টালিগঞ্জের ষ্টুডিওপাড়ায় এক পান দোকানের কাছে মানিকবাবুর ইউনিটের পুনু সেন খুঁজে পেলেন “ক্যাপ্টেন স্পার্ক”কে

টালিগঞ্জের ষ্টুডিওপাড়ায় এক পান দোকানের কাছে মানিকবাবুর ইউনিটের পুনু সেন খুঁজে পেলেন “ক্যাপ্টেন স্পার্ক”কে

ক্যালকাটা লজের তিন নম্বর ঘরে জটায়ু তখনও বেশ ঘোরের মধ্যে | সৌজন্যে অবশ্যই গুণময় বাগচীর সতেরো এন্ড হাফ ইঞ্চি বাইসেপস | জটায়ুর কথায় , ‘ যমের সামনেও সতেরো এন্ড হাফ |’ আর এরই মধ্যে ফোনে তলব ফেলুদাকে | ফোনের অপরপ্রান্তে ঘোষাল বাড়ির উমানাথ ঘোষাল |
অতঃপর ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স ‘-এর মার্চ বেনারসের লংকায় | এখানেই অবস্থিত ঘোষাল বাড়ি | বাড়িতে ঢোকার মুখেই বিপত্তি | উঁচু ছাদের পাঁচিলে দাঁড়িয়ে ভয়ডরহীন বছর পাঁচেকের এক ছোট্ট ক্যাপ্টেন তার পিস্তল থেকে গুলি ছুঁড়ছে যে |
এই প্রসঙ্গে ফেলুদা-জটায়ুর সেই সংলাপ আজও কানে বাজে |
জটায়ু : কিছু একটা করুন মশাই , আমার পেটের ভেতরটা কেমন করছে |
ফেলুদা : ‘ও ছেলে আমাদের কথা শুনবে না | চলুন ভেতরে যাই |’
এই দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল বেনারসে জ্ঞান চক্রবর্তীর বাড়িতে | যদিও শুটিং চলার সময় বাড়িটি ডালমিয়া গ্রুপের্ হস্তগত হয়েছিল |
পর্দায় ছোট্ট রুকুকে ছাদের পাঁচিলে দাঁড়াতে দেখে ফেলুদা এন্ড কোম্পানির মত অনেক দর্শকের হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছিল একথা হলফ করে বলতে পারি |
এবার আসি এই বিশেষ দৃশ্যে পর্দার আড়ালে শুটিং প্রসঙ্গে ——–
ছোট্ট রুকুকে সত্যি সত্যিই দাঁড় করানো হয়েছিল ছাদের পাঁচিলের উপর | ভুলেও ভাববেন না , জামার তলায় কোমরে দড়ি বাঁধা হয়েছিল | কোন দড়ি বাঁধা হয়নি ঠিকই তবে আশেপাশে মানিকবাবুর আর্মি সজাগ ছিল | ছোট্ট ক্যাপ্টেনের যাতে ভারসাম্য নষ্ট না হয় সেইজন্য বানানো হয়েছিল ছোট প্লাটফর্ম |
সৌমেন্দু রায়ের কথায় , ‘বাড়িটা এমন কিছু উঁচু ছিল না | সাধারণ দোতলা বাড়ির মতোই উচ্চতা | ক্যামেরার কারসাজিতে লো -এঙ্গেল শট নেওয়ায় বাড়িটা খুব উঁচু দেখিয়েছিল |
ডাকাবুকো ক্যাপ্টেনের উদ্দেশ্যে মানিকবাবু বলেছিলেন , ‘ নিচের দিকে তাকাবে না | আমি যখনই ‘ কাট ‘ বলব , তখনই তুমি পেছন দিকে সরে যাবে | ‘
এই দৃশ্য গ্রহণের সময় মানিকবাবু একেবারেই বেশি সময় নেন নি |
প্রদীপের সলতে পাকানোর কাজটা কিন্তু শুরু হয়েছিল খুদে রুকুর হাত ধরে | যতই কাহিনীর শেষ পর্বে ফেলুদা কোতোয়ালিতে মছলিবাবাজির আঁশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা করুন না কেন যতই মগনলালের মত ধড়িবাজ লোককে প্রাইভেট সার্কাসে খেলা দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানান না কেন মগনলাল যে অসৎ মানুষ সেটা রুকুবাবুর সরল মন গাড়ির আওয়াজেই ধরে ফেলেছিল | তাইতো বিকাশসিংহ ওরফে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়কে বলেছিল , ‘ বিকাশকাকু , ডাকু গণ্ডারিয়া’ |
এরপরেই রুকু ছুটেছিল ঠাকুরদা অম্বিকা ঘোষাল ওরফে Raxit – এর কাছে |
আর এই প্রসঙ্গে সেই অমলিন সংলাপ ——
ক্যাপ্টেন স্পার্ক : RAXIT নিচে একজন দুষটু লোক এসেছে , সে তোমার গণেশটা কিনে নেবে বলছে |
RAXIT : কিনে নেবে বলছে ?
ক্যাপ্টেন স্পার্ক : হ্যাঁ |
RAXIT: কে বলোতো ?
ক্যাপ্টেন স্পার্ক : ডাকু গণ্ডারিয়া | বলছে ওর নাম মগনলাল |বাবার সঙ্গে কথা বলছে , অনেক টাকা দেবে |
RAXIT : অনেক টাকা দেবে বলছে ? ব্যাপারটাতো ভাল লাগছে না ক্যাপ্টেন স্পার্ক |
ক্যাপ্টেন স্পার্ক : চলো আমরা গনেশটাকে লুকিয়ে রাখি |
বরাবরই আনকোরা শিল্পীদের নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত মানিকবাবু নিজে দেখিয়ে দিতেন কিভাবে অভিনয় করতে হয় |
নিশ্চয় মনে পড়ে এই দৃশ্যখানি– ছাদের উপর ক্যাপ্টেন স্পার্ক-এর হেডকোয়ার্টারে হাজির ফেলুদা এন্ড কোম্পানি | ফেলুদার ধাঁধা , ‘ দারুণ জিনিস বটে , চিবোলেই চটচটে ‘|
এর উত্তরে রুক্ষিণীকুমার ওরফে ক্যাপ্টেন স্পার্ক যে ভঙ্গিমায় উত্তর দিয়েছিলেন মানিকবাবুর পছন্দ হয়নি |
পর্দায় আমরা দেখতে পাই , রুকু ওরফে স্পার্ক মুখ থেকে চিবানো চিউইং গাম বের করে ফেলুদাকে দেখিয়ে আবার মুখে পুরে দিয়েছিল | জানেন কি , এটি মানিকবাবুর মস্তিস্ক প্রসূত |
এতো গেল বেনারসে আউটডোর শুটিংয়ের প্রসঙ্গ |কলকাতায় ইন্ডোর শুটিংয়ের আগে ঘটল বিপত্তি |
কলকাতায় শুটিং চলাকালীন সকাল সকাল ফোন মানিক জেঠুকে | খুদে রুকু বলেছিল , ‘জেঠু আমি ফোকলা হয়ে গেছি।’
মানিকবাবু বলেছিলেন, ‘কী আর করা যাবে, ‘তুমি দাঁতটা বাঁধিয়ে নাও।’
বাঁধানো দাঁতে প্রথম প্রথম উচ্চারণে অসুবিধা হলেও মানিকবাবুর প্রচেষ্টায় শুটিং হয়েছিল নির্বিঘ্নে।
একটা সময়ে পেশাগতভাবে তাজ বেঙ্গল হোটেলের সঙ্গে যুক্ত রুকু ওরফে জিৎ বসু স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন , ‘ নকল দাঁত লাগিয়ে শুটিং হয়েছিল বটে , কিন্তু উচ্চারণ অন্যরকম শোনানোয় আমার অংশটার শুটিং তখন ডাবিং করা হয়নি | বেশ কিছুদিন পরে আমার দাঁতটা ওঠায় জেঠু আমার ডাবিংটা করিয়েছিলেন |’
আবার এই চলচ্চিত্রেই মানিকবাবু সুকৌশলে অন্যদের এমনই বকাবকি শুরু করেছিলেন যে, শিশু অভিনেতা রুকু কাঁদতে শুরু করেছিল। বলাবাহুল্য সাথে সাথেই চালু হয়েছিল ক্যামেরা।
নিশ্চয়ই চোখের সামনে ভেসে উঠছে বেনারসে বাড়ির ছাদে কান্না ভেজা রুকুর চোখ দুটো |
চিত্রগ্রাহক সৌমেন্দু রায় একবার বলেছিলেন , ‘ মানিকদার আউটডোর লাক ছিল খুব ভালো |’
কথাটা বোধহয় একশো ভাগ সত্যি |۔
কেন !
এই চলচ্চিত্র প্রসঙ্গেই নমুনা পেশ করা যাক ——
দুশ্চিন্তায় মানিকবাবু | আর হবেন নাই বা কেন ! বেনারসের টিকিট কাটা হয়ে গেছে অথচ একটি বিশেষ চরিত্রে তখনও পর্যন্ত অভিনেতা জোগাড় হয়নি যে |
অবশেষে পাওয়া গেল টালিগঞ্জের ষ্টুডিও পাড়ায় এক পান দোকানের কাছে | টালিগঞ্জে মামার বাড়ি বেড়াতে যাওয়া নব নালন্দা স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রটিকে একনজরে ভালো লেগে গেল মানিকবাবুর ইউনিটের পুনু (রমেশ )সেনের | পুনুবাবু তখন মরিয়া | যেভাবে হোক মানিকদার সামনে হাজির করতেই হবে | একেবারে ট্যাক্সিতে করে সঙ্গে নিয়ে মানিকবাবুর সামনে হাজির করলে উচ্ছসিত মানিকবাবু বলেছিলেন , ” আরে , একেই তো আমি খুঁজছিলাম |”
নিশ্চিন্ত মানিকবাবু ইউনিটসহ রাতের দুন এক্সপ্রেসে চেপে বসলেন | পরে বাবার সাথে বেনারস রওনা হলো রুকু ওরফে জিৎ বসু | |
১১২ মিনিট দীর্ঘ চলচ্চিত্র ‘জয় বাবা ফেলুনাথ ‘-এ শিশু শিল্পী নির্বাচনের হিল্লে হয়েছিল এইভাবেই |

আরো পড়ুন:  নৌ বিদ্রোহে কংগ্রেসীদের বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী "কল্লোল" নাটকে তুলে ধরেছিলেন উৎপল দত্ত

-পবিত্র মুখোপাধ্যায়

Avik mondal

Avik mondal

Related post

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।