরকারের মুদ্রণ,মুদ্রণ সামগ্রী এবং স্ট্যাম্প – সম্পর্কিত বিভাগের কন্ট্রোলার ছিলেন – এদের সুপারিশের জোরে ফনীন্দ্রনাথের সঙ্গে তদানীন্তন ব্রিটিশ শাসিত ভারত সরকার বাৎসরিক ভিত্তিতে চুক্তি করতে বাধ্য হল ৷ এই চুক্তি অনুসারে তিনি তাঁর সংস্থায় উৎপাদিত সামগ্রী সরকারকে সরবরাহ করার বরাত পেল ৷ তারপর মানুষটার কেবল সাফল্যের সিড়ি বেয়ে উপরে ওঠার গল্প ৷ এদিকে দিনে-দিনে প্রতিষ্ঠান ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল ৷ প্রয়োজন হল কারখানা সম্প্রসারনের৷

আরো পড়ুন:  "মা-বোনেদের সম্মান রক্ষা করতে না পারলে সভ্যসমাজে থাকার অযোগ্য আমরা" বলতেন বরুন বিশ্বাস

১৯১০ সালে ১২ নম্বর বেলিয়াঘাটা রোডের পাশে ছয় বিঘা জমির উপর একটি নতুন কারখানা তৈরি করা হল ৷ সেই সময়ে জমির বাজার মূল্য ছিল আড়াই লাখেরও বেশি। বুঝতেই পারছেন আজকের দিনে ঠিক কতটা টাকা৷ কারখানার উন্নত ও আধুনিক সমস্ত মেশিনপত্র ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা হয়েছিল ৷ যদিও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তিনি নিজের হাতেই রেখে দিয়েছিলেন ৷ পরের পর্ব আরও রোমহর্ষক ৷ জে. এ.এল.সোয়ান ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল গভর্নমেন্টের নির্দেশে তাঁর কারখানা পরিদর্শনে এসে কারখানার যন্ত্রপাতি,উৎপাদন থেকে ম্যানেজমেন্ট সব বিষয় দেখে অতীব খুশী হন ৷ বলা বাহুল্য সেই সময়ে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি থেকে পেন,পেন্সিল আর পেন হোল্ডার পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। স্বভাবত পেনের এই ব্যবসায় কার্যত ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত দ্রুত হয়ে উঠলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ৷

একদিকে সরকারি বরাত আবার উল্টোদিকে অভিজাত খদ্দেরদের মনের মত সামগ্রী বানিয়ে দিতে শুরু করল কোম্পানি ৷ যেমন , ‘ দ্য পারফেকশন ফাউন্টেন পেন সিরিজ’, যার নিব তৈরী হতো ১৪ ক্যারেট সোনা এবং পেনের শরীরটা তৈরী হতো মাদার অফ পার্ল বা মুক্তবাহী ঝিনুক অর্থাৎ সুক্তি দিয়ে। ব্রিটিশ ভারতে তিনি ‘ রায় সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। দেশপ্রেমিক ফণীন্দ্রনাথ গুপ্তের প্রতিষ্ঠানের নাম যেমন ছড়িয়ে পড়ল,সরকারি মহলে,তেমনই তখনকার সময়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সামনের সারির নেতাদের কাছের মানুষ হয় উঠতে পেরেছিলেন এফএন গুপ্ত৷

আরো পড়ুন:  লকডাউনে কাজ হারানো দুশো বস্ত্রশিল্পীর বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলেন তিন বঙ্গসন্তান

১৯২৫সালের ২৮শে আগস্ট কারখানা পরিদর্শনে এলেন মহাত্মা গান্ধী | খুশী হয়ে গান্ধীজি সেদিন বলেছিলেন “এফ এন গুপ্ত এন্ড কোম্পানি” পরিদর্শন করে আমি প্রভূত আনন্দ লাভ করেছি।আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি এটা জেনে,এই পেন আর পেন হোল্ডার তৈরীর কারখানাটির বেশ কিছু মেশিন এখানেই ডিজাইন করা এবং নির্মাণ করা হয়েছে।আমি এই জাতীয় উদ্যোগ, সংস্থার সার্বিক সাফল্য কামনা করি।” গান্ধীর এই দরাজ সার্টিফিকেটেই বোঝা যায় ইংরজদের কাছ থেকে বানিজ্যের বরাত পেলেও মানুষটা মনে-প্রানে ছিলেন জাতীয়তাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ,খাঁটি বাঙালি ৷ নিজের প্রতিষ্ঠানে তৈরি সামগ্রীর গুনগত মানের জোরে,অন্য কোন স্বদেশী বা ইউরোপিয়ান কোম্পানি কলমের ব্যবসায় “এফএন গুপ্ত এন্ড কোম্পানি”র ধারে কাছে আসতে পারেনি। লক্ষ্মী-সরস্বতীর অঘোষিত,অলিখিত ও অদৃশ্য সংঘাত সেই কবেই মিটে গিয়েছে৷ ভূমিপুত্রদের পুরনো সাফল্যের হিসেব সাগরে তাই এক বার ডুব দিয়ে কিছু রত্নোদ্ধার হলে,সব বাঙালির মত আমাদেরও বোধহয় কিছুটা আত্মতৃপ্তি হয় !

লেখক – অরুনাভ সেন

বাংলা আমার প্রাণ

বাংলা আমার প্রাণ

"বাংলা আমার প্রাণ" বাংলা ও বাঙালির রীতিনীতি,বিপ্লবকথা,লোকাচার,শিল্প ও যাবতীয় সব কিছুর তথ্য প্রকাশ করে।বাংলা ভাষায় বাংলার কথা বলে "বাংলা আমার প্রাণ"। সকল খবর ও তথ্য আপনাদের কেমন লাগছে,তা আপনাদের কতোটা মন ছুঁতে পারছে তা জানতে আমরা আগ্রহী।যাতে আগামী দিনে আপনাদের আরো তথ্য উপহার দিতে পারি। আপনাদের মতামত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুন,আরো এগিয়ে যাওয়ার পথে এটিই আমাদের পাথেয়। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু গড়ে ওঠে।আর তাই আজ আপনাদের ভালোবাসা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আমরা এক বৃহৎ পরিবার।এখনো বহু পথ চলা বাকি তাই আপনাদের সাধ্য ও বিবেচনা অনুযায়ী অনুদান দিয়ে এই পেজের পাশে থাকুন। আমাদের পেজে প্রকাশিত সকল তথ্য আমরা একে একে নিয়ে আসছি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও আকারে।দয়া করে আমাদের পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে প্রকাশিত কোনো তথ্য বা লেখা নিয়ে কোনো ভিডিও বানাবেন না।যদি ইতিমধ্যে তা করে থাকেন তবে তা অবিলম্বে মুছে ফেলুন। আমাদের সকল কাজ DMCA কর্তৃক সংরক্ষিত তাই এ সকল তথ্যাদির পুনর্ব্যবহার বেআইনি ও কঠোর পদক্ষেপ সাপেক্ষ।ধন্যবাদ।

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।