কালীঘাটের মন্দির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অলৌকিক ইতিহাস

কালীঘাটের মন্দির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অলৌকিক ইতিহাস

কালীঘাটের কালী ঠাকুরের মাহাত্ম্য সর্বজন বিদিত। পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে প্রাচীন এবং লোকপ্রিয়, তবে এই কালীঘাটের কালী মন্দিরের অজানা রহস্য হয়তো অনেকেই জানেন না। কালীঘাট একটি বহু প্রাচীন কালীক্ষেত্র।কালীঘাটের মন্দিরটি হুগলী নদীর তীরে অবস্থিত। কালীঘাটের মা কালীর কথা সবার জানা আছে, কিন্তু জানা যায়, এই মন্দিরের নাম থেকেই নাকি কলকাতা নামটি হয়েছে, তবে এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

রহস্যময় এই পৃথিবী। রহস্যে ঘেরা চারপাশের প্রকৃতি। ভারত হল সেই রহস্যময় জগতের অন্যতম পীঠস্থান। ভারতের প্রতিটি জায়গায় আজও এমন বেশ কিছু রহস্যময় জায়গা ও রোমাঞ্চকর ইতিহাসে পরিপূর্ণ ধর্মীয় স্থান আছে, যার সম্বন্ধে জানলে সত্যিই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে।তেমনই একটি জায়গা হল কলকাতার কালীঘাটের কালী মন্দির।এই মন্দির কে কেন্দ্র করে যেমন আছে,মা কালীর মহিমা,তেমন ই রয়েছে বেশ কিছু অলৌকিক ইতিহাস।

কালীঘাটের মাতৃমূর্তির সঙ্গে অন্য কোনও কালীমূর্তি র কোনও মিল নেই। এই মূর্তি অনন্য। শোনা যায়, এই মন্দিরে কেবল রাজা – জমিদার বা পুন্যাত্মাই নন, পুজো দিয়েছেন ইংরেজ সাহেব রাও।

এই মন্দিরটি প্রায় অনেক বছরের পুরনো, কিন্তু এই মন্দিরের ইতিহাস ঘাটতে হলে আমাদের যেতে হবে আরও অনেক বছর পেছনে। কালীঘাটে মায়ের বিগ্ৰহ এবং মন্দির নিয়ে অনেক রকম জনমত আছে। অনেকে বলেন কলকাতার বর্তমান চৌরঙ্গী অঞ্চলে একটি বিরাট জঙ্গল ছিল এবং সেই জঙ্গলে থাকতেন এক সন্ন্যাসী যার নাম ছিল জঙ্গলগিরি চৌরঙ্গী। তাঁর নামেই তখন চৌরঙ্গী রোড। তিনি নাকি জঙ্গল থেকে মায়ের একটি মূর্তি পান। আর তারপর তিনি গঙ্গাসাগর যাওয়ার সময় সেটি দিয়ে যান সাবর্ণ রায়চৌধুরী বংশধরদের কে।

আরো পড়ুন:  সাহেবদের টেক্কা দিতেই আকাশে উড়েছিলেন ভারতের ‘প্রথম নভশ্চর’ রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

এছাড়াও আরেকটি ঘটনা শোনা যায়, আর সেটি বেশি মানুষের মুখে প্রচলিত। প্রায় ১০০০ বছর আগে বর্তমান আদিগঙ্গা তীরে জঙ্গলের মধ্যে থাকতেন এক তান্ত্রিক যার নাম আত্মারাম ব্রহ্মচারী। যা ১৮০৯ সালে বেহালার বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী বংশের লোকজন নতুন করে তৈরি করলেন। এই দুটোর মধ্যে সত্যি ঘটনা যেটাই হোক না কেন বলা হয়, এখনো মায়ের মূর্তির তলায় একটি বাস্কে আছে ওই পাথরটি, মানে সতীর পায়ের আঙ্গুল টি। আর সেটা খোলা হয় একমাত্র স্নানযাত্রার সময়। অনেক যুক্তিবাদী মানুষ হয়তো এই পাথরটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন কিন্তু সব কিছু তো যুক্তি দিয়ে হয় না। একদিন তিনি দেখলেন গঙ্গার ধারে কিছু একটা থেকে অদ্ভুত এক আলো বেরোচ্ছে। আর সেটি ছিল একটা পাথর এবং সেই দিন রাতে তিনি স্বপ্নাদেশ পান যে ওটা আসলে কোনো পাথর নয়, ওটা সতীর পায়ের আঙ্গুল। তারপর তিনি ও তাঁর বন্ধু ব্রহ্মানন্দ স্বামীর সাথে মিলে প্রতিষ্ঠা করলেন কালীঘাটের মন্দির।

বর্তমানে রয়েছে তিনটি বড়ো চোখ, একটি সোনার তৈরি লম্বা জিভ যেটি গড়িয়ে দিয়েছিলেন পাইক পাড়ার রাজা ইন্দ্র চন্দ্র সিংহ এবং রুপোর তৈরি চারটি হাত যা তৈরি করে দিয়েছিলেন খিদিরপুরের গোকুল চন্দ্র ঘোষাল। সেই হাত পরে সোনার করে দিয়েছিলেন কালী চরণ মল্লিক। সোনার মুন্ড মালা দান করেছিলেন ১৭৬৫ সালে পাতিয়ালার মহারাজ রাজা নবকৃষ্ণ। এছাড়া দেবীর মাথার ছাতা দান করেছিলেন নেপালের সেনাপতি জঙ্গ বাহাদুর।

প্রথমে মন্দিরটি একটি কুঁড়েঘরের মতো ছিল। পরে সেটিকে বর্তমান রূপ দেওয়া হল। বর্তমানে যে মূর্তিটিকে পূজো করা হয়, সেটি কষ্টিপাথরের তৈরি এবং সোনা ও রূপা দিয়ে কাজ করা হয়। ২০১৬ সালে প্রায় ৪০ বছর পর দেবীর জিভ টিকে পাল্টানো হয়। মন্দিরের সামনেই ছিল স্নানের ঘাট। ঘাটের পাশে চিনু শাঁখারী নামের এক গরীব মানুষ শাঁখা বিক্রি করত।মেয়েরা স্নান করতে এসে, পূজো দিতে এসে তার কাছ থেকে শাঁখা কিনে নিয়ে যেত।

আরো পড়ুন:  পুজোর আগেই কলকাতার রাস্তায় ফিরছে দোতলা বাস

মূল মন্দির ছাড়াও এখানে রয়েছে ষষ্ঠীতলা, দেবী ষষ্ঠী, শীতলা ও মঙ্গলচন্ডীর প্রতীক রূপে তিনটি শিলা এখানে পূজিত হয়। এছাড়াও রয়েছে নাটক মন্দির যেখান থেকে দেবীর মূর্তি দেখা যায়। নাটমন্দিরটি তৈরি করে দিয়েছিলেন আন্দুলের জমিদার রাজা কাশীনাথ রায়। হুজুরিমাল ছিলেন পাঞ্জাবি সৈনিক। তাঁর শেষ ইচ্ছা রাখতে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মন্দির সংলগ্ন আদি গঙ্গার ঘাটটি বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন। জোর বংলো নামে একটি বড়ো দালান এবং হারকাট তলা যেখানে বলি হয় এবং রয়েছে নকুলেশ্বর শিব মন্দির। ১৮৫৪ সালে তারা সিং নামে জনৈক পাঞ্জাবি ব্যবসায়ী বর্তমান নকুলেশ্বর মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। এই তীর্থের পীঠদেবী হলেন দক্ষিণাকালী এবং ভৈরব বা পীঠরক্ষক দেবতা নকুলেশ্বর।

মূল মন্দিরের পাশে রয়েছে পবিত্র কুন্ড পুকুর যেখান থেকে দেবী সতীর অঙ্গ উদ্ধার হয়েছিল। এছাড়াও রয়েছে রাধা কৃষ্ণের মন্দির। ১৮৪৩ সালে রাওয়ালির জমিদার উদয়নারায়ণ মন্ডল শ্যাম রায়ের মন্দিরটি নিমার্ণ করেছিলেন। ১৮৬২ সালে শবদাহের জন্য মন্দিরের অদূরে নির্মিত হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশান। কালীঘাটের সঙ্গে নাথ পন্থীদের নিবিড় সম্পর্ক ছিল বলে অনেক গবেষক অনুমান করেন। হিন্দু মন্দির ইউরোপীয়দের আগমন তেমন সুলভ ছিল না সেযুগে। কিন্তু কালীঘাটে সেটা নিয়মিত হয়ে ওঠে।। শোনা যায়, আরও অতীতে যশোহররাজ প্রতাপাদিত্যের কাকা রাজা বসন্ত রায়ের গড়া আদি মন্দিরটি লুপ্ত। দেবীমূর্তির আধো ভাগ দেখা যায় না।

আরো পড়ুন:  লাহোর জেলে ৬৩ দিন অনশন করার পর মৃত্যুবরণ করেছিলেন যতীন দাস

হাট খোলার দত্ত পরিবারের কালীপ্রসাদ দত্ত এবং বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের সন্তোষ রায়চৌধুরী এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। তবে খুব প্রাচীন বাংলা গ্ৰন্থ গুলিতে কিন্তু এর কোনো উল্লেখ নেই। রঘুনন্দনের তীর্থ বিষয়ক গ্ৰন্থ তীর্থ তত্ত্বে কালীঘাটের কথা নেই। ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যে প্রকাশিত তীর্থ বিষয়ক “ কালিকামঙ্গল “ এবং “ অনাদি মঙ্গল “গ্ৰন্থে কালীঘাটে কালিকা দেবীর উদ্দেশ্যে প্রনাম নিবেদন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে পুরাণে গোবিন্দপুর এবং সুরোধ্বনি তটে কালী কথা বলা হয়েছে।

মূলত কালীঘাটের কথা লোকমুখে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় অষ্টম শতাব্দীর আদীসূর পঞ্চ ব্রাহ্মণ কে বঙ্গ ভূমিতে এনেছিলেন। এদের মধ্যে ক্ষিতীশের বাসস্থান নির্ধারিত হয়েছিল বীরভূম জেলার পঞ্চ কূট গ্রামে। কিন্তু তার চতুঃস্পাটি ঠিক হয় কালীঘাটে। পুরাণ কালে হিন্দুরা যাকে বলতেন কালী ক্ষেত্র। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে কালীঘাট, কালীঘট বা কালী ক্ষেত্র বল্লাল সেন যুগের ও আগে।

মায়ের বাম দিকের দুটি হাতের একটি তে রয়েছে সোনার তৈরি খড়গ, যা ঐশ্বরিক জ্ঞানের প্রতীক এবং অন্য হাতটি তে রয়েছে অসুর রাজ শুম্ভের মুন্ড যা অহংকারের প্রতীক। এগুলির তাৎপর্য হল ঐশ্বরিক জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ তার অহংকারের বিনাশ ঘটালে তবেই মুক্তি মেলে। আর দুই হাতের মুদ্রার মাধ্যমে দেবী অভয় ও আশীর্বাদ দান করেন।

– রিয়া দাস ( রাই), রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।ইতিহাস স্নাতকোত্তরের ছাত্রী

(তথ্য – কালীঘাটের পুরাতত্ত্ব – সূর্য কুমার চট্টোপাধ্যায়। কালীঘাটের কালি মন্দির – পল্লব মিত্র। ইতিহাস কথা)

Avik mondal

Avik mondal

করোনাকে না করো

ভাইরাসের কবলে আজ সারা বিশ্ব,গৃহবন্দী বিশ্ববাসী।বন্ধ দ্বার খুলতে তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখুন,হাত ধুয়ে নেমে পড়ুন এই ভাইরাস দমনে।